ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ ৫:১৯ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / গৃহহীন মানুষের দুঃখ আর কতদিন

গৃহহীন মানুষের দুঃখ আর কতদিন

বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহণকারীদের নিয়ে সবাই ব্যস্ত। নিজ দেশে সবকিছু হারানো এই উদ্বাস্তুদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে। ভু রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক জটিলতায় এর অনিশ্চয়তা অস্বীকার করা যায় না। তাই বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ঝুপড়িতে অমানবিকভাবে থাকা রোহিঙ্গারা বাধ্য হয়ে নিজ উদ্যোগে মজবুত ঘর তৈরী করতে পাহাড়ের গাছ কেটে সাফ করছেন। রান্নায় ব্যবহার করছেন ডালপালা। পরিবেশ রক্ষা করতে তাদের জন্য পরিকল্পিত বাসস্থান ও পুনর্বাসনে সরকার এগিয়ে আসায় পরিস্থিতির উন্নতি লক্ষ্য করা যায়।

এমন অবস্থায় আমাদের পড়তে হয়েছিল ১৯৭১ সালে। কীভাবে আমরা দেশান্তরি হতে বাধ্য হয়েছিলাম সে অভিজ্ঞতা কোনোদিনই ভোলা যাবে না। তখনও আশ্রয়শিবির করে আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছিল ভারত সরকারকে। আমাদের সে উদ্বাস্তু জীবনের অবসান হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা নাগরিক মর্যাদা নিয়েই ফিরে এসেছি। প্রতিটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষার চাহিদা পূরণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ এসবই মানুষের মৌলিক অধিকার যা সংবিধান স্বীকৃতিও বটে।

কিন্তু রোহিঙ্গাদের মতো শুধু সামরিক বাহিনীর কারণে নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রকৃতিক নানা কারণে প্রতিনিয়তই বিশ্বে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। উদ্বাস্তু হিসেবে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভেসে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি পালিত বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ১১৩ জনে এক জন বাস্তুচ্যুত। যা বিশ্বে ২১তম জনবহুল দেশ যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার সমান। নজিরবিহীন সহিংসতা, যুদ্ধ ও উচ্ছেদ-উৎখাতের কারণে প্রতিদিনই উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ভিতরে বা প্রতিবেশি দেশে আশ্রয় নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। জাতিসংঘ শরণার্থী কমিশনের হিসাবে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপি ছয় কোটি ৬৫ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। যা ২০১৫ সালের চেয়েও ৩ লাখ বেশি। জাতিসংঘের আরেক তথ্য মতে বাংলাদেশে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ। বস্তিতে বাস করে ৪০ লাখ মানুষ। ছোট-বড় সব শহরেই ৩০ শতাংশ মানুষ বস্তি ও ফুটপাতে বাস করে। ফুটপাতে বা বস্তিতে বসবাসকারীদের সামগ্রিক বিচারে গৃহবাসী বলা যায় না। কারণ সেখানকার ঘর, পরিবেশ কিছুই মানবিক নয়, মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়। তাই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। লাখ ছাড়িয়ে তা কোটির ঘর ছুঁলেও বিষ্ময়ের কিছু নেই। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপরিকল্পিত আবাসন নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছে। গুচ্ছগ্রাম নির্মাণসহ নানাভাবে গৃহহীন মানুষের আবাসনের প্রচেষ্টা চোখে পড়ে।

বাংলাদেশে গৃহহীন হবার পেছনে প্রধানত প্রাকৃতিক দুর্যোগকেই দায়ি করা হয়। নদী ভাঙনসহ ঝড়-ঝণ্ডা, সাইক্লোন-টর্নেডোর মতো প্রাকৃতিক দুযোর্গে পৈত্রিক বসত ভিটা হারিয়ে বাস্তহারা, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে হাজারো মানুষ। তারা নদীর ধারে, রাস্তা-রেললাইনের পাশে অথবা জেগে ওঠা নতুন চরে আশ্রয় নেয়, গড়ে তোলে ঝুপড়ি ঘর। অনেকেই নিজ ভুমি ছেড়ে নিস্ব হয়ে হাজির হয় রাজধানীসহ বড় বড় শহরে। গড়ে ওঠে বস্তি। এদের প্রকৃত সংখ্যা ঠিক কতো সেটা বলা কঠিন।

