ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ ৭:৩৮ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালদের কেন শাস্তি হয় না?

দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালদের কেন শাস্তি হয় না?

বাংলাদেশে দুর্নীতির কথা বহুল আলোচিত। ঠিক কোন খাতে দুর্নীতি নেই সেটা বলা কঠিন বিষয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতিও পিছিয়ে নেই। সরকারি, বেসরকারি কোন ব্যাংকেই দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এমনটা বলার সুযোগ নেই। ফলে দুর্নীতি অবাধ ও লাগামহীন হয়ে উঠেছে।

পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি দুর্নীতি হয়। তবে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপও দেখা যায়। তাই সেসব দেশে দুর্নীতি অবাধ ও লাগামহীন হয়ে উঠতে দেখা যায় না। যেমন এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্থ দেশগুলোর একটি ভিয়েতনাম। দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে সেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানকালে অনেক রাঘব বোয়াল ধরা পড়ে। বিচারে তাদের শাস্তিও হয়। গতবছর সেপ্টেম্বরে বড়ধরনের জালিয়াতির দায়ে দেশটির ৩৬ ব্যাংক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও দেয়া হয়। এভাবে ব্যাংক কর্মকর্তা, কর্মচারিদের শান্তি আমাদের দেশেও হয়েছে। কিন্তু আলোচিত কোন রাঘব বোয়াল ধরা পড়ার কোন ঘটনা জানা নেই। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দূরের কথা। ফলে দুর্নীতি লুটপাটের গতি অব্যাহত গতিতে চলমান রয়েছে।

শীর্ষ পর্যায়ে হাত না পড়লে যে অবস্থার পরিবর্তন আশা করা যায় না সেটা সবাই বোঝে। সম্প্রতি ভিয়েতনামে ঋণ জালিয়াতির দায়ে ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর পাওয়া গেছে। সেদেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের সাবেক মহাপরিচালককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। অবৈধভাবে লাখ লাখ ডলার ঋণ অনুমোদন করে সরকারি অর্থ বেহাত করার অভিযোগে ব্যাংকটির আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ওসান ব্যাংকের সাবেক মহাপরিচালককে তহবিল তছরুপ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে আদালত। এর একদিন আগে একই অভিযোগে ব্যাংকটির সাবেক চেয়াম্যানকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে, যিনি ভিয়েতনামের সবচেয়ে ধনীদের একজন।

দুর্নীতিতে পিছিয়ে না থাকলেও আমাদের দেশে এরকম ঘটনা এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। অথচ আমাদের ব্যাংকিং খাতের অবস্থা ভয়াবহ বলাটা কম বলা হয়। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৮ সালে ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। সবাই আশা করেছিল এ সরকারের আমলে অবস্থার উন্নতি হবে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে। কিন্তু ২০১৬ সালের শেষে দেখা গেল ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই সরকারের আটবছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৯ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকগুলো প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করেছে। এই হিসাব ব্যংকগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে। এছাড়া খেলাপি ঋণ লুকানোর ঘটনা তো আছেই।

অতি সম্প্রতি এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাবেক গভর্নরের মন্তব্য হলো, বিগত বছরগুলোতে ব্যাংকিং খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। যা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে আস্থাহীনতা ও উৎকন্ঠা। পেশাগত অভিজ্ঞদের পরিবর্তে রাজনৈতিক, দলীয় ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালক নিয়োগ দেয়ায় রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে অনিয়ম বেড়েছে। অন্যদিকে একান্ত রাজনৈতিক বিবেচনায় দেয়া হয়েছে ও হচ্ছে নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন। এতে করে জনগণের ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম দুটি কাজ হচ্ছে স্থিতিশীল মুদ্রানীতি পরিচালনা ও ব্যাংকিং খাতের ওপর তদারকি নজরদারি করা। কিন্তু বাস্তবে বৈদেশিক রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধি করা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা দেখাতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি রোধে কার্যকর কোন পদক্ষেপও নিতে পারেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খল অবস্থা এখন আর গোপন কিছু নয়। কীভাবে দুর্নীতি, দলীয়করণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে সেটাও সবার জানা। সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠান কীভাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সেটা বহুল আলোচিত বিষয়। এতবড় আর্থিক জালিয়াতির নেপথ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কিছু ব্যক্তির নাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে জানা গেলেও সে ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মুখ খোলেনি। আর অর্থমন্ত্রীর মুখে শোনা গেছে, এতো সামান্য টাকা!

