ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ৫:২২ অপরাহ্ণ

Home / রাজশাহীর সংবাদ / অমানবিক পরিশ্রমে স্কুলের দপ্তরিরা

অমানবিক পরিশ্রমে স্কুলের দপ্তরিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক : সবার আগে গিয়ে তালা খুলে ঝাড়-মোছ শেষে তার ঘন্টাতেই শুরু হয় স্কুলের কাজ। দিন শেষে তার ঘন্টা ধ্বণিতেই ছুটি। কিন্তু তার ছুটি নেই। সন্ধ্যের পর নৈশ্য প্রহরীর কাজটাও তাকেই করতে হয়। এতসব কাজ যাকে করতে হয় তার চাকরি স্থায়ী নয়। দৈনিক মজুরিভিত্তিক এই চাকরিতে অনুপস্থিতি মানেই বেতন কাটা। মাস শেষে সর্বসাকুল্যে হাতে আসে সাত হাজার টাকা।

রাজশাহীতে এক হাজার ৪৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় অর্ধেকেই এমন দপ্তরি কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগ শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকীগুলোতেও চলছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। দিবা-রাত্রির সার্বক্ষণিক এই চাকরিতে কাজের শেষ নেই। তারপরেও রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানা শিক্ষা কর্মকর্তা স্কুলের দপ্তরিদের জন্য মোট ২২টি কাজ ঠিক করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে কাজের চাপ আরও বেড়েছে দপ্তরিদের।

ফলে দিনরাত অমানবিক পরিশ্রম করতে হচ্ছে সরকারি স্কুলের দপ্তরি কাম প্রহরীদের। কখনও কখনও স্কুলের শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজও করতে হচ্ছে তাদের। অথচ স্কুল চলাকালীন সময়েই কাজের শেষ নেই তাদের। সুইপারদের মতো টয়লেট পরিষ্কার থেকে শুরু করে মালির মতো ফুলবাগান পরিচর্যাও করতে হচ্ছে তাদের। দপ্তরিরা বলছেন, দিনেরাতে পরিবারের কাজ তো দূরের কথা; ঘুমানোর মতো ঘণ্টা দুয়েক সময়ও পান না তারা।

দেশের অন্য স্থানের মতো রাজশাহীতেও কয়েক বছর ধরে দপ্তরি কাম প্রহরীদের নিয়োগ চলছে। শিক্ষা অফিস বলছে, জেলার প্রায় অর্ধেক স্কুলে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগ শেষ হয়েছে। তবে আইনজীবীরা বলছেন, দিনরাতের চুক্তিতে এমন নিয়োগ অমানবিক। যদিও সারাদেশেই এমন চুক্তিতে নিয়োগ চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অমানবিক পরিশ্রমের কারণে ধীরে ধীরে স্কুলের দপ্তরি কাম প্রহরীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তবে চাকরি হারানোর ভয়ে তারা বাধ্য হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেকেই আবার তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। ফলে ইচ্ছে থাকলেও তারা চাকরি ছেড়ে দিতে পারছেন না। জেলার অন্তত ১০টি স্কুলের প্রহরীদের সঙ্গে কথা বলে এসব বিষয় জানা গেছে। তবে বাস্তব চাকরি হারানোর ভয়ে তারা নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

জেলার মোহনপুর উপজেলার একটি স্কুলের একজন দপ্তরি বলেন, রাতে স্কুল পাহারাসহ দিনে অফিসের সব কাজই তাদের করতে হয়। দিনরাত এমন পরিশ্রমে তাদের মনোবল এখন ভাঙতে শুরু করেছে। তারপরেও কখনও কখনও শিক্ষকরা তাদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজও করিয়ে নেন। মাসশেষে হাজিরার ভিত্তিতে তারা বেতন পান। মাসে কোনো দিন অনুপস্থিত থাকলে তাদের বেতন থেকে কেটে নেয়া হয় ওই দিনের মজুরি। অথচ তাদের সরকার নির্ধারিত সর্বসাকুল্যে বেতন সাত হাজার টাকা।

স্কুলের দপ্তরি কাম প্রহরীদের এমনিতেই অমানবিক পরিশ্রম করতে হলেও রাজশাহী শহরের স্কুলগুলোর কর্মচারিদের ওপর দায়িত্বের বোঝা আরও বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষা অফিস। নগরীর বোয়ালিয়া থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সানাউল্লাহ নিজের ইচ্ছেমতো তাদের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন দপ্তরিরা। শিক্ষা কর্মকর্তার চাপিয়ে দেয়া কাজে দপ্তরিদের মধ্যে বাড়ছে অসন্তোষ।