তবে বিশ্বব্যাপি এ সংখা কম নয়। সেটি জানা যায় জাতিসংঘের জরিপে। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর প্রায় এক কোটি ৪০ লাখ মানুষ গৃহহারা হচ্ছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষও আছে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের ১২ লাখ মানুষ বসতি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। বলা হয়েছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। কারণ বিশ্ব জুড়েই বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই দুর্যোগের কবলে পড়ছে জনবসতি। উন্নত দেশগুলোতে মজবুত ও পরিকল্পিত অবকাঠামোর কারণে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়। ধ্বংসলীলা কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়। দ্রুতই গড়ে ওঠে স্বাভাবিক জনবসতি। কিন্তু বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও দুর্বল অবকাঠামোর দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের স্বীকার হয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হয় লাখ লাখ মানুষ। বিশেষভাবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোই সংখ্যা বাড়ায় এখানে। বাস্তুহারা এসব ভাসমান মানুষ বস্তিবাসী হয়ে পরগাছার জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। এদের জীবনের ন্যুনতম ঠিক-ঠিকানা নেই, নেই উপযুক্ত কাজসহ ন্যুনতম সুযোগ-সুবিধা। বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বিভিন্ন ধরনের অপ্রাতিষ্ঠানিক ও স্বনিয়োজিত কাজে ভিড় জমায়। ফুটপাত বা রাস্তার ধারে দোকানদারি, রাস্তায় রিক্শা-ভ্যান ঠেলা চালিয়ে, বাসাবাড়ির গৃহকর্মে বা চা দোকান, হোটেল-রে¯েঁÍরা, রিকশা-মোটর গ্যারাজসহ দোকান বা ওয়ার্কশপের মতো ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানে সকাল-সন্ধ্যা কাজ করে জীবন বাঁচায়। এখানে মজুরি, কাজের সময়সীমা বা টিকে থাকার যেমন নিশ্চয়তা নেই তেমনই তাদের জীবনও অনিশ্চয়তায় ভরা। এমন অনিশ্চয়তা তাদের পারিবারিক জীবনকেই সুষ্টু না ব্যাক্তিজীবনকেও করে তোলে বেপরোয়া। ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা মাদকাসক্তি, সহিংসতা-সন্ত্রাসের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কোন বাধা থাকে না। বংশপরম্পরায় এমন উদ্ধাস্তু জীবনের ঘানি টেনে এরা সেই সমাজের ভিতরেই আর এক অন্ধকারাছন্ন সমাজের বাসিন্দা হয়ে গেছে। যেখানে স্বাভাবিকতার চাইতে, মানবিকতার চাইতে অস্বাভাবিকতা-বিকৃতি-অমানবিকতার প্রাধান্য। সংখ্যায় এরা লাখ ছাড়িয়ে কোটির ঘরও ছাড়িয়ে গেছে সারা দেশে।

এই মানুষগুলো সমাজচ্যুত হলেও এদের আর্থ-সামাজিক ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। এদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শ্রম যে জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কতটা অবদান রাখে সেটা বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে স্থান পায়। যদিও নাগরিক সমাজের কাছে তাদের মূল্যায়ন নেই বললেই চলে। যারা বাসাবাড়িতে, পরিবহণে, অফিস-কারখানায় এদের সস্তা শ্রমের উপকারভোগি তাদের কাছে এরা মানুষের মর্যাদা পায় না। রাজনীতিবিদরাও এদের ব্যবহারই করেন মিছিল-মিটিংয়ে, আন্দোলন-সংগ্রামে, হরতালে বেপরোয়া সৈনিক হিসেবে। রাজপথে তারাও ঘাম ঝরায়, রক্ত ঝরায়, জীবন দেয়। কিন্তু বিনিময়ে কি পায়? বিজয়ের আলো কি তাদের জীবনের অন্ধকার দূর করে?

গৃহহীন এই মানুষগুলেকে নিয়ে দেশি-বিদেশি সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচির অভাব নেই। বাজেট বরাদ্দও কম নয়। কিন্তু বাস্তবে জরিপ বা রিপোর্টের পাতা বাড়লেও এদের জীবনের কাঙ্খিত পরিবর্তনের দেখা মেলে না। সরকার ‘ঘরে ফেরা’ জাতীয় কর্মসূচি নিয়ে নন্দিত হলেও এই মানুষগুলোর স্থায়ী ঠিকানা হয় না। ঘরের সাথে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব না পাওয়াতেই শেষ পর্যন্ত সবকিছু ভেস্তে যায়। অভাগা বা দূর্ভাগা জীবনই স্থায়ী হয়ে ওঠে। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতির বাঁকে বাঁকে যাদের ভূমিকা তাদের দৃশ্যমান জীবনে মানবিক বাসস্থান, স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা কি এতটাই কঠিন?

মুক্তিযুদ্ধে আমরা এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলাম যেখানে সব নাগরিকের জন্যই বৈষম্যহীন, মানবিক মর্যাদা সম্পন্ন, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার কথা ছিল। চার দশক পরেও আমরা তার দেখা পেলাম না। লাখ লাখ মানুষের উদ্বাস্তু জীবনের পরিবর্তনের জন্য সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও এখনও তা মুখের আশাবাদেই আটকে আছে। দৃশ্যমান হয়নি যদিও এর বাস্তবায়ন খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে।

লেখক : সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

চারপাশে ভয়াবহ পরিবর্তনের আশঙ্কা

সালেহা চৌধুরী : বিজ্ঞানী, ভূগোল পণ্ডিত, আবহাওয়া অফিস, রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী সকলের ধারণা, ১০ থেকে ২৫ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *