ইফতারে ৬১ বছরের ঐতিহ্যের জিলাপি

  • 51
    Shares

নিজস্ব প্রতিবেদক: দোকানের কোন সাইনবোর্ড নেই। কিন্তু দোকানটি সবাই চেনে। রাজশাহী নগরীর বাটার মোড়ে অবস্থিত ছোট্ট এই দোকানটির জিলাপির ঐতিহ্য ৬১ বছরের। রাজশাহীর মানুষ এই দোকানের জিলাপিকে ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’ নামেই চেনেন। তাই দোকানের নাম না থাকলেও মেমোতে লেখা হয়েছে ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’। বছরের পর বছর এই দোকানের জিলাপির চাহিদা একটুও কমেনি। রমজানে দোকানের কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়ে আরও বেশি।

রাজশাহী শহরের সব এলাকা থেকেই মানুষ গিয়ে এই দোকানের জিলাপি কিনে আনেন। এবার রমজানের শুরু থেকেই মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলেও জিলাপি কিনতে বাটার মোড়ে আসছেন মানুষ। অন্য বছরের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যা কম হলেও অখুশি নন দোকানটির মালিক চার ভাই। তাঁরা বলছেন, সরকারের বেঁধে দেয়া সময় পর্যন্ত দোকান খুলে তাঁরা জিলাপি বিক্রি করছেন। করোনাকালে ক্রেতার সংখ্যা কম হলেও যাঁরা ‘আসল ক্রেতা’ তাঁরা ঠিকই আসছেন।

বাটার মোড়ের নামহীন এই দোকানে যেখানে জিলাপি তৈরি, সেখানেই বিক্রি হয় তিন প্রজন্ম ধরে। দোকানটির যাত্রা শুরু ১৯৬০ সালে। তখন দোকানের মালিক ছিলেন সোয়েব উদ্দিন। আর তার একমাত্র কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা নামের এক ব্যক্তি। তখন থেকেই এই জিলাপি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে জামিলী সাহার জিলাপির প্যাঁচ দেয়া শিখে যান তার ছেলে কালিপদ সাহা। ১৯৮০ সালে জামিলী সাহা মারা গেলে কালিপদ সাহা প্রধান কারিগর হয়ে ওঠেন। জিলাপির সঙ্গে কালিপদ সাহাও সারা শহরের মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়ে যান ‘কালিবাবু’ নামে।

হঠাৎ ২০১৭ সালের নভেম্বরে কালিবাবু মারা যান। কালিবাবুর সহযোগী হিসেবে ৩০ বছরেরও বেশি সময় কাজ করা সাফাত আলী এখন প্রধান কারিগর। সাফাতের কাছে এখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন আবদুর রাজ্জাক। বৃহস্পতিবার বিকালে জিলাপির প্যাঁচ দিতে দিতে সাফাত আলী বললেন, ‘কালিবাবু আমার ওস্তাদ। ওস্তাদের হাত আমি ধরতে পেরেছি। তাঁর তো সম্মান রাখতে হবে। এই দোকানেরও ঐতিহ্য রাখতে হবে। আমরা পারছি।’

সাফাত আলী জানালেন, কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার না করে সাধারণভাবেই এখানে জিলাপি তৈরি হয়। চালের ময়দা ও মাষকলাই ব্যবহার করা হয় উপাদান হিসেবে। এ উপাদানগুলো পানিতে বিভিন্ন পরিমাণে মিশিয়ে রাখা হয় ছয় থেকে আট ঘণ্টা। এ মেশানো উপাদান দিয়েই তৈরি হয় ঐতিহ্যের জিলাপি। এক্ষেত্রে ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার করা হয় পামওয়েল এবং ডালডা। ক্রেতার চোখের সামনেই এই জিলাপি তৈরি হয়। স্বাদও আছে সেই আগের মতো। তাই চাহিদা বেশি।

কথা বলতে বলতেই সাফাত আলী তুলছিলেন লাল লাল টসটসে জিলাপি। বিভিন্ন বয়সের ক্রেতারা এসে তা কিনছিলেন। আগের বছরগুলোতে রমজানে এই দোকানের সামনে রীতিমতো লাইনে দাঁড়াতে হতো জিলাপি কিনতে। এবার করোনার সংক্রমণ বেশি থাকার কারণে ক্রেতা কম। তারপরও দোকানটিতে ৭০ থেকে ৮০ কেজি জিলাপি বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য বছর রমজানে ২০০ কেজিও ছাড়িয়ে যেত। আর রমজান ছাড়াই সাধারণ দিনে দোকানটিতে বিক্রি হতো অন্তত ১২০ কেজি জিলাপি।

দোকানটি তিন প্রজন্ম ধরে জিলাপির সুখ্যাতি ধরে রেখেছে। কারিগর বদল হলেও একটিও বদলায়নি এখানকার জিলাপির স্বাদ। তাই চাহিদা এত বেশি। দোকানে জিলাপি কিনতে গিয়ে আফসানা রহমান (৩৫) নামে এক গৃহিনী বললেন, ‘বছরের অন্য সময় তো এখানকার জিলাপি খাই, ইফতারে বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। যেহেতু দোকানটা খোলা রয়েছে, তাই চলে এলাম।’

দোকানের অন্যতম মালিক শামীম খান জানালেন, কারিগর কালিবাবু মারা গেলেও জিলাপির স্বাদে কোন পরিবর্তন আসেনি। দোকানের নিজস্ব কৌশলে জিলাপি বানানোর কারণে এটি সম্ভব হয়। কালিবাবুর আগেও এই জিলাপি জনপ্রিয় ছিল, তাঁর মৃত্যুর পরও জনপ্রিয়। তবে এক কারিগর আরেকজনকে শিখিয়ে রাখেন। স্বাভাবিক সময় হলে এই রোজায় শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত- সবখানের লোক আসতেন জিলাপি কিনতে। লকডাউনের কারণে সবাই আসতে পারছেন না। যাঁদের বাড়ি কাছে, কেবল তাঁরাই আসতে পারছেন। ক্রেতা কম হলেও তিনি খুশি।

দোকানের নাম প্রসঙ্গে শামীম বলেন, জিলাপির চাহিদার কারণে সাইনবোর্ড তৈরির দরকার পড়েনি। অবশ্য পঞ্চাশের দশকে একটা সাইনবোর্ড ছিল। তখন নাম ছিল ‘রাণীবাজার রেস্টুরেন্ট’। সেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর আর সাইনবোর্ডের দরকার পড়েনি। ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’ নামেই দোকান চলে। এই নামে দোকান পরিচিত বলে মেমোতে এটিই লেখা হয়েছে।

দোকানটিতে চার মাস আগে জিলাপির দাম কেজিতে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এখন কেজিপ্রতি দাম ১৩০ টাকা। এর আগে টানা ৯ বছর জিলাপির দাম ছিল কেজিপ্রতি ১২০ টাকা। দোকানের আরেক মালিক সোহেল খান (৩৮) বললেন, ‘আমি তো এই দোকানে জিলাপির কেজি ১৬ টাকা দেখেছি। এখানে অহেতুক দাম বাড়ানো হয় না। উপকরণের দাম কিছু বাড়লেও জিলাপির দাম বাড়ে না। কিন্তু উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে জিলাপির দামও বাড়াতে হয়।’

এসবি/এসএসকে/জেআর


  • 51
    Shares