আমাদের লোভ ও নদীর শোকগাথা

  • 1
    Share

মু. সোহরাব আলি: পানির অপর নাম জীবন বলেই মানবসভ্যতার গোড়াপত্তন হয়েছিল সমুদ্র বা নদীতীরবর্তী এলাকায়। অনাদিকাল থেকে নদীকে কেন্দ্র করেই সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে। সূচিত হয়েছে মানবজাতির সব প্রগতি। তাই পানি ও জীবন সমার্থক। জীবনাচারে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে পানির ব্যবহার নেই। বিভিন্নমুখী প্রয়োজনীয়তার দরুন আগামী দিনে পানিই হবে তরল ডলার। সে প্রেক্ষাপটেই ২০০৩ সালকে জাতিসংঘ ‘আন্তর্জাতিক মিঠাপানি বর্ষ’ ঘোষণা করা হয়েছিল।

বিশ্বে মিঠাপানির ব্যবহার প্রতিবছর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পানির প্রবাহ প্রাকৃতিক হওয়ায় এর সরবরাহ সীমিত। ভবিষ্যতে তীব্র পানিসংকটের কথা চিন্তা করে বহু রাষ্ট্র তাদের পানি ব্যবস্থাপনাকে ভবিষ্যতের চাহিদা মিটানোর উপযোগী করতে নিয়েছে নানা পরিকল্পনা। পানির ঘাটতির দরুন ইতিমধ্যেই উপমহাদেশসহ বিশ্বের অনেক জায়গায় দেখা দিয়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কিন্তু পানির উৎস বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। অনুমান করা হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় পানির নাগাল পাবে না।

পানি পরিবেশের অন্যতম প্রধান উপাদান। পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে অনেক প্রাচীন সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সপ্তদশ শতাব্দীর ‘শিল্পবিপ্লব’ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ‘সবুজ বিপ্লব’ মানবসভ্যতার অনেক উৎকর্ষ সাধন করেছে। তবে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের ব্যাপক অবক্ষয়ও ঘটেছে। উভয় ক্ষেত্রেই পৃথিবীর মাটি, পানি ও বায়ু ভীষণভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত র‌্যাচেল কারসনের ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ এবং ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড কমিশন অন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ‘আওয়ার কমন ফিউচার’ এর সব সাক্ষ্য বহন করে। যুক্তরাজ্যের টেমস নদী, জার্মানির রাইন নদী, দক্ষিণ কোরিয়ার হান নদী, জাপানের দোকাই বে শিল্পদূষণের ঐতিহাসিক সাক্ষী।

শিল্পবর্জ্যের জন্য পানিদূষণের ওপর এডউইন চ্যাডউইক প্রণীত প্রতিবেদন ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ আইনসভায় দাখিল করা হয়। শিল্পদূষণ থেকে রক্ষা পেতে ১৮৪৮ সালে প্রথম ব্রিটিশ আইনসভায় ‘জনস্বাস্থ্য আইন’ পাস করা হয়। পরিবেশদূষণের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য ১৯৭২ সালে সুইজারল্যান্ডের স্টকহোমে ‘বিশ্ব মানব সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বে পরিবেশগত সমস্যা মোকাবিলার জন্য একই বছর জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) গঠিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ‘ধরিত্রী সম্মেলন’-এ তিনটি যুগান্তকারী কনভেনশন গৃহীত হয়। সেগুলো হলো ইউনাইটেড নেশনস ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জ, (ইউএনএফসিসিসি), ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি (ইউএনসিবিডি) এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস কনভেনশন টু কমব্যাট ডিসারটিফিকেশন (ইউএনসিসিডি)। বাংলাদেশ এই কনভেনশনগুলোর সদস্য। ফলে, এগুলোর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনে আমাদের দায় রয়েছে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদী ও জীবন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখানে মানুষের জীবনপ্রণালি ও অর্থনীতি প্রায় পুরোটাই পানির ওপর নির্ভরশীল। এ জনপদ একসময় তেরো শ নদীর দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে সে অবস্থানে আর নেই। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীসহ বর্তমানে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা ৪০৫। এভাবে নদীর সংখ্যা কমতে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে নদীমাতৃক বলারই যৌক্তিকতা কেউ খুঁজে পাবে না। মানুষ নদী হত্যায় নানা কৌশল অবলম্বন করেছে। কেউ কেউ সরাসরি দখলের মাধ্যমে নদীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত করছে। কেউবা নদীতে নানাবিধ বর্জ্য (শিল্প, পৌর, প্লাস্টিক, ইলেকট্রিক, মেডিকেল, কৃষি ও পয়োবর্জ্য) নিক্ষেপ করে দূষণের মাধ্যমে নদীকে ভাগাড়ে পরিণত করছে। এ কারণে নদী তার স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের জীবন ও জীবিকা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদীদূষণ ও দখলের কারণে সুপেয় পানির চরম সংকটে প্রতিনিয়ত মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। অবৈধ দখলের কারণে অবশিষ্ট নদীগুলোর অস্তিত্বও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। অথচ নদী দখল বেআইনি এবং দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী।

