‘উজান’ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সব যায়গায় শোকের ছায়া

  • 1
    Share


নিজস্ব প্রতিবেদক : দিনের একটা সময় কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক কাটাতে প্রিয় তার বাগান বিলাসে। বাগান বিলাসটা প্রধান ফটকের ঠিক পাশেই। এখানেই কাটতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেই বাগান বিলাসও নুয়ে পরেছে। হাসান আজিজুল হকের মৃত্যুর খবরে শোক ছিল গোটা বিশ্ববিদ্যালয় হাউজিং সোসাইটিতে (বিহাস)।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদে বিভিন্ন যায়গা থেকে ছুটে আসেন সহকর্মী, স্বজন, শিক্ষার্থী, ভক্ত এবং শুভাকাক্সক্ষীরা। ছিল না মানুষের কোন কমতি। কারও মুখে কথা নেই। সবাই ছিলেন শোকে। সবাইকে দেখে মনে হচ্ছিল হারিয়েছেন তার প্রিয়জনকে।

সারারাত তার প্রিয় নিবাস উজানেই ছিলেন হাসান আজিজুল হক। শেষবারের মতো এক নজর দেখতে সকালেও ছিল শুভাকাক্সিক্ষদের পদচারণা। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার সময় উজান চিরবিদায় নিয়ে হাসান আজিজুল হককে রাবির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হয়। এখানে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসেন কবি, সাহিত্যিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সহকর্মী, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ভক্ত ও শুভাকাক্সিক্ষরা। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় জানাজার নামাজ।

শ্রদ্ধা জানানোর সময় উপস্থিত ছিলেন, হাসান আজিজুল হকের ছেলে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইমতিয়াজ হাসান। এছাড়াও ছিলেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মো. জাকারিয়া, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলামসহ মুক্তিযোদ্ধা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, হাসান আজিজুল হক সবসময় আমাদের আগলে রাখতেন। তিনি ছিলেন আমাদের প্রেরণার উৎস। ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে জাতিকে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তিনি উজ্জীবিত করেছেন। আমরা এক প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষকে হারালাম। হাসান আজিজুল হকের চলে যাওয়া আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন সাহসী মানুষের শূন্যতা তৈরি করবে। তার অমর সাহিত্যকীর্তি বাঙালি জাতির ভবিষ্যতের চলার পাথেয় হয়েই থাকবে। তার চলে যাওয়ায় বাঙালি জাতির যে ক্ষতি, তা অপুরণীয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু বলেন, হাসান আজিজুল হকের চলে যাওয়া এক বিশাল নক্ষত্রের পতন। তার চলে যাওয়াতে বাংলা শিল্প-সাহিত্য এক বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়লো। তবে তিনি তার অবদানের জন্য বাঙালির হৃদয়ে চিরজাগরূক থাকবেন। জাতি তার অবদান চিরকাল স্মরণ করবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাই কমিশনার অধ্যাপক সাইদুর রহমান খান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আমাদের চলাফেরা। এক সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাউজিং সোসাইটিতে ছিলাম। এত বড় সাহিত্যিক হলেও ব্যক্তিজীবনে খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন তিনি। তার এ মৃত্যুর জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।

তিনি আরও বলেন, এক সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির দখলে ছিল। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তচিন্তার চর্চার বিকাশে তিনি অগ্রপথিক ছিলেন। তার চলে যাওয়া বাংলা সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি।

নগরীর চৌদ্দপায় এলাকায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাউজিং সোসাইটি বিহাস। এখানেই নিবাস গড়েছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক। বাড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘উজান’। স্ত্রী, তিন কন্যা ও এক পুত্র নিয়ে জীবনের বহু বসন্ত এখানেই কাটিয়েছেন তিনি। এখানেই সাহিত্য চর্চা করে গেছেন গুণী এই কথাসাহিত্যিক। সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী নগরীর বিশ্ববিদ্যালয় হাউজিং সোসাইটিতে (বিহাস) নিজ বাসভবন উজানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন প্রখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক। বার্ধক্যজনিত সমস্যা ছাড়াও হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং হাইপোন্যাট্রিমিয়ায় ভুগছিলেন তিনি। সম্প্রতি তিনি একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। চিন্তা ও স্মৃতিশক্তি কমে যায়।

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালে ২ ফেব্রুয়ারি ভারতের বর্ধমান জেলার জব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে দর্শনে এম. এ. ডিগ্রি লাভ এবং ১৯৭৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুব উল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার। এছাড়া ১৯৯৯ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন হাসান আজিজুল হক। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। ২০১২ সালে তিনি ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি পান। ২০১৯ সালে তিনি স্বাধীনতা পদক পান।

 

এসবি/এমই


  • 1
    Share