ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ৫:১৪ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / ঋত্বিক ঘটক আমাদের অন্তহীন প্রেরণা

ঋত্বিক ঘটক আমাদের অন্তহীন প্রেরণা

মাহী ইলাহি : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহুল উচ্চারিত ও আলোচিত কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও নাট্যকার ঋত্বিক কুমার ঘটক। ঋত্বিক ঘটক নামে যিনি সমাধিক পরিচিত। ঋত্বিক তাঁর সৃজনশীল কর্মজীবনের সূচনা করেন কবি এবং গল্প লেখক হিসেবেই।

আজ থেকে ৯১ বছর আগে এই দিনে রাজধানী ঢাকার জিন্দাবাজারের ঋষিকেশ দাশ লেনে ঐতিহ্যময় ঘটক বংশে জন্মগ্রহণ করেন। ঋত্বিক ঘটকের বংশের আদি পুরুষ পণ্ডিত কবি ভট্টনারায়ণ। তাঁর পিতা সুরেশচন্দ্র ঘটক এবং মায়ের নাম ইন্দুবালা দেবী। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের ১১তম এবং কনিষ্ঠতম সন্তান।

তাঁর বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং তিনি কবিতা ও নাটক লিখতেন। তার বদলীর চাকুরীর কারণে তারা ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। তাঁর বাবা অবসরের পর রাজশাহীতে গিয়ে বাড়ি করেন। উল্লেখ্য যে তাদের রাজশাহীর বাড়িটাকে এখন হোমিওপ্যাথিক কলেজ করা হয়েছে। ঋত্বিক ঘটকের শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে রাজশাহী শহরে। তিনি রাজশাহীর কলেজিয়েট স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন এবং ১৯৪৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে আই.এ পাশ করেন।

১৯৪৭ এর ভারত বিভাগের পরে পূর্ববঙ্গের প্রচুর লোক কলকাতায় আশ্রয় নেয় এবং এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর পরিবারও কলকাতায় চলে যায়। তবে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে শরনার্থী হবার মর্মবেদনা ঋত্বিক কোনোদিন ভুলতে পারেননি এবং তাঁর জীবন-দর্শন নির্মাণে এই ঘটনা ছিল সবচেয়ে বড় প্রভাবক যা পরবর্তীকালে তার সৃষ্টির মধ্যে বারংবার ফুটে ওঠে।

কলকাতায় ঋত্বিক ঘটক ১৯৪৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৫০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এম এ কোর্সে ভর্তি হন। এরই মাঝে নাটকের প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যে নাটকের নেশাতেই এম.এ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন তিনি।

তিনি মঞ্চের সাথে যুক্ত হোন আর ধীরে ধীরে গণনাট্যসংঘের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তারও কিছু পরে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায় লেগে পড়েন। এছাড়াও ঋত্বিক ৫০ এরও অধিক প্রবন্ধ রচনা করেছেন চলচ্চিত্র বিষয়ে। ঋত্বিক ঘটক এক আগুনের নাম। মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা-এসব ছবিগুলোয় যে আগুনের ছাপ স্পষ্ট। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রেমীদের কাছে তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো একেকটি ইতিহাস হয়ে আছে। ভারতবর্ষের মননশীল জীবনবাদী ছবির জগতে যাদের নাম আলোচিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঋত্বিক ঘটক। তাঁর প্রথম পরিচালিত ছবি নাগরিক এবং প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি অযান্ত্রিক। বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালকদের মধ্যে তিনি সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেনের সাথে তুলনীয়।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহুল আলোচিত কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক ১৯২৫ সালের আজকের দিনে ঢাকার জিন্দাবাজারে জন্মগ্রহণ করেন। আজ এই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের ৯২তম জন্মবার্ষিকী।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), কোমল গান্ধার (১৯৬১) এবং সুবর্ণরেখা (১৯৬২) অন্যতম। এই তিনটি চলচ্চিত্রকে ট্রিলজি বা ত্রয়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার মাধ্যমে কলকাতার তৎকালীন অবস্থা এবং উদ্বাস্তু জীবনের রুঢ় বাস্তবতা চিত্রিত হয়েছে। তবে কোমল গান্ধার এবং সুবর্ণরেখা’র ব্যবসায়ীক ব্যর্থতার কারণে এই দশকে আর কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের জগতে পুণরাবির্ভাব ঘটে সত্তরের দশকে।

সুবর্ণরেখা চলচ্চিত্র নির্মাণের পর প্রায় এক যুগ বিরতি নিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম শীর্ষক উপন্যাসের কাহিনীকে উপজীব্য করে ঋত্বিক ঘটক ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আগমন করে তিতাস একটি নদীর নাম শিরোনামে চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন যখন এক বাংলাদেশী প্রযোজক তিতাস একটি নদীর নাম (চলচ্চিত্র) নির্মাণে এগিয়ে আসেন। অদ্বৈত মল্লবর্মন রচিত একই নামের বাংলা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উপন্যাস ঋত্বিক ঘটকের পরিচালনায় চলচ্চিত্রে রূপদান সম্পন্ন হয়। তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালে। মাঝখানে কোন পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র তৈরী করেননি তিনি।

বাংলার অপর কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়কেও বলতে শোনা যায় ঋত্বিকের ভিতর সত্যিকারের শিল্পীর যন্ত্রণা ছিলো এবং তিনি আসলেই অনেক বড় মানের নির্মাতা। শিল্পী হিসেবে সার্থক ঋত্বিক ঘটকের মহত্য শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে নি। মানবতার প্রতি ছিল তাঁর অসীম ভালোবাসা। তিনি সবসময় স্বপ্ন দেখতেন ও দেখাতেন এমন এক সমাজ ব্যবস্থার যেখানে শোষক ও শোষিত সম্পর্ক থাকবে না, শ্রেণী বিভাজন থাকবে না, সাম্প্রদায়িকতা, কাড়াকাড়ি, সাংস্কৃতিহীনতা থাকবে না।

তাইতো মানবতার টানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাকে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য ত্রাণকার্যে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়। ১৯৭৪ সালে তাঁর শেষ চলচ্চিত্র যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছিলো তাঁর অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে ভিন্ন ধাঁচের এবং অনেকটা আত্মজীবনীমূলক ছবিটিতে তিনি নিজের রাজনৈতিক মতবাদকে দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন। কাহিনীর ছলে তিনি নিজের কথা বলে গেছেন এ ছবিতে। চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭৫ সালে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ কাহিনীর জন্য ভারতের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।

আজই তিনি আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন।

এসবি/এমই/এমএইচ

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

গৃহহীন মানুষের দুঃখ আর কতদিন

বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণকারীদের নিয়ে সবাই ব্যস্ত। নিজ দেশে সবকিছু হারানো এই উদ্বাস্তুদের সুস্থ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *