উত্তপ্ত রাজশাহী, আব্বাসকে আ.লীগ থেকে অব্যাহতি

  • 40
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক: বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল করা ‘পাপ হবে’- এমন বক্তব্যের অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীর বিরুদ্ধে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনীতির মাঠ। বঙ্গবন্ধুর অবমাননার অভিযোগে তাঁর শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাও। মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাও হয়েছে থানায়।

সোমবার রাতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল মমিন বোয়ালিয়া থানায়, ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন আনার রাজপাড়া থানায় এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌহিদুল হক সুমন চন্দ্রিমা থানায় মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করতে এজাহার দাখিল করেন। তবে পুলিশ নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি আবদুল মমিনের এজাহার মামলা হিসেবে রেকর্ড করেছে। একই অভিযোগের জন্য একই আইনে এজাহার দেওয়ায় অন্য দুটি মামলা রেকর্ড হয়নি।

এর আগে গত সোমবার রাত থেকে দুটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। বলা হচ্ছে অডিও দুটির কথোপকথন আব্বাসের। একটি অডিওতে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ করলে ‘পাপ হবে’ এমন কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। অন্যটিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের সমালোচনা করা হচ্ছে। ঘরোয়া বৈঠকের ওই কথোপকথমে অশ্লীল ভাষায় গালাগালও রয়েছে। অডিও দুটি ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহীতে তোলপাড় শুরু হয়।

মেয়র আব্বাস পবা উপজেলার কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর বক্তব্যের বিষয়ে বুধবার বিকালে জরুরি সভা করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ। সভায় তাঁকে আহ্বায়কের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, উপজেলা আওয়ামী লীগ বহিষ্কার করতে পারে না। তাই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হবে। তিনদিনের মধ্যে তাঁকে জবাব দিতে হবে। এই জবাব আসার পর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য কাগজপত্র আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে পাঠানো হবে।

এদিকে আব্বাসের শাস্তির দাবিতে মাঠে নেমেছেন কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাঁরা কাটাখালী বাজারে বিক্ষোভ মিছিল করেন। মিছিল থেকে আব্বাসের শাস্তি চেয়ে নানারকম শ্লোগান দেওয়া হয়। পরে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল আলম রিপন। সমাবেশ থেকে বক্তারা আব্বাসের বিরুদ্ধে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। নইলে তাঁরা বৃহস্পতিবারও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।

এদিকে মেয়রের অডিও ক্লিপ ইস্যুতে এলাকায় উত্তেজনা থাকায় কাটাখালী বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দুপুরে বিক্ষোভ চলাকালে কয়েকজন নেতাকর্মীরা কাটাখালী বাজারের ‘আব্বাস চত্বর’-এ ভাঙচুরের চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাঁধা দেয়। এ সময় উত্তেজনা দেখা দেয়। তখন পুলিশ আবদুল আউয়াল নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে আটক করে। এতে উত্তেজনা আরও বাড়ে। নেতাকর্মীরা মহাসড়কে বসে পড়েন। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ আউয়ালকে ছেড়ে দেয়। এরপর দুপুরে নেতাকর্মীরা কর্মসূচি শেষ করেন।

মেয়র আব্বাসের শাস্তির দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের রাজশাহী জেলা ও মহানগর ইউনিট কমান্ড সকাল ১০টায় নগরীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক রুহুল আমিন প্রমানিক এতে সভাপতিত্ব করেন। বক্তব্য রাখেন, মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার ডা. আব্দুল মান্নান, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান প্রমুখ। বক্তারা বলেন, মেয়র আব্বাস আলী জামায়াত-বিএনপির এজেন্ট। তাঁকে কে দুই দুইবার নৌকা প্রতীক এনে দিয়ে মেয়র বানিয়েছে তাঁদেরও চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে।

বঙ্গবন্ধুকে অবমাননা করার অভিযোগে মেয়র আব্বাস আলীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে রাজশাহীর সাবেক ছাত্রলীগ ফোরাম। বুধবার বিকালে সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট এই কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়। এর আগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ থেকে মেয়র আব্বাস আলীকে রাজশাহীতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। শহরের যেখানে দেখা যাবে, সেখানেই তাঁকে ‘গণধোলাই’ দেওয়া হবে বলেও কেউ কেউ ঘোষণা দেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা নফিকুল ইসলাম সেন্টু। শফিকুজ্জামান শফিকের পরিচালনায় বক্তব্য দেন- সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান বাবু, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইশতিয়াক আহমেদ লিমন, আবদুল মমিন, মীর তৌহিদুর রহমান টিটু প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার প্রতিবাদে বুধবার ছাত্রমৈত্রীর রাজশাহী জেলা ও মহানগর প্রতিবাদ সভা করেছে। সাহেবাবাজারে ওয়ার্কার্স পার্টির দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তারা বলেন, মেয়র আব্বাস জামায়াতের পৃষ্টপোষক। তিনি আওয়ামী লীগের লেবাসে তিনি অন্তরে রেখেছেন সাম্প্রদায়িকতা। সভা থেকে আব্বাস আলীর শাস্তি দাবি করা হয়। মেয়র পদ থেকে তাঁকে অপসারণেরও দাবি তোলেন বক্তারা। সভায় ওয়ার্কার্স পার্টির রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক দেবাশিষ প্রামানিক দেবুও উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন নগর ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি ওহিদুর রহমান ওহি। জেলার সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমানের পরিচালনায় প্রতিবাদ সভায় ছাত্রমৈত্রীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।

গত সোমবার রাতে দুটি অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন মেয়র আব্বাস আলী। তিনি অফিস করছেন না। মোবাইল ফোনও বন্ধ। আব্বাসের শ্বাশুড়ি ফাহিমা বেগম পবার পারিলা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়েছেন। আগে ভোটের মাঠে আব্বাস আলী ব্যস্ত থাকলেও মঙ্গলবার থেকে দেখা যাচ্ছে না। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেও জানা যায়নি আব্বাস আলী এখন কোথায় আছেন। তবে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে আব্বাস আলী বলেছেন, অডিওটি এডিট করা। এসব কথা তিনি কাউকে বলেননি। তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে লালন করেন।

এসবি/আরআর/জেআর


  • 40
    Shares