ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ৫:১৫ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / সুবোধকথন ও আজকের ভাবনা

সুবোধকথন ও আজকের ভাবনা

‘সুবোধ’, সম্প্রতি গণমাধ্যম বিশেষত ফেসবুক জগতে সাড়া জাগানো একটি নাম, একটি বিস্ময়, একটি রহস্য। গোবেচারা গোছের এই চরিত্রের সাথে প্রথম দেখা হয় আমার তরুণ ছাত্র হৃদয়ের মাধ্যমে। হৃদয় প্রতিভাবান, সৃজনশীল ও মুক্তচিন্তার ধারক। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদারপন্থী আর মুক্তমনা ব্যক্তিবর্গের সাথে তার উঠাবসা আমি অনেকদিন থেকেই দেখে আসছি। দু’বছর যাবত ক্যাম্পাসের জনপ্রিয় একটি নাট্যগ্রুপের সাথে তার শিল্পচর্চার খবরও আমি জানি। আমার অনেক প্রিয় ছাত্রের মধ্যে এই হৃদয়কে আমি তাই একটু অন্যরকমভাবেই দেখি। অন্যরকম বলতে, হাল ফ্যাশনের গড্ডালিকা প্রবাহের বিপরীতে বিবেক, মূল্যবোধে চালিত হয়ে সত্যিকার মননশীল, শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও সক্রিয় নাগরিকদের যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবেই তাকে আমি বিবেচনা করি। হৃদয় সম্পর্কে কেন এতো কথা বলছি? হৃদয়ের মতো প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরল নয়। আরো অনেকেই আছে তার মতো। বিশেষত হৃদয় যাদের সাথে চলাফেরা করে, যারা ক্যাম্পাস বিতর্কে নিজের যুক্তি, কাউন্টার যুক্তি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্তে সকলকে অবাক করে; ক্লাস বিরতির ফাঁকে কিংবা আলো-আধারীময় সন্ধ্যার আড্ডায় দেশ-বিদেশের অর্থনীতি-রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের থিওরিটিক্যাল অ্যানালাইসিস দেয়। তাহলে কেন একজন হৃদয়কে নিয়ে এত কালি ক্ষরণ? প্রিয় পাঠক, জবাব প্রাপ্তির লক্ষ্যে একবার ফিরে যেতে অনুরোধ করছি, এই নিবন্ধের প্রথম চরিত্র সুবোধের কাছে। সুবোধ অনেকেরই পরিচিত। সুবোধ কারো স্বজন, কারো আত্মীয়, কারো প্রেমিক। সে যেমন অনেকের সাথেই বাস করে, তেমনি অনেকেই তার সাথে বাস করতে ব্যাকুল। হৃদয় ও সুবোধ এভাবেই পরস্পরের জানা-শোনা, সম্ভবত বন্ধু বা বন্ধুতুল্য।

(২)
জগৎ সংসারের আর দশজনের মতো আমারও ধারণা ছিল হৃদয়ের বন্ধু সুবোধ তার মতোই একজন। ধরেই নিয়েছিলাম, সুবোধ হৃদয়ের মতো আঠারো-কুড়ি বছরের টগবগে মেধাবী যুবক। চোখে তাঁর অজ¯্র স্বপ্ন, সে স্বপ্ন যেমন তার নিজেকে নির্মাণের, তেমনি জরা-ব্যাধি আর জঙ্গমতায় নিমজ্জিত সমাজ-দেশ-জাতিকে বিনির্মাণ বা পুনঃনির্মাণের। সুবোধকে একজন অরূপ রতনের মতো ভেবে আশ্বস্ত হতে চেয়েছিলাম আমাদের তরুণেরা জেগে আছে আধমরাদের ঘা দেবে বলে। তারা শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচয়কে, আমাদের জাতিসত্ত্বাকে, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে, আমাদের আশা জাগানিয়া ইচ্ছে, যুগ-যুগান্তর লালিত স্বপ্ন আর উত্তর প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতাকে শেষ, নিঃশেষ কিংবা ধুলিস্মাৎ হতে দেবে না। কিন্তু হৃদয় যেদিন প্রথমবার অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে এক অমানিশার সকালে, হ্যাঁ অমানিশাময় প্রভাতেই সুবোধের সাথে আমার পরিচয় করে দেয় সেই সময়ে বড্ড আশাহত হয়েছিলাম। দীর্ঘদিনের ধারণা বা বিশ্বাস অকস্মাৎ কাঁচের মতো ভেঙে গেলে যেমনটি হয়। সুবোধের মেধাবী মুখমণ্ডলের সাথে কোটরে ঢোকা চোখ দু’টো যেমন বেমানান ছিল, তেমনি উদভ্রান্ত-বেদনাহত চেহারাটা ছিল বড়ই মলিন, আশঙ্কারও। তাই সেদিন পরিচয় পর্বের কুশলাদি এবং দু’চার কথা শেষে অসহ্য একটা বিশ্রীরকমের স্বস্তিহীনতায় আমার ব্যক্তিগত কক্ষের দিকে পা এগুতে থাকি।

