করোনা প্রতিরোধে এখন হাল ছাড়লে সামনে বিপদ আছে


বাংলাদেশ করোনাভাইরাস সংক্রমণের দেড়শ’ দিন পরও সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। গত ৮ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম ৫০ দিনে মারা গেছেন ১৪৫ জন ও শনাক্ত হয়েছেন ৫৪১৬ জন। প্রথম ৫০ দিনে নমুনা পরীক্ষা করা হয় ৪৬ হাজার ৫৮৯ জনের। শনাক্ত হন ৫ হাজার ৪১৬ জন। তখন শনাক্তের হার ছিল ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা শনাক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৪৪ হাজার ২০ জন।

করোনা শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম ৫০ দিনের শনাক্তের হারের তুলনায় এখন শনাক্তের হার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ শনাক্তের হার ঊর্ধ্বমুখী। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে শনাক্তের হার ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। সুস্থতার হার ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ। আমরা মনে করি, এ বাস্তবতায় সাফল্য দাবি করে আত্মপ্রসাদ লাভের কোন সুযোগ নেই এবং করোনা মোকাবিলায় সাফল্য দাবি অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক এবং অগ্রহণযাগ্য।

করোনা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক করা কিছু নির্দেশক থেকেই বোঝা যায়, একটি দেশে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে কিনা। সংক্রমণ কমছে কিনা, তা বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায় ‘আরটি’র মান কত? একজন করোনা রোগীর মাধ্যমে কতজন সংক্রমিত হন, সেটাই সংক্রমণ হার বা ইফেকটিভ রিপ্রডাকশন রেট (আরটি)। আরটি-১-এর বেশি থাকার অর্থ সংক্রমণ পরিস্থিতি বিপজ্জনক পর্যায়ে। এটি অন্তত ২ সপ্তাহ একের নিচে থাকলে বলা যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তা কমতির দিকে। এছাড়া রোগী শনাক্তের হার ও মৃত্যু এবং উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু কমে এলে বোঝা যায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসছে।

কিন্তু দেশে এসব নির্দেশকের বিশ্লেষণ সুস্পষ্ট নয়। করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদফতর। একদিকে প্রয়োজনের তুলনায় পরীক্ষা কম হচ্ছে। অন্যদিকে পরীক্ষার ফলাফলে সামঞ্জস্য থাকছে না। সংক্রমণ কমার জন্য যেসব উদ্যোগ প্রয়োজন, সেগুলোর কোনটাই ঠিকমতো হচ্ছে না।

উল্টো নানান কারণে পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। নমুনা সংগ্রহ অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংক্রমণ এক জেলায় কমলে অন্য জেলায় বাড়ছে। ফি নির্ধারণসহ নানা ধরনের শর্ত আরোপ করায় মানুষ পরীক্ষা করতে আসছে না। উপসর্গ নেই এমন সন্দেহজনকদের পরীক্ষা করা হচ্ছে না।

এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে গেছেন এমন লোকজনদের কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে না। দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যার কারণে নমুনা পরীক্ষার জন্য রোগীও কম আসছে। বৃষ্টির কারণেও লোকজন কম বাইরে বের হচ্ছেন। সংক্রমণের প্রকৃত গতি-প্রকৃতি জানার জন্য যেসব উপাত্ত দরকার, সেগুলো নিয়ে এক ধরনের লুকোচুরি করা হচ্ছে। ফলে কোনোভাবেই করোনার সংক্রমণের সঠিক চিত্র এখন পাওয়া যাচ্ছে না।

দেশের কোথাও এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেই। শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। গণপরিবহন, কলকারখানা, অফিস-আদালত, দোকানপাট, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। জুনে সংক্রমণের মাত্রাভেদে জোনভিত্তিক লকডাউনের কথা বলা হলেও তা রহস্যজনক কারণে কার্যকর হয়নি।

আর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দু-এক এলাকা লকডাউন করে যে কাজ হবে না সেটা বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছেন। পুরো রেড জোন একসঙ্গে লকডাউনের পরামর্শ ছিল তাদের। কিন্তু কেউ তাদের কথায় কর্ণপাত করেনি। অর্থাৎ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, করোনা নিয়ন্ত্রণের দিকে মনোনিবেশ না করে উল্টো হাল ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ যেন সবকিছু নিয়তির কাছে সপে দিয়েছে। কিন্তু এভাবে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকলে এবং সেটা নিয়ন্ত্রণে কোনরকম পদক্ষেপ না নেয়া হলে দেখা যাবে, বিশ্বের অন্যান্য দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসেছে কিন্তু বাংলাদেশে সংক্রমণ কমেনি।

এটি হলে পৃথিবীর কোন দেশ বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়াবে না, যোগাযোগ রাখবে না। ফলে দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পৃথিবীর অনেক দেশই বাংলাদেশিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। তখন হয়তো আরও দেশ করবে। পরিণতিতে জীবন তো বটেই জীবিকাও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই কোনো অবাস্তব সাফল্যে আনন্দিত না হয়ে কীভাবে সংক্রমণের হার কমিয়ে আনা যায় এখন সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলেই আমরা মনে করি।