কৃষিতে আরও সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ


সাহেব-বাজার ডেস্ক : করোনার কারণে ২০২০ সালের প্রথম প্রান্তিকে সারাবিশ্বই ছিল লকডাউনে। স্বাভাবিকভাবেই তখন অর্থনীতি সংকুচিত হয় প্রায় সব দেশের। মন্দার কবলে পড়ে বিশ্ব। সবচেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়ায় মূল্যস্ফীতি। মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা কেবল ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল, আর তখনই শুরু হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

তাই আবারও বিঘ্নিত হয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। রেকর্ড ছুঁয়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। জ্বালানির দামও আকাশছোঁয়া। ফলে সবকিছুর দামই এখন বাড়তি। এমন পরিস্থিতিতে আসছে (২০২২-২৩ অর্থবছর) বাজেটে প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে নতুন কৌশল হিসেবে বাড়ানো হচ্ছে ভর্তুকি।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশের অর্থনীতি রূপান্তরের সময় কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এমনকি করোনা মহামারীতেও এ খাতে কোনো ঋণাত্মক প্রভাব পড়েনি। উল্টো দেশের মোট অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃষি। তাই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দেশের অর্থনীতি।

এ কারণেই আগামী অর্থবছরের বাজেটে কৃষির ওপর বেশি নজর দেওয়ার পরামর্শ তাদের। অর্থ বিভাগও জানিয়েছে, নতুন অর্থবছরে কৃষি খাতে সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে। এ খাতে চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। খাদ্যপণ্য, সার, জ্বালানি তেলসহ অন্যান্য পণ্যে ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানোর রোডম্যাপ তৈরি করছে অর্থ বিভাগ।

কৃষি খাতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রণোদনার জন্য ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি খাতের উন্নয়ন অব্যাহত রাখা এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ১৫ হাজার কোটি টাকা।

জানা গেছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই প্রণোদনা হিসেবে কৃষককে সার ও বীজসহ কৃষি উপকরণ দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ২০০৮-০৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত তথা বিগত ১৩ বছরে শুধু সারেই ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে প্রায় ৮২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরেই ভর্তুকিতে ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। আর চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকার সার বাবদ ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের প্রকৃত ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৩৩২ কোটি টাকায়।

এদিকে বিশ্ববাজারে সারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে চলতি বাজেটে কৃষি খাতের ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আর এই দাম বেড়েছে শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে, যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ খেসারত দিচ্ছে দেশের কৃষি খাত। বৈশ্বিক এ সংকট মোকাবিলায় সম্প্রতি সংশোধিত বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।

এ অর্থের বড় অংশই চলে যাবে সার কেনার বর্ধিত মূল্য পরিশোধে। আর এমন পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সারের মূল্য সমন্বয় প্রস্তাব কার্যকর করেনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কেননা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক খাদ্যশস্য ফলন হবে, এমনটিই পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার। ফলে আগামীতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি খাতে সম্পৃক্ত মানুষের আয় বাড়ার প্রত্যাশা করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি ও জ্বালানি খাতে এখন ভর্তুকি কমানো যাবে না। প্রয়োজনে ঘাটতি মোকাবিলায় রাজস্ব আহরণ আরও বাড়াতে হবে। তখন ভর্তুকি বাড়ালেও রাজস্ব আয় দিয়ে তা ব্যালেন্স করা যাবে। তবে কিছু খাতে এ মুহূর্তে ব্যয় সংকোচন জরুরি। বিশেষ করে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থ ব্যয় কমাতে হবে। এদিক থেকেও সাশ্রয় হবে কিছু অর্থ।

জানা গেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে এমনটি ধরেই চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) শুরুতে কৃষি খাতের ভর্তুকি ধরা হয় ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছরের শেষদিকে এসে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ফলে কৃষকের সার ইউরিয়া প্রতিকেজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে ৩২ থেকে বেড়ে ৯৬ টাকায় দাঁড়ায়।

একই সঙ্গে টিএসপি সার ৩৩ থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, এমওপি সার ২৩ থেকে বেড়ে ৫৪ টাকা এবং ডিএপি সারের মূল্য ৩৭ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ টাকায়। সরকার বিশ্ববাজার থেকে বেশি দাম দিয়ে আমদানি করলেও কৃষকের কথা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকে গুরুত্ব দিয়ে দেশে মূল্য বাড়ায়নি। ফলে এ খাতে বড় ধরনের ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে, যে কারণে সংশোধিত বাজেটে কৃষি খাতের ভর্তুকি আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ১২ হাজার কোটিতে উন্নীত করা হয়। সার ছাড়াও কৃষি মন্ত্রণালয়ের পণ্য ও সেবা ক্রয় খাতেও ব্যয় বেড়েছে এ বছর।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বাজেটে পরিচালনা ব্যয়ের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৩ হাজার ১৭১ কোটি এবং উন্নয়ন খাতে ৩ হাজার ৩০ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে এ খাতে আরও ২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে এ খাতে মোট পরিচালনা ব্যয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকায়। পাশাপাশি উন্নয়ন খাতে ১৬৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিচালনা ও উন্নয়ন খাতে শুরুতে বরাদ্দ ছিল ১৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। সেটি সংশোধিত বাজেটে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে মোট ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠকে সারের মূল্য সমন্বয় করতে অর্থ বিভাগের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শাখা সুপারিশ করে। তবে সারের মূল্য বাড়িয়ে জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো অস্থিরতা চায় না সরকার। ব্যয়ের ক্ষেত্রে অস্বস্তি থাকলেও চলতি অর্থবছরে ফসল উৎপাদনে স্বস্তির আভাস দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। এ বছর মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ৬৫ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন।

সর্বশেষ তথ্যমতে, ধারণা করা হচ্ছে ফসলের মোট উৎপাদন হবে ৪ কোটি ৭১ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন বেশি। এর মধ্যে আমনের উৎপাদনও বেশি হবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। আমনের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দেড় কোটি মেট্রিক টন। যেখানে উৎপাদন হতে পারে ১ কোটি ৫৬ লাখ মেট্রিক টন। এ ছাড়া আউশ পাওয়া যাবে ৩৪ লাখ ৫২ হাজার টন, বোরোর ফলন হবে ২ কোটি ৯ লাখ ৫১ হাজার টন, গমের ফলন হবে ১২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন ও ভুট্টা ৫৮ লাখ ৭৫ হাজার টন।

 

 

এসবি/এমই