কম খরচের বিদ্যুৎ উৎপাদনে অবহেলা


সাহেব-বাজার ডেস্ক: কাপ্তাই হ্রদে পানির ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে আরও কয়েকটি প্ল্যান্ট বসালে কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব। এমনটাই মনে করছেন পিডিবির একাধিক প্রকৌশলী।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মো. এটিএম আবদুজ্জাহের বলেন, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি সচল আছে। পানির অভাবে অন্য চারটি চলছে না। বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা (এমএসএল) ৭৮ ফুট। পানির উচ্চতা ৭০ ফুট থাকা পর্যন্ত এটি চলতে থাকবে। আর পানির উচ্চতা ৯৮ ফুট হলে সব ইউনিট একসঙ্গে সচল করা সম্ভব। তাতে প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি বের হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় ২৪০ মেগাওয়াট।

গ্যাস কিংবা ফার্নেস তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে ইউনিটপ্রতি খরচ অনেক বেশি। ১৬ টাকার ওপরে তো বটেই…। তাই সরকার গ্যাস কিংবা ফার্নেস তেলের পরিবর্তে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। সেই সঙ্গে কয়লা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আমদানির নীতিগ্রহণ করে। আদানি গ্রুপ থেকে যে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে, তা কয়লা ব্যবহার করেই উৎপাদিত।

বিশ্ববাজারে বর্তমানে কয়লার দাম হিসাব করলে প্রতিইউনিট বিদ্যুতের দাম কোনোভাবেই ১০ টাকার নিচে নামছে না। অথচ কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত প্রতিইউনিট বিদ্যুতের দাম এখনো মাত্র এক টাকা। ভরা বর্ষায় পাঁচটি ইউনিটের সব চালু হলে উৎপাদন খরচ ৫৫ পয়সায় নেমে আসে। তার পরও সরকারের নীতিনির্ধারক ও কর্তাব্যক্তিদের সেদিকে দৃষ্টি একেবারেই ক্ষীণ।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম ঘুরে গেছেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। বাঁশখালীতে এস আলম কোম্পানির কয়লাভিত্তিক এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। গত শতকের ষাটের দশকে অন্যায়ভাবে বাঁধ দিয়ে এই প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছিল। এতে অনেক লোককে দেশান্তরী হতে হয়েছিল। তিনি বলেন, আমাদের দেশে পানির যে অবস্থা তাতে পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প এখানে চালানো সম্ভব নয়। তাই এই প্রকল্পের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

গত দেড় দশক ধরে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার দায়িত্ব টানা পালন করে যাচ্ছেন তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এই কথা বললেও ইতিপূর্বে সরকার বা মন্ত্রীরা কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায় তা নিয়ে কথা বলেছেন। আরও একাধিক প্ল্যান্ট বসিয়ে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সেখান থেকে বেশি বিদ্যুৎ পাওয়ার কৌশল নিয়েও কথা বলেছেন। আবার কাপ্তাই হ্রদ খনন করে পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানো নিয়েও পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ (পিডিবি) সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে মত দিয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গত শতকের ষাটের দশকে কাপ্তাই বাঁধ দেওয়ার অর্ধেক আদিবাসী দেশান্তরী হয়েছে সত্য, কিন্তু এখন কাপ্তাই হ্রদের পানির ওপর ভর করেই বেশিরভাগ উপজেলায় যাওয়া আসা করতে হয়। হ্রদের বেশিরভাগ অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত অনেক এলাকায় নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়। আবার চট্টগ্রামসহ সারাদেশের মিঠাপানির মাছের একটি বড় জোগানও আসে কাপ্তাই হ্রদ থেকে। কিন্তু হ্রদ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে মাছের সরবরাহও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। শুকনো মৌসুমে ধরা পড়ে যায় কাতলা, রুই, কালবাউশ, বোয়াল, আইড়সহ বেশির ভাগ মা মাছ।

১৯৬২ সালে কাপ্তাই এলাকায় কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয় বিশাল জলাধার। তিনটি নদীর মুখ বন্ধ করে ওই জলাধার তৈরির পর মুহূর্তেই ডুবে যায় রাঙামাটি শহর। তলিয়ে যায় পানিতে। সেই সময়ে রাঙামাটি এলাকায় বসবাসরত অর্ধেকের বেশি মানুষকে দেশান্তরী হতে হয়। তাদের কেউ কেউ রাঙামাটির অন্য এলাকা, বান্দরবানের গহিন বন কিংবা খাগড়াছড়িতে বেঁচে থাকার আশায় চলে যায়। আদিবাসীদের বড় একটি অংশ চলে যায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য আসাম ও ত্রিপুরায়। এই বাঁধ কেন্দ্র করে আদিবাসীদের মনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয় তা আর কোনো দিন নেভেনি। বাঁধের কারণে পাহাড়িদের অস্তিত্ব, সভ্যতার পাশাপাশি তাদের সব আবাদি জমিই পানির নিচে তলিয়ে যায়। কিন্তু ছয় দশক পর বদলে গেছে পাহাড়ি মানুষের জীবন। স্বাধীনতার পর অনেক বাঙালিও বসবাস শুরু করে পাহাড়ে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে জমি বরাদ্দ দিয়ে পাহাড়ে বসবাস করার অনুমতি দেন। স্থানীয় ভাষায় তারা সেটেলার নামে পরিচিত। এখন পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথ হলো নৌরুট। সে সঙ্গে হ্রদে মাছ চাষ করেও হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন। যদিও যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি করা হয়েছিল, সেই বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন আর প্রধান লক্ষ্যে নেই, গৌন হয়ে গেছে।

কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. এটিএম আবদুজ্জাহের বলেন, যারা কর্তাব্যক্তি, তারাই যদি এটা নিয়ে চিন্তা না করেন, তা হলে আমাদের কী আর করার আছে? তিনি বলেন, বর্ষাকালে হ্রদ ভরা থাকলে এই প্রকল্পের পাঁচটি ইউনিটই চালানো সম্ভব।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদে পানি ধরে রাখার বিষয়টিও জোরেশোরে আলোচনায় আসছে। কারণ কর্ণফুলী নদীতে উজানের পানি কমে গেলে লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে উঠে যায়। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হুমকি তৈরি হয়। সেই সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে পানি সরবরাহও সংকটে পড়ে। কর্ণফুলী নদীর পানির উৎসও কাপ্তাই হ্রদ। চট্টগ্রাম শহরে যে পরিশোধিত পানি সরবরাহ করা হয় তার প্রধান উৎস কর্ণফুলী। চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী একেএম ফজলুল্লাহ আমাদের সময়কে বলেন, কাপ্তাই হ্রদ খনন করে এর পানির ধারণক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা না হলে কর্ণফুলীর পানিপ্রবাহ কমে যাবে। এতে সাগর থেকে লবণাক্ত পানি উজানে উঠবে। এমনটি হলে ওয়াসা পরিশোধনের জন্য মিঠাপানি পাবে না। কাজেই চট্টগ্রাম শহর রক্ষা করতে হলে অবশ্যই কাপ্তাই হ্রদের পানির ধারণক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।

এসবি/এমই