(৩)
বেশ ক’দিন থেকেই শুনছি হৃদয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। হৃদয় নাকি দেশদ্রোহী হয়েছে। জনমনে ভীতি সঞ্চার করে বেড়াচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, হৃদয় রাজনৈতিক অপপ্রচার চালাচ্ছিল। সে-ই হৃদয়। আমার ¯্নেেহর ছাত্র। যার বাক্যচয়নে, শিল্পচর্চায়, চলাফেরায় তেজোদীপ্ত সূর্যের রশ্মি ছড়াতো। সেই রশ্মির আভায় প্রতিফলিত হতো আগামী দিনের সোনালী সূর্য। যে কিনা দেশ মাতৃকার বদন মলিন হতে দেখলে নয়ন জলে বুক ভাসাতো। তার সম্পর্কে আর সকলের বিরূপ ধারণা হলেও তার একজন শিক্ষক হিসেবে, অগ্রজ হিসেবে আমার তা নেই কিঞ্চিতও। গণমাধ্যমে পড়েছি, হৃদয় নাকি আজকাল সুবোধের মতো উচ্ছন্নে গেছে। রহস্যজনক বক্তব্যে রাজধানীর আগারগাঁও, মহাখালী ও পুরাতন বিমানবন্দরের দেয়ালে দেয়ালে সুবোধকে পালাতে বলেছে। গ্রাফিতির ক্যানভাসে ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা। তোর ভাগ্যে কিছু নেই; সুবোধ তুই পালিয়ে যা এখন সময় পক্ষে না। সুবোধ তুই পালিয়ে যা ভুলেও ফিরে আসিস না!’…. জাতীয় রচনায় বিশেষ কোনো বার্তা ছড়াচ্ছে। অবশ্য বিশেষ বার্তাগুলো আসলে কী কী তা কেউ জানেন না। তবু হৃদয় আজ দোষী, অপরাধী- পুলিশের চোখে, রাষ্ট্রের চোখে।

অনেকে বলছেন, কিছুদিন থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশের দেয়ালগুলোতে সুবোধের গ্রাফিতি চিত্র আঁকা হয়েছে। তাদের মতে, ধাপে ধাপে লেখাগুলো পর্যালোচনা করলে মনে হবে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বা আলোর সন্ধানে সুবোধ চরিত্রের একজন ছুটছেন। অনেকে আবার এর প্রতীকী অর্থও আবিষ্কার করে ফেলেছেন। তাদের মতে, এ সুবোধ কোন একজন ব্যক্তি নন। এটি সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা জনগণকে ইঙ্গিত করে বৃহত্তর অর্থে বিশেষ কিছুকে বোঝানো হয়েছে। বলার চেষ্টা করা হয়েছে, সুবোধ চরিত্রটি খুব কষ্টে আছে। সেখান থেকে মুক্তি পেতে সে প্রহর গুনছে। সময় পক্ষে নেই বলে একবার তাকে পালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। অন্য একটি গ্রাফিতিতে বলা হয়েছে, ‘সুবোধ, কবে হবে ভোর?’ এখানে সুবোধ চরিত্রের এই বিক্ষুব্ধ ব্যক্তির হাতে আছে খাঁচাবন্দি সূর্য। তার পাশে আছে একটি শিশু। যাকে সে বলেছে কবে হবে ভোর? শেষ গ্রাফিতিতে কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য না থাকলেও দেখানো হয়েছে, খাঁচাবন্দি সূর্য বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়। তার সামনে ভোরের আগমনী হিসেবে মোরগ ডাকার অঙ্গভঙ্গির প্রতীকি চিত্র রয়েছে। এসব চিত্র বা বাক্যের মধ্যে কেউ অপপ্রচার বা রাষ্ট্রদ্রোহীতার গন্ধ পেলেও এগুলোর সামাজিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্য অনুধাবনে নারাজ জ্ঞানী-গুণী, তাত্ত্বিক বোদ্ধাদের অনেকেই। সমাজব্যবস্থায় উটপাখি হয়ে ঘুমানো তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত সিভিল সোসাইটির দৃষ্টিভঙ্গী সত্যি প্রায়শই বড় সমস্যার, দুঃশ্চিন্তারও বটে। তবে কি রাষ্ট্র চরিত্রের সাথে সিভিল সোসাইটির ভোট বা রাজনীতিকেন্দ্রীক অম্ল-মধুর রসায়নের বাইরে সামাজিক-মানবিক মূল্যবোধগুলো নিয়ে ভাববার কোনো অবকাশ নেই!

(৪)
হৃদয়ের হৃদয়বৃত্তির বিকাশ এবং সুবোধের সু-বোধের প্রেক্ষিত কিংবা উভয়ের এমনতর রহস্যময় আচরণের সামাজিক দায় তাহলে কে নেবে? না সমাজ, না রাষ্ট্র, না রাজনীতি। সুবোধ ও হৃদয়ের আচরণের দায় তাহলে তাদের নিজেদের ওপরই বর্তায়! কিন্তু কেন? তারা এই সমাজেরই আলো-বাতাস-জল ও সার্বিক পটভূমিতেই লালিত হয়েছে, বড় হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে। আমাদের আরো লক্ষ লক্ষ তরুণের মতো তারা স্বপ্ন লালন করেছে। কিন্তু হায়! তাদের সাধনা, ইচ্ছে আর স্বপ্ন ভঙ্গের দায় কেউ নেবে না। এই সুবোধ ও হৃদয়দের কোন কৃতিত্বের ভাগীদার হতে আমরা গদগদ হবো কিন্ত তাদের ভিন্নমত, ভিন্নধারা, হোক তা ভাল বা মন্দ তার কোন দায় বা গন্ধ গায়ে জড়াব না। আসলে অনাগত শত-সহ¯্র সুবোধ ও হৃদয়দের জন্যে কতটা ভাল দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছি আমরা? ব্যক্তি হিসেবে, জাতি হিসেবে? স্বাধীনতার ক’টা যুগ যেতে না যেতেই অভিভাবকেরা যখন পক্ষ শক্তি, বিপক্ষ শক্তির নামে জাতিকে বিভক্ত করে; দেশে যখন গণতন্ত্রের নামে দলতন্ত্র, ব্যক্তিতন্ত্র প্রাধান্য পায়; যখন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরীর প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে প্রকৃত মেধাকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়; চাঁদাবাজী, দখলবাজী, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, সস্ত্রাস, খুন নিত্য নৈমিত্তিক ডাল ভাত হয়ে যায় তখন সত্যিকার মেধাবী, গোবেচারা সুবোধ ও হৃদয়দের আর জায়গা থাকে কি? ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সমাজনীতি-শিক্ষানীতি-অর্থনীতির মতো জাতীয় ভিত্তিগুলো বিপর্যস্ত হলে আগামী দিনের ভবিষ্যত তরুণ সুবোধ ও হৃদয়েরা কি নিয়ে স্বপ্ন দেখবে? একটা নির্মল স্বপ্ন দেখার জন্য তো একটা সুন্দর আলোকজ্জ্বল স্পেসও চাই। একজন সুবোধ বা একজন হৃদয়কে তাই আলাদাভাবে ভাবলে চলবে না। জাতির সোনালী ভবিষ্যতের তাগিদেই আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দায়িত্ববোধ ও দূরদৃষ্টিতায় এর টেকসই সমাধান অন্বেষণ জরুরি।

লেখক: মো. হাবিবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

গৃহহীন মানুষের দুঃখ আর কতদিন

বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণকারীদের নিয়ে সবাই ব্যস্ত। নিজ দেশে সবকিছু হারানো এই উদ্বাস্তুদের সুস্থ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *