উচ্চ খরচে বিদেশ গিয়ে ফতুর অনেক শ্রমিক

  • 1
    Share

সাহেব-বাজার ডেস্ক : ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ করে কম্বোডিয়া যান চাঁদপুরের মাসুম মিয়া। সাত মাস পর গেল সেপ্টেম্বরে শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন তিনি। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তা ছাড়া যে কাজের প্রলোভন দেখিয়েছিল রিক্রুটিং এজেন্সি সেটি দেওয়া হয়নি। ফলে মহামারী করোনা সংকটে খেয়ে না খেয়ে কম্বোডিয়ায় দিন কাটে মাসুমের। কুমিল্লার নাঈমুর রহমান সাড়ে ৪ লাখ টাকায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন ২০১৯ সালের আগস্টে। তিনিও আট মাস পর শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। অর্থাৎ উন্নত জীবনের আশায় প্রবাসে যাওয়া এই দুজন উল্টো ভাগ্যে বিড়ম্বনা ডেকে এনেছেন। বিদেশ যেতে যে টাকা তারা খরচ করেছিলেন, তার প্রায় পুরোটাই ছিল বিভিন্নজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ। মাসুম ও নাঈমের এ গল্প মিলে যায় দেশের হাজারো অভিবাসীর জীবনের সঙ্গে।

অভিবাসন ব্যয় কমাতে শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) চুক্তি আছে বাংলাদেশের। সে অনুযায়ী দেশভেদে বিদেশ যাওয়ার খরচও নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। আবার বিদেশে শ্রমিকের নিয়োগ ব্যয় সহনীয় করতে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের (জিরো মাইগ্রেশন কস্ট) দাবি উঠছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে আকাশচুম্বী অভিবাসন ব্যয় কমছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রবাসী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় নিয়ে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, একজন বাংলাদেশিকে বিদেশে পাড়ি জমানোর জন্য গড়ে ব্যয় করতে হচ্ছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৮৯ টাকা। সে অনুপাতে তাদের মাসিক গড় আয় হচ্ছে ২৩ হাজার ৬৯৩ টাকা। আর অদক্ষ অভিবাসীর ক্ষেত্রে বিদেশ যাওয়ার ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৯২৭ টাকা। দক্ষ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ৪ লাখ ২৭ হাজার ২১৭ টাকা। তবে গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সেই গড় নিয়োগ ব্যয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৪ টাকা। নারীদের নিয়োগ ব্যয় তুলতে সময় লাগে ৫ দশমিক ৬ মাস আর পুরুষদের নিয়োগ ব্যয় তুলতে সময় লাগে ১৯ দশমিক ১ মাস বা প্রায় দুই বছর।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘অভিবাসন ব্যয় কমানোর কিছু পদ্ধতি আছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেগুলো কাজ করছে না। পাসপোর্ট করতে ৭-৮ হাজার টাকা নিচ্ছে সরকার, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিতে লাগে ১০-১২ হাজার টাকা। করোনার আগে বিমান ভাড়া ছিল ৩০০ ডলার, এখন লাগছে ১৫০০ ডলার। মেডিকেল ফি নেওয়া হয় ১২ হাজার টাকা। আইএলওর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে কর্মী নিয়োগ দেবে তার বিমান ভাড়া ও ভিসা খরচ দেওয়ার কথা, আর শ্রমিক দেবে যাওয়ার আগে দেশের ভেতরের খরচ। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সব খরচই শ্রমিককে দিতে হচ্ছে।’