জনতা, প্রাইম, প্রিমিয়ার, শাহজালাল, সাউথ ইস্ট ব্যাংক থেকে টেরি টাওয়েলস রফতানির ভুয়া তথ্যে প্রায় ২২ শ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বিসমিল্লাহ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বিষয়টি ধরা পড়ার পর ঋণগ্রহীতা ও তার ঘনিষ্ঠজনরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তাদের আইনের আওতায় আনতে পারা না গেলেও এঘটনায় জড়িত ব্যাংকের বেশকিছু কর্মকর্তা জেলে রয়েছেন। ২০০৯ সালে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন সাবেক এমপি ও রাজনীতিক শেখ আব্দুল হাই বাচ্চু। এরপর থেকে অনিয়ম বাড়তে থাকে। বিদেশে অর্থ পাচারসহ ভুয়া প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়ার প্রমাণও পাওয়া যায়। শুরুতে প্রভাব খাটিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত এতে ব্যর্থ হন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক অপসারণ করে এবং পরিচালক পরিষদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দেয়। একসময় অভিযুক্ত চেয়ারম্যান অর্থমন্ত্রীর বাড়িতে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন। এভাবে তাকে নিরাপদে চলে যেতে দেয়া হয়। এমনকি দুদকের কোন মামলায় তাকে আসামিও করা হয়নি। প্রদত্ত ঋণ প্রক্রিয়ায় যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সহায়তা করেছিলেন তাদের অনেকেই এখন জেল খাটছেন।

পুরনো সরকারি-বেসরকারি ব্যাংগুলোর বিরুদ্ধে এমন দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনার অভাব নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উদ্ঘাটিত হওয়ার পর দুদকের মামলা শুরু হলেও দুর্নীতির কিছুই থেমে থাকেনি। এর প্রমাণ চতুর্থ প্রজন্মের ফার্মার্স ব্যাংকের ঘটনা। কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ব্যাংকটি নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে জানা যায়, ব্যাংকটির ছয়টি শাখায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম পাওয়া গেছে। এমনকি ব্যাংকের জনবল নিয়োগেও কোন নিয়ম-কানুন মানা হয়নি। এরপর ব্যাংকটিতে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাদের তথ্যমতে, ব্যাংকের শাখা কর্তৃক যাচাই-বাছাই ছাড়াই ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে ঋণ আবেদন। প্রধান কার্যালয়ও যথারীতি যাচাই-বাছাই ছ্ড়াাই তা পরিষদে উত্থাপন করে এবং অনুমোদনও হয়ে যায় ঐ ঋণ। ঋণ অনুমোদনের আগেই গ্রাহককে সাময়িক অনুমোদনপত্র দেয়ার মত বিরল ঘটনাও ঘটেছে এখানে।

নতুন ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতির শেষ নেই। এক ব্যাংকের ঋণ খেলাপি অন্য ব্যাংকের পরিচালক হয়ে কোটি টাকার ঋণ পেয়েছেন এমন ঘটনাও জানা যায়। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য হচেছ, একটি দুটি নয়, এগারটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণখেলাপি খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপক। সময়মতো ঋণ বিতরণ আর আদায়ে পরামর্শ দেয়া তার কাজ। প্রভাষ চন্দ্র মল্লিক নামে এই কর্মকর্তা বগুড়া থেকে বদলি হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এখন কর্মরত। এ যেন বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা! এরপরও কোন কোন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা দুদকের কার্যক্রম ঠেকাতে উচ্চ আদালতের দারস্থ হয়ে স্থগিতাদেশ লাভেরও নজির আছে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি-অনিয়মের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন, নির্দেশ-নির্দেশনা, দুদকের তদন্ত, মামলা, জেল, জরিমানা কিছুরই অভাব নেই। কিন্তু এসবই চুনোপুটিদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ। ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে তেমনটি বলা যাবে না। নতুন করে একই খেলা শুরু হওয়া আটকায় না। এ পর্যন্ত রাঘব বোয়াল কেউই আটক হননি, শাস্তিও পাননি। ধরা পড়ে যারা ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারি। শীর্ষ পর্যায়ের রাঘব বোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। বহাল তবিয়তে রয়েছেন দেশে অথবা বিদেশে। ফলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেনি। এক্ষেত্রে ভিয়েতনামের ঘটনা কি নজিরবিহীন বলা যায়?

ভিয়েতনামের জনগণ দীর্ঘ ৩০ বছর যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত ও স্বাধীন করেছে। আর আমরা মাত্র নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন হয়েছি। এজন্য অকাতরে রক্তপাত, জীবন দান, জুলুম-নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে এদেশের সাধারণ জনগণকে। ৩০ লক্ষ জীবনদান ও হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশে দুর্নীতির চাষ হবে সেটি মেনে নেয়া যায় না। ভিয়েতনাম যদি দুর্নীতিবাজ রাঘব বোয়ালদের আটক করতে পারে, বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দিতে পারে তাহলে আমরা কেন পারি না?

লেখক: সাংবাদিক

 

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

ঋত্বিক ঘটক আমাদের অন্তহীন প্রেরণা

মাহী ইলাহি : বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বহুল উচ্চারিত ও আলোচিত কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার ও নাট্যকার ঋত্বিক …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *