করোনার থাবায় বিপর্যস্ত রাজশাহী অঞ্চল

  • 159
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনাভাইরাসের থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চল। কোনভাবেই করোনার বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। বিভাগে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই।

পরিস্থিতি সামাল দিতে চাঁপাইবাবগঞ্জে চলছে দুই সপ্তাহের আঞ্চলিক লকডাউন। সেই জেলায় করোনার ভারতীয় ধরণও শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিতে থাকা নওগাঁতেও আঞ্চলিক লকডাউন দেয়া হয়েছে। রাজশাহীতে চলাচলের ওপর আরোপ করা হয়েছে নতুন বিধিনিষেধ। প্রশাসনের নির্দেশে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে নগরীতে দোকানপাট বন্ধ করা হচ্ছে। তারপরও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁয় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। সংক্রমণ বাড়ছেই।

এসব জেলার রোগীরা চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ছুটে আসছেন। কিন্তু শয্যা সংকটে সব রোগীকে ভর্তি নিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু অক্সিজেনের স্যাচুরেশন যাঁদের কমেছে, কেবল তাঁরাই হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন। তারপর এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন রোগী মারা যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সর্বোচ্চ ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মারা যাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১০জন করোনা পজিটিভ ছিলেন। আর বাকি ছয়জন উপসর্গে মারা গেছেন। মৃতদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নয়জন, রাজশাহীর ছয়জন এবং নওগাঁয় একজন রোগী ছিলেন। আইসিইউ এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁরা মারা যান। এছাড়া শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মারা গেছেন আরও আটজন। এদের মধ্যে চারজন করোনা পজিটিভ ছিলেন।

এদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন ৩৭২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সর্বোচ্চ ১১৮ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন রাজশাহীতে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০৯ জন, নওগাঁয় ২৪ জন, নাটোরে ৩৭ জন, জয়পুরহাটে ৩৬ জন, বগুড়ায় ১৫ জন, সিরাজগঞ্জে ১৪ জন এবং পাবনায় ১৯ জন নতুন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন: রামেক হাসপাতালে করোনায় আরও আটজনের মৃত্যু

প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ রোগীর চিকিৎসা দেয়াটাই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জন্য রোগীদের জায়গা সংকুলানই একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সংক্রমণ না কমলে কয়েকদিনের মধ্যে এ সমস্যা প্রকট হতে পারে। এ নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তাঁরা।

উত্তরাঞ্চলের বৃহৎ রামেক হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা এক হাজার ২০০টি। এর মধ্যে ২৩২টি শয্যা করা হয়েছে শুধুমাত্র কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায়। এ জন্য বার্ন ইউনিটসহ কয়েকটি ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিট করা হয়েছে। তারপরও জায়গা সংকুলান সম্ভব হচ্ছে না। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যার জন্য রোগীদের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। মাত্র ১৫টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে রামেক হাসপাতালে। আইসিইউ না পেয়ে রোগীরা মারা যাচ্ছেন।

এদিকে রামেক হাসপাতালে জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ দিন বন্ধ থাকা সদর হাসপাতাল চালুর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার ড. হুমায়ুন কবীর সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করতে যান। এ সময় তাঁর সঙ্গে রামেক হাসপাতালের পরিচালকসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এই হাসপাতালটি এবার চালু হতে পারে।

রামেক হাসপাতাল পরিচালক বলেন, রামেক হাসপাতাল ছাড়া রাজশাহীতে আর কোন হাসপাতালে ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই। থাকলে সেটাকে করোনার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেত। তাই সব রোগীর চাপ রামেক হাসপাতালে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের রোগীরা এখানে আসছেন চিকিৎসা নিতে। এখন জায়গা সংকুলানই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

তিনি জানান, রাজশাহী সদর হাসপাতালটি চালু করা গেলে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড সেখানে স্থানান্তর করা যাবে। তাহলে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বাড়ানো যাবে। সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই বলে সেখানে করোনার চিকিৎসা হবে না। সর্বশেষ রামেক হাসপাতালের এক নম্বর ওয়ার্ডটিকে করোনা ওয়ার্ড করার চেষ্টা চলছে। এখন সাধারণ রোগী অন্যত্র না সরালে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও জানান, রামেক হাসপাতালে কোভিডের চিকিৎসায় চিকিৎসকেরও সংকট আছে। তাদের চাহিদার ভিত্তিতে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর ১৫ জন চিকিৎসককে এখানে দিয়েছেন। তবে তাঁরা এখনও আগের কর্মস্থলে আছেন। দ্রুত হয়ত তাঁরা চলে আসবেন। কিন্তু নার্সের সংকটের সমাধান হচ্ছে না।

এদিকে রামেক হাসপাতালে আরও করোনা রোগী ভর্তি করা হলে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহও বাড়াতে হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল পরিচালক। এ জন্য ২০ হাজার লিটার লিকুইড অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতার আরেকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখন যে সিলিন্ডার আছে সেটিতেও ২০ হাজার লিটার লিকুইড অক্সিজেন রাখা যায়। লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড এই সিলিন্ডারে অক্সিজেন দিয়ে যায়। আরেকটি সিলিন্ডার বসাতে এই প্রতিষ্ঠানটিকেই বলা হয়েছে।

এসবি/আরআর/এমই


  • 159
    Shares