কথায় বলে উপকারী গাছে বাকল থাকে না এবং পরিশেষে মৃত্যু। বুড়িগঙ্গার হয়েছে সেই দশা। এত এত সেবা-পরিষেবা (যেমন সুপেয় পানি, মাছ সরবরাহ, পরিবহন-সুবিধা, পরিবেশ শীতল রাখা ও বায়ু শোধন করা) দেওয়ার পরও বুড়িগঙ্গাকে মা কাঁকড়ার ভাগ্যকে বরণ করতে হয়েছে। শুধু বুড়িগঙ্গা কেন? তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদীরও একই দশা। বাংলাদেশের শিল্প ও পৌরদূষণের জ্বলন্ত সাক্ষী ঢাকার চারপাশের চারটি নদী (বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু)। এই নদীগুলোকে সরকার ২০০৯ সালে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। মেঘনা, ভৈরব, ধলেশ্বরী, হালদা, কর্ণফুলী, রূপসা একই পথে এগোচ্ছে। নদীদূষণ ও দখলের মূল কারণ মানুষের লোভ; অতিমাত্রায় লোভ। উপকারীর (নদীর) উপকার অস্বীকার করতেই কি নদীর প্রতি মানুষের নির্মম আচরণ? বিভিন্ন সময় অনেক দখলদার তাদের লোভের কারণে নদীর জায়গা দখল ও মাটি ভরাটের মাধ্যমে নদীকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। নদীকে হত্যা করার অর্থ হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হত্যা করা। লোভের কারণে অন্ধ হয়ে মানুষ এ কথা বুঝতে অসমর্থ যে নদী একটি জীবন্ত সত্তা। এর ভালো লাগা-মন্দ লাগা আছে এবং নদীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। উল্টো মানুষ দূষণ ও দখলের মাধ্যমে গলা টিপে প্রতিনিয়ত নদীকে হত্যা করছে।

আমাদের যোগাযোগব্যবস্থার প্রায় বেশির ভাগই সমুদ্র, নদ-নদী, খাল-বিলের ওপর নির্ভরশীল। সবচেয়ে সাশ্রয়ী যোগাযোগব্যবস্থা হলো নৌপথ। অথচ আজ বাংলাদেশে সমস্ত নদ-নদীর অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। নদীরও একটা ধারণক্ষমতা আছে। নদীর বুকে মাত্রাতিরিক্ত নৌযান (যান্ত্রিক, অযান্ত্রিক) চলছে। কেউ ভাবছে না এত নৌযানের ভার নদী নিতে পারবে কি না। নৌযান থেকে নিঃসরিত কঠিন, তরল ও বায়বীয় বর্জ্য নদীর জলজ পরিবেশের ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। সেখানে জীববৈচিত্র্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।

মানুষের জীবনে নদীর গুরুত্ব এবং নদী সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ২০১৬ সালে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নদীকে একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে ঘোষণা করেন কলম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালত। বাংলাদেশের আদালত ২০১৯ সালে নদীকে আইনি ব্যক্তি বা আইনি সত্তা বা জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের মধ্যে এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবহমান সব নদ-নদী এ মর্যাদা পাবে। ‘নদী রক্ষা কমিশন’-কে তুরাগসহ দেশের সব নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ ও উন্নয়নের নিমিত্ত আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করা হয়। পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, সব উন্মুক্ত জলাভূমি, সমুদ্র, নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, ঝিল, সমুদ্রসৈকত, নদীর পাড়, পাহাড়-পর্বত, টিলা, বন ও বাতাস পাবলিক ট্রাস্ট সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। এসব সম্পত্তি সব নাগরিকের, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের নয়।

সরকার জলজ ও স্থলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থার সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও টেকসই ব্যবহারের লক্ষ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-(২০১৬-৩০)’ নির্ধারণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের বিষয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে সংযোজিত অনুচ্ছেদ ১৮ক–এ বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।’ সেদিক থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ করা এখন সব নাগরিকের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

সরকার নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশদূষণ, শিল্পকারখানা কর্তৃক সৃষ্ট নদীদূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, নৌপরিবহনযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে নদীর বহুমাত্রিক ব্যবহার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করেছে। পানির নিরাপত্তা বিধানকল্পে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির সহজলভ্যতার পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য ‘জাতীয় পরিবেশ নীতি ২০১৮’-তে যথাযথ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ‘নদী-নালা, জলাশয় ও পরিবেশ–সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সকল প্রকার উন্নয়ন পরিকল্পনার পুনর্মূল্যায়ন ও প্রয়োজনমতো পরিবেশ সংরক্ষণ উপযোগী করিতে হইবে।’

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বাংলাদেশের অবদান অতি নগণ্য হলেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির তালিকায় বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য ২০১০ সালে নিজস্ব অর্থায়নে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল গঠন করা হয়। বিশ্বে এটা প্রথম। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের উন্নয়নকে সুসংহত করতে ২০১৩ সালে ‘টেকসই উন্নয়ন কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিশ্বে বাংলাদেশই প্রথম জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ৮২ বছর মেয়াদি ‘বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ গ্রহণ করেছে। দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও সুসংহত করতে পরিবেশ সংরক্ষণকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে।

পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় অবদানের জন্য জাতিসংঘ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ উপাধি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সব কর্মপ্রচেষ্টা সমুন্নত রাখতে অতিলোভী অবৈধ দূষণকারী ও দখলদারদের প্রতিহত করতে হবে। দ্রুত এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।

চীনে একটি প্রবাদ আছে, ‘তোমাদের উৎপাদনক্ষেত্র যদি ধ্বংস হয়ে যায়, আর শহর টিকে থাকে, তবে একদিন শহরও ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি শহর ধ্বংস হয়ে যায়, কিন্তু উৎপাদনক্ষেত্র টিকে থাকে, তবে একদিন শহর মন্ত্রের মতো গড়ে উঠবে।’ সরকারঘোষিত ভিশন-২০৪১–এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ক্ষুধা–দারিদ্র্যমুক্ত ও আধুনিক উন্নত দেশ হিসেবে গড়তে হলে পরিবেশ সংরক্ষণ ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি সব নদীপ্রেমিককে বলতে হবে, ‘আর ঘুমাব না নয়ন মেলিয়া অলসতার জালে, এমনি করে আর কোনো নদীকে যেতে দেব না রসাতলে।’

ড. মু. সোহরাব আলি পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর


  • 1
    Share