আগের গতি নেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে

  • 2
    Shares

সাহেব-বাজার ডেস্ক : একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালের মার্চে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বেশ কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ও দণ্ড কার্যকরও করে ট্রাইব্যুনাল। তবে গত ছয় বছরে ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রমে আর সেই গতি নেই। গত দেড় বছরে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি সেই অবস্থাকে করেছে আরও সঙ্গিন। এর মধ্যে করোনায় একাধিক কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটরের মৃত্যুতে পুরোপুরি থমকে গেছে ট্রাইব্যুনালের কাজ।

ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে মানুষের সেই আবেগ ও আবেদন এখন আর নেই। সরকারের সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তবে আইনমন্ত্রী বলেছেন, শিগগিরই নতুন বিচারক নিয়োগ দিয়ে বিচারকাজ গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ গঠনের পর বিচারের অপেক্ষায় থাকা ৩৩ মামলা ঝুলে আছে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় জমা পড়া ৭০০ অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তে পড়েছে ভাটা। এমন পরিস্থিতিতে চলমান মামলা ও তদন্তের অপেক্ষায় থাকা অভিযোগের সাক্ষী হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন প্রসিকিউটররা।

শুরুতে একটি ট্রাইব্যুনাল থাকলেও বিচারকাজে গতি আনতে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটি ট্রাইব্যুনালকে একীভূত করা হয়। সব মিলিয়ে ৪০টির বেশি রায়ের পর ট্রাইব্যুনাল যেন থকমে যায় অনেকটাই। মাঝে টানা ১৪ মাস রায়বিহীন থাকার পর গত ১১ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালের ৪২তম রায় আসে। ওই ৪২ মামলার বিচারে ১২৪ জন আসামির মধ্যে ৬৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এখন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে ৩৩টি মামলা। এর মধ্যে ১৮টি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে এবং ৬টি মামলা রয়েছে সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের পর্যায়ে।

এদিকে এখন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ৩ হাজার ৮৩৯ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৭৭৮টি অভিযোগ জমা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে। অথচ প্রায় এক যুগে মাত্র ৭৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে যার ভিত্তিতে ৪২ মামলার রায় এসেছে।

সূত্র মতে, বাকি অভিযোগগুলোর মধ্যে ২৭টি অভিযোগের তদন্ত চললেও করোনা পরিস্থিতিতে সেগুলো মুলতবি রয়েছে। আর ৬৭৩টি অভিযোগের তদন্তের ভবিষ্যৎ কী কেউ জানে না।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত বলেন, ‘জাতি হিসেবে আমরা আবেগী। কিন্তু সেই আবেগ দীর্ঘ সময় ধরে রাখতে পারি না। আবেগ যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন দেখবেন। একদিকে সময় যত গড়িয়েছে ততই এ নিয়ে আবেগের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একটা বিষয় পরিষ্কার, ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আবেগের যে জায়গা সেটা চারদিক থেকেই কমেছে।’

তবে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি করোনা মহামারীকেই দায়ী করেন। প্রবীণ এই আইনজীবী দাবি করেন, বিচার কার্যক্রমের সঙ্গে যারা যুক্ত এমনকি আসামিপক্ষ তাদের কারও মধ্যে বিচার নিয়ে আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। এখন অতিমারী বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এ অবস্থা চলছে।

এদিকে একাত্তরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরেই ট্রাইব্যুনালের বিচারের গতি মন্থর। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীর বিচার হয়েছে। এটা একটা বড় সাফল্য। কিন্তু সংগঠন হিসেবে জামায়াত, আলবদর, আলশামস ও পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না। হাজার হাজার শহীদ পরিবার গ্রামেগঞ্জে এখনো বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছে। বিচার পাওয়ার আগেই অনেকে মারা যাচ্ছে। যাদের বিচার হওয়া উচিত ছিল তারাও শাস্তি না পেয়ে মারা যাচ্ছে। এখন কেন এই ধীরে চলো নীতি? হাত-পা কে বেঁধে রেখেছে?’

তিনি বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের কাজকর্ম কেন বন্ধ থাকবে? কেন ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত লোকবল দেওয়া হবে না। বিচারের জন্য মানুষ আর কতদিন অপেক্ষা করবে। ৫০ বছর তো হয়ে গেল। আমরা তো শহীদ পরিবারের কাছে অপরাধীই থেকে যাচ্ছি।’

প্রবীণ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের বিচারের গতি কমে যাওয়া এটা খুব দুঃখজনক। এতে করে জনমনে নিশ্চয়ই একটা সংশয় থাকবে। আমি মনে করি বিচারের গতিটা ধরে রাখা উচিত। না হলে মুক্তিযুদ্ধে যারা ক্ষতিগ্রস্ত তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসটা থাকবে না।’

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ২৯ নভেম্বর মারা যান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান। গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ২৬ জুন মৃত্যুবরণ করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) জেয়াদ আল মালুম। গত ২৪ আগস্ট মারা যান ট্রাইব্যুনালের বিচারক প্যানেলের অন্যতম সদস্য বিচারপতি মো. আমির হোসেন। প্রসিকিউটররা জানান, ট্রাইব্যুনালের গুরুত্বপূর্ণ পদের এই তিনজনের মৃত্যু বিচার প্রক্রিয়াকে আরও ব্যাহত করেছে।

তারা জানান, তদন্ত সংস্থা থেকে দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নেওয়া, অভিযোগ গঠন ও রায় দিতে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের বিধান অনুযায়ী তিনজন বিচারকের উপস্থিতি প্রয়োজন। একজন বিচারক মারা যাওয়ায় এবং এখন পর্যন্ত এ পদে নতুন নিয়োগ না হওয়ায় বিচারকাজ বন্ধ রয়েছে।

প্রসিকিউটর মোখলেছুর রহমান বাদল বলেন, ‘চলমান যে মামলাগুলো সেগুলোর আসামিদের বিরুদ্ধে একাত্তরে সরাসরি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। গত দেড় বছরে করোনাভাইরাস সংক্রমণসহ নানা কারণে ট্রাইব্যুনাল সমস্যায় জর্জরিত। এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সাক্ষী এনে মামলা পরিচালনা করাও দুরূহ।’

তিনি বলেন, ‘আইনের বিধান অনুযায়ী কোনো বিচারক মারা গেলে নতুন বিচারক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিচারকাজ শুরু করা যায় না। যতটুকু জেনেছি খুব সহসাই বিচারক নিয়োগ হবে এবং করোনা যেহেতু নিয়ন্ত্রণে চলে আসছে আশা করা যায় বিচারকাজে গতি আসবে।’

প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত বলেন, ‘আইনের বিধান অনুযায়ী কোনো বিচারকের মৃত্যু হলে এবং নতুন বিচারক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিচারকাজ শুরু করা যাবে না। এ ছাড়া আইনে না থাকায় ট্রাইব্যুনালে ভার্চুয়াল আদালতের সুযোগ এখানে নেই।’

ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, বিচার কার্যক্রমের শুরুতে পাঁচজন প্রসিকিউটর নিয়ে বিচারকাজ শুরু হলেও ২০১৩ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ২১ জন প্রসিকিউটর। তবে সময় যত গড়িয়েছে নানা কারণে প্রসিকিউটরদের সংখ্যাও কমেছে। এখন কাগজে-কলমে যদিও ১৪ জন প্রসিকিউটর দায়িত্বে রয়েছেন; কিন্তু সক্রিয় রয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন। চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ প্রসিকিউটরদের অনেকেই বয়স ও অসুস্থতায় ন্যুব্জ। তাদের ট্রাইব্যুনালে এসে বিচারকাজ পরিচালনার মতো শারীরিক সামর্থ্য নেই।

প্রসিকিউটর তাপস কান্তি বল বলেন, ‘বিচারকাজে গতি না থাকায় ট্রাইব্যুনালের আবেদন ফুরিয়ে গেছে কিনা সে প্রশ্ন হয়তো আসছে। কিন্তু যারা একাত্তরে ভুক্তভোগী, যারা মামলার সাক্ষী এবং যারা প্রসিকিউশনে আছেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন তাদের কাছে কিন্তু এখনো যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের আবেদন আছে। ভবিষ্যতেও হয়তো থাকবে।’ তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরে যে পরিস্থিতি তাতে সিনিয়র প্রসিকিউটরদের অনেকেই ট্রাইব্যুনালে আসতে পারছেন না। আমরা ভালো সময়ের অপেক্ষায় রয়েছি।’

তবে রানা দাসগুপ্ত বলেন, ‘মামলা যেগুলো বিচারাধীন সেগুলো এবং তদন্তের অপেক্ষায় থাকা অভিযোগের তদন্ত শেষ করতে অনেক দিন লাগবে। আমাদের জীবদ্দশায় শেষ করতে পারব কিনা জানি না। সাক্ষীদের অনেকের বয়স ৭০ পেরিয়েছে। এখন সরকার যদি মনে করে যে বিচারপ্রার্থীর বিচার পাওয়ার অধিকার আছে তাহলে বিচার চলমান রাখবে।’

সার্বিক বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আলোচনা হয় না, তার কারণ হচ্ছে যারা শীর্ষ অপরাধী ছিল তাদের কিন্তু বিচার হয়ে গেছে। এখন যেসব মামলা চলছে সেগুলো গণমাধ্যমে সেভাবে আসছে না। বিচার কার্যক্রম কিন্তু চলছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে কোর্ট বন্ধ ছিল। এখন আবার চালু হবে। শিগগির বিচারক নিয়োগ হবে। বিচার গতিশীল করার জন্য যা প্রয়োজন বিচারকাজ যতটা ত্বরিত দরকার সেগুলো করা হবে।’

 

এসবি/এমই


  • 2
    Shares