নগরীর কয়েকটি স্কুলের দপ্তরিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মাসে নগরীর স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষক ও দপ্তরিদের সঙ্গে সভা করেন শিক্ষা কর্মকর্তা সানাউল্লাহ। এ সময় তিনি নিজে একটি কাগজে লেখা দপ্তরিদের কাজগুলো সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন। শিক্ষা কর্মকর্তা ওই দিন দপ্তরিদের ২২টি কাজ চিহ্নিত করে দেন। অথচ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দপ্তরিদের এই নিয়োগের পরিপত্রেও তাদের এতো কাজের বিবরণ ছিল না।

প্রহরীরা জানান, শিক্ষা কর্মকর্তার চিহ্নিত করে দেয়া ওই ২২টি কাজের মধ্যে রয়েছে- প্রতিদিন সার্বক্ষণিক অবস্থান করা (দিবারাত্রি), স্কুল আঙ্গিনা, শ্রেণিকক্ষ ও টয়লেট পরিস্কার করা, যথাসময়ে ঘণ্টা বাজানো, প্রয়োজনবোধে শিক্ষা অফিস ও ব্যাংকে যাওয়া, ফুল বাগানের পরিচর্যা, নলকূপ মেরামতে সহায়তা, শ্রেণি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাজিরা সংগ্রহ, শিক্ষা অফিসের যে কোনো কাজে সহায়তা, বিভাগীয় প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া ও আনা ইত্যাদি।

প্রহরীরা জানিয়েছেন, শিক্ষা কর্মকর্তার স্ব-আরোপিত এসব কাজের তালিকাটির ফটোকপি তিনি সভা শেষে প্রধান শিক্ষকদের সরবরাহ করেন এবং কাজ বুঝে নিতে বলেন। তবে ওই কাগজে শিক্ষা কর্মকর্তা কিংবা অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার স্বাক্ষর নেই। তারপরেও ওই কাগজ অনুযায়ী স্কুলের শিক্ষকরা আর সুইপার ডাকছেন না। সুইপারদের টয়লেট পরিষ্কারের কাজ করাচ্ছেন দপ্তরি কাম প্রহরীদের দিয়ে। শিক্ষা কর্মকর্তার ভয় দেখিয়ে এসব কাজ আদায় করে নিচ্ছেন শিক্ষকরা।

দপ্তরিরা বলছেন, দিনরাত দায়িত্বের কথা জেনেও তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী সব কাজই করেন। কিন্তু এখন সুইপারের কাজ করাটা মানতে পারছেন না তারা। আগে স্কুলের শিক্ষক ও দপ্তরিদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলেও এখন স্কুলে স্কুলে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। ফলে স্কুলগুলোর সুন্দর পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। থানা শিক্ষা কর্মকর্তার ওই ২২ নির্দেশনায় তারা হতাশ।

এ বিষয়ে কথা বলতে বুধবার সকালে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সানাউল্লাহর দপ্তরে গেলে তিনি ব্যস্ততার অযুহাতে কথা বলতে চাননি। সকালে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নফীসা বেগমকেও তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়। তাই এ ব্যাপারে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী শ্রম আদালতের আইনজীবী সাইফুর রহমান বলেন, আট ঘণ্টার বেশি কোনো শ্রমিক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারিকে কাজ করানো যাবে না। বাংলাদেশের কোনো আইনই এটা সমর্থন করে না। দপ্তরি কাম প্রহরীদের দিনরাত কাজ করানোটা অমানবিক। কারণ, তারও সংসার আছে, পরিবার আছে। তাদেরও সময় দেয়া প্রয়োজন। নি¤্ন আয়ের এসব কর্মচারিদের সঙ্গে অন্যায় করা হচ্ছে।

সাইফুর রহমান বলেন, আট ঘণ্টার জায়গায় কোনো শ্রমিককে ১০ ঘণ্টা কাজ করালে অতিরিক্ত দুই ঘণ্টার জন্য তাকে চার ঘণ্টার ওভারটাইম পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু দপ্তরিদের ক্ষেত্রে তা হয় না। দিনে-রাতে একই কর্মচারিকে দিয়ে দুই ধরনের কাজ করানোর ব্যবস্থা করে শিক্ষা অধিদপ্তরের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তারা অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। দপ্তরিদের চাকরির নীতিমালাটি সংশোধন করা জরুরী।

এসবি/এসএস

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

কুয়াশায় দুই বাসের সংঘর্ষ, নিহত ৩

নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘনকুয়াশার কারণে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটেছে। এতে এক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *