কৃষক ঠকছে বাজারে কাঁদছে জমিতেও


সাহেব-বাজার ডেস্ক : এ বছর দেশে বর্ষায় তেমন বৃষ্টি হয়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গত চার দশকের মধ্যে এবারের বর্ষা মৌসুমে সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। প্রতি বছর জুলাইয়ে গড়ে ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এ বছর হয়েছে ২১১ মিলিমিটার। আর আগস্টেও বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম। ফলে চলতি মৌসুমে আমন ধানের ক্ষেত এবং অন্যান্য ফসলের ক্ষেতে দিতে হচ্ছে বাড়তি সেচ।

এদিকে সেচ দেওয়ার জন্য সময়মতো মিলছে না বিদ্যুৎ। বেড়েছে ডিজেল এবং ইউরিয়া সারের দাম। ঠিক এমন সময় সিন্ডিকেট করে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। সরকার বলছে দেশে সারের সংকট নেই। কৃষক বুঝে উঠতে পারছে না, তার এখন কী করা উচিত। এর পর উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য তো রয়েছেই। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষক।

কৃষকের এ দুর্দিন সাময়িক নয়, অনেকটা স্থায়ীই হয়ে গেছে। কারণ, প্রকৃতির বৈরী আচরণে কৃষিকাজ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্ষায় বৃষ্টি হচ্ছে না, শীতে শীত থাকছে না। দাবদাহ লেগেই আছে; অতিবৃষ্টি হচ্ছে অসময়ে। এসবের সঙ্গে আছে নানা রকমের দূষণ। দূষণের কারণে ফসলে দেখা দিচ্ছে রোগ-বালাই।

কৃষি-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ বছর প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে আমন চাষ কম হয়েছে। আউশেও উৎপাদন কম হয়েছে। আসন্ন বোরো নিয়ে এখন চিন্তা। এ কারণে খাদ্য উৎপাদনে বড় আঘাত আসতে পারে। তারা বলছেন, আমন ধানের উৎপাদন কমছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আসন্ন বোরো মৌসুমেও ধানচাষে ভাটা পড়বে। সেচ-সারের অভাব ও বাড়তি খরচায় বোরোতে অনাগ্রহ দেখাবেন কৃষকরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বন্যা ও খরার কারণে আমন আবাদ কমেছে। আসন্ন বোরো সেচনির্ভর হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম বড় ফ্যাক্ট হয়ে দাঁড়াবে। অতিরিক্ত খরচের কারণে অনেক কৃষক ধানচাষে অনাগ্রহী হবেন। তার পরও যারা চাষ করবেন, তারা ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে থাকবেন শঙ্কায়। কৃষি কাজে খরচ বাড়ায় ভোক্তাকে বেশি দামে চাল খেতে হবে। সব মিলিয়ে চালের জন্য দারুণ দুঃসময় আসছে।

দেশে উৎপাদিত ধান থেকে চাল সবচেয়ে বেশি আসে বোরো মৌসুমে। বর্তমানে দেশে মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশই আসে বোরো মৌসুমে। ৩৯ শতাংশ আসে আমন ধান থেকে। বাকিটা আউশ থেকে আসে। ফলে চলতি আমন ও আসন্ন বোরোর উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ধান উৎপাদনে যত খরচ বেড়েছে কৃষকের: ডিজেলচালিত মোটরে দেশের ৭০ শতাংশ অর্থাৎ ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া হয়, যা বিঘার হিসাবে দুই কোটি ৫২ লাখ ২০ হাজার। সম্প্রতি প্রতিলিটার ডিজেলের দাম ৮০ থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়। এর পর ৫ টাকা কমিয়ে করা হয় ১০৯ টাকা।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, বিঘাপ্রতি জমিতে সেচ ও চাষ দিতে দরকার পড়ে ২০ লিটার ডিজেল। ডিজেলের দাম বাড়ায় এ বছর সেচে কৃষকের বিঘাপ্রতি খরচ পড়বে ২ হাজার ৫৮০ টাকা। গত বছরের তুলনায় এ বছর বিঘাপ্রতি সেচ ও চাষ দিতে কৃষকের বাড়তি গুনতে হবে ৯৮০ টাকা। মাড়াই ও পরিবহন কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহৃত হয়। এ ক্ষেত্রে খরচ বাড়বে বিঘাপ্রতি ৩৫০-৪০০ টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত খরচ পড়বে এক হাজার ২৫০ টাকারও বেশি।

অন্যদিকে শুধু বোরো মৌসুমে তিন কোটি দুই লাখ বিঘা জমির জন্য কৃষকের জ্বালানি তেল বাবদ অতিরিক্ত খরচ হবে ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। এ ছোড়া ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ছয় টাকা বাড়ায় চলতি আমন ও পরবর্তী বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনে কৃষকের প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা খরচ বাড়বে বলে জানিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সার ও সেচের খরচ বাদে আমন-বোরো মৌসুমে সবচেয়ে বড় খরচ হয় কৃষি শ্রমিকের পেছনে। শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সেই হিসাবে প্রতি বিঘা জমিতে ধান রোপণ করতে দুই থেকে তিন হাজার টাকা লেগে যায়। এর পর নিড়ানিতে খরচ হয় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। ধান কাটতে ৩ হাজারের বেশি টাকা চলে যায়।

এখানেই শেষ নয়, মাড়াই খরচ বিঘায় পড়ে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। এ ছাড়া কীটনাশক খরচ ১ হাজার টাকা। এর মধ্যে আবার ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধি এবং সব রকমের সারের সংকট। এ সবের কারণে সারে যাচ্ছে বাড়তি খরচ। এত খরচের পর হিসাব করে দেখা যায়, ধান চাষ করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

খাদ্য উৎপাদন কমার আভাস
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ। দুই-তিন মাস পরপর সংস্থাটি বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত জুলাইয়ে তারা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়। তবে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছর চালের উৎপাদন কমবে। তারা বলছে, চলতি মৌসুমে উৎপাদন হতে পারে তিন কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার টন।

তবে দেশে চালের চাহিদা এর চেয়ে বেশি। এ কারণে প্রতি বছর কম-বেশি চাল আমদানি করতে হচ্ছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সব ধরনের চাল মিলিয়ে আমদানি হয়েছে ১০ লাখ টন। এ বছর আমদানির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। উৎপাদন কম হলে আমদানি দুই থেকে চারগুণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে এখন চলছে আমন মৌসুম। চারা রোপণের শুরুতে দেখা দিয়েছে সারের সংকট। ডিলার ও বিক্রেতাদের দোকানে ঘুরেও কৃষক সার পাচ্ছেন না। পেলেও গুনতে হচ্ছে কয়েক গুণ বেশি দাম। কৃষকদের অভিযোগ, বেশি মুনাফার আশায় কৃত্রিমভাবে সারের সংকট তৈরি করা হয়েছে। ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট টিএসপি, ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়ায় ফসফেট), এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সারের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিলেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও একটি চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ অবস্থায় সারের সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিংয়ের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কার্যক্রম চলবে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকছে। সারবিষয়ক যে কোনো প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চলমান আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সেচ নিশ্চিতকরণের জন্য রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘বোরো মৌসুমে ডিজেলে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি সরকার গভীরভাবে বিবেচনা করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম না কমলে ডিজেলেও আমাদের কিছু একটা করতে হবে, যাতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে। বর্তমানে ডিজেলের দাম অনেক বেশি। এতে বোরো মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আমরা সারে যেমন ভর্তুকি দেই, তেমনি বোরোতে প্রয়োজনে ডিজেলে ভর্তুকি দেওয়া হবে। সরকার গভীরভাবে এ বিষয়টি বিবেচনা করছে।’

এসবি/এমই