ব্যয় তুলতেই ভিসার মেয়াদ শেষ : বিদেশে অভিবাসনের ক্ষেত্রে কোন দেশের কর্মীদের কত ব্যয় করতে হয় বিষয়টি জানতে ২০১৬ সালে একটি গবেষণা করে বিশ্বব্যাংক। তাতে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতে অন্য দেশের প্রবাসী কর্মীদের কাজ পেতে গড়ে ১ হাজার ৯৫৫ ডলার খরচ হয়। কিন্তু বাংলাদেশি কর্মীদের কাজ পেতে ব্যয় হয় ৫ হাজার ১৫৪ ডলার (৪ লাখ ১২ হাজার টাকা) পর্যন্ত। অন্য দেশের কর্মীরা তিন মাস কাজ করে অভিবাসন ব্যয় তুলতে পারেন। সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের লেগে যায় দেড় থেকে দুই বছর। ততদিনে অধিকাংশ প্রবাসী কর্মীর ভিসার মেয়াদ শেষ। অনেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন, অথবা অবৈধ অভিবাসী হয়ে কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হন। বিবিএসের জরিপেও এ বিষয়টি উঠে এসেছে। প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশি কর্মীরা জমি-বাড়ি বিক্রি করে, সুদে ধার নিয়ে ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশ যান। অদক্ষ কর্মীরা মাসে যে বেতন পান, তাতে বিদেশ যাওয়ার খরচ তুলতেই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অধিকাংশ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী এ দুষ্টচক্রের শিকার। এ কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ কর্মী বিদেশে গেলেও কাক্সিক্ষত মাত্রায় উপার্জন করতে পারছেন না তারা। প্রবাসী জীবনের কঠোর পরিশ্রমের আয়ের বড় অংশই চলে যায় বিদেশ যাওয়ার সময়ের খরচের দায় মেটাতে।

বিবিএসের জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর যেতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় ৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সেখানে মাসিক গড় আয় ৩৮ হাজার ১৩৪ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরবে লাগে ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬। আর সেখানে গড় মাসিক আয় ২২ হাজার ১৪০ টাকা। তৃতীয় অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়ায় খরচ পড়ে ৪ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ৪৮০, গড় মাসিক আয় ২৩ হাজার ৮৯৬ টাকা। চতুর্থ কাতার যেতে খরচ পড়ে ৪ লাখ ২ হাজার টাকা ৭৭৮, সেখানে গড় মাসিক আয় ২২ হাজার ২৯৩ টাকা। আর সবথেকে কম খরচ ওমানে যেতে লাগে ৩ লাখ ৮ হাজার ৪৭ টাকা। আর মাসিক গড় আয় ১৯ হাজার ১৭৭ টাকা। অথচ এসব দেশে সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

৮১ শতাংশ পুরুষ, ৭৭ শতাংশ নারী ঋণগ্রস্ত : ২০২০ সালে করা বিবিএসের জরিপটি সারা দেশের ৮ হাজার অভিবাসীর পরিবারের ওপর পরিচালিত হয়। এতে বলা হয়েছে, বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা যে খরচ করেন তার অধিকাংশই আসে ঋণের উৎস থেকে। এক্ষেত্রে ৮১ শতাংশ পুরুষকর্মী অভিবাসন ব্যয় মেটাতে ঋণ করেছেন। আর নারী কর্মীদের ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ অভিবাসন ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ করেন। ২১ শতাংশ কর্মী নিয়োগ ব্যয় মেটানোর জন্য ঋণ করেননি।

ঋণ করার ক্ষেত্রে অর্থের উৎসে দেখা যায়, বন্ধু-আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ২৮ দশমিক ২ শতাংশ, এনজিও ঋণ ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, মহাজনী ঋণ ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ এবং জমি বন্ধক রেখে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ।

বিবিএসের ওই জরিপ বলছে, অভিবাসীকর্মীদের ঋণ পরিশোধ না করার ব্যর্থতায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। ১২ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষকর্মী ঋণ নেওয়ার পর ফেরত দিতে না পারায় তাদের সম্পত্তি বা জামানতের মালিকানা হারিয়েছেন। নারীকর্মীদের ক্ষেত্রে এ হার ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ বেশিরভাগ নারীকর্মী বিদেশ যাওয়ার পরও তাদের ঋণের টাকাই পরিশোধ করতে পারেন না। এর কারণ হিসেবে দায়ী অধিকাংশ নারীকর্মীর নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরা। এসব নারী একেবারেই শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হন।

 

এসবি/এমই


  • 1
    Share