আমনের রেকর্ড ফলনেও মন ভালো নেই চাষির


সাহেব-বাজার ডেস্ক : একদিকে সার ও জ্বালানি তেলসহ সব কৃষি উপকরণের বাড়তি দাম, ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে তীব্র খরায় পোড়ে বীজতলা। এসব সংকটের গ্যাঁড়াকলে পড়ে আমন আবাদ নিয়ে শঙ্কার মেঘ জমেছিল কৃষকমনে। তবু ভালো ফলনের আশায় সব বিপদকে ডিঙিয়ে কৃষক তাঁর কাজটি ঠিক ঠিক করেছেন।

এমন দুর্যোগ সময়েও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দিচ্ছে সুখবর। তাদের হিসাবে, আমনে এবার রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে। গেল বছরের চেয়ে এ মৌসুমে হেক্টরপ্রতি আমন উৎপাদন ৭ শতাংশের বেশি। ভালো ফলনে চাষিরা খুশি হলেও উৎপাদন খরচ হিসাব করে ধানের দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা ভর করেছে তাঁদের মনে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, ধান রোপণের পর অনুকূল আবহাওয়া ও আলো বেশি থাকায় এবার হেক্টরপ্রতি চালের গড় ফলন পাওয়া গেছে ৩.১০ টন, যা প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। এবার আমন মৌসুমে ধানের আবাদ হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে। এখান থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার টন। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ে ৩১ জেলার ৮০ হাজার ৭৭৭ হেক্টর আমন মৌসুমের ধান আবাদি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।

চাল উৎপাদনের তথ্য নিয়ে যৌথ পরিসংখ্যান করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ডিএই। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে আমন মৌসুমে হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ছিল প্রায় ২ দশমিক ৬২ টন। এর আগে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত ফলন আড়াই টনের ঘরে ছিল।

ব্রি জানিয়েছে, ২০২২ সালে আমনের ফলন হয়েছে হেক্টরপ্রতি ২.৭৬ টন যা, গত বছরের চেয়ে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি। সে হিসাবে এ বছর আমনে প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। ২০১৭ সালে ২.৪৫ টন, ২০১৮ সালে ২.৪৬, ২০১৯ সালে ২.৫০, ২০২০ সালে ২.৫৫ এবং ২০২১ সালে হেক্টরপ্রতি ২.৫৭ টন আমনের ফলন হয়।

মাঠ থেকে আমন তোলার পর দেশে সারাবছরে খাদ্য পরিস্থিতি কেমন হবে- এমন প্রশ্নে ব্রি মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর বলেন, আগামী জুন পর্যন্ত আউশ ৩ মিলিয়ন টন, আমন ১৬.৩ মিলিয়ন টন ও বোরো ২০.৪ মিলিয়ন টন ধরে মোট উৎপাদন হতে পারে ৩৯.৭ মিলিয়ন টন। দৈনিক ৪০৫ গ্রাম করে হিসাব করলে ১৭ কোটি মানুষের জন্য চালের প্রয়োজন হবে ২৫.১৩ মিলিয়ন টন। অন্য চাহিদা (২৬.১২%) হিসাব করে মোট চালের প্রয়োজন ৩৫.৫ মিলিয়ন টন। সে হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকবে ৪.২ মিলিয়ন টন বা ৪২ লাখ টন। তিনি বলেন, যত ত্রুটিই হোক না কেন আগামী জুন পর্যন্ত দেশে চালের কোনো সংকট থাকবে না। এ জন্য দরকার নিরবচ্ছিন্ন সাপ্লাই চেইন নিশ্চিত করা।

ডিএইর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, এই রোপা আমন মৌসুমে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৫ লাখ ৮৮ হাজার ৫৮ হেক্টর জমির ফসল কাটা হয়েছে, যা মোট জমির প্রায় ৬৩ দশমিক ৪২ শতাংশ। এসব জমিতে চাল উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮০ টন। হেক্টরপ্রতি ফলনের হার ৩ দশমিক ১০ টন। এ ছাড়া ধানের হেক্টরপ্রতি ফলন পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ৬৫ টন। কাগজে-কলমে ডিএই এই হিসাব দিলেও আদতে মাঠের সব ধান এরই মধ্যে কাটা হয়ে গেছে বলে নিশ্চিত করেছেন এক কৃষি কর্মকর্তা।

এ দিকে রেকর্ড উৎপাদনের পরও ধান-চালের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন কৃষক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারের বেঁধে দেওয়া দরে ধান-চাল সরবরাহ করতে গিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন চাষিরা। বাজারের চেয়ে সরকারি দর কম হওয়ায় কৃষক ও মিলাররা খাদ্যগুদামে আমন ধান ও চাল সরবরাহে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে সরকারের আমন সংগ্রহ অভিযানের সাফলতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

প্রতি কেজি ২৮ টাকা দরে ৩ লাখ টন ধান এবং প্রতি কেজি ৪২ টাকায় ৫ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করে সরকার। গত ১৭ নভেম্বর থেকে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। তবে দেশের অনেক স্থানে এ কার্যক্রমের গতি মন্থর। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা গেছে, গত ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৪ টন ধান ও ১০ হাজার ৬০৩ টন চাল সংগ্রহ হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আলম মাসুদ বলেন, এবার ফলন বেশি হলেও কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন কৃষক। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদন খরচের চেয়ে অনেক কম দামে ধানসহ বিভিন্ন ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকারি নীতিমালা থাকা জরুরি।

তিনি বলেন, ভারতে সরকারিভাবে দেশটির মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ ধান ও চাল সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। আমাদের দেশে এ হার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ। সরকার মূলত চালকল মালিকদের কাছ থেকে চাল কেনে। দেশে কৃষিপণ্যের দর নির্ধারণ নীতিমালার আওতায় একটি মূল্য কমিশন গড়ে তোলা দরকার বলেও মনে করেন নুরুল আলম মাসুদ।

 

এসবি/এমই