অক্টোবর ১৭, ২০১৭ ৫:১৯ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান

সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান

বাংলাদেশের বাজার কতটা অনিয়ন্ত্রিত সেটা নতুন করে প্রমাণ হয়েছে সাম্প্রতিক চালের দামে উর্ধ্বগতির ঘটনায়। কয়েকমাস চালের বাজারে ছিল পাগলা ঘোড়ার দাপট। অস্বাভাবিকহারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। অবশেষে এখন তা থমকে দাঁড়িয়েছে। ধীরগতিতে হলেও কমতে শুরু করেছে। কিন্তু বাড়তে শুরু করেছে আটার দাম।

রাজধানীর বাজারে ঈদের পর থেকে দুই দফায় খোলা আটার দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ টাকা। সেইসাথে বেড়েছে প্যাকেটজাত আটার দামও। চাল ও আটার দামবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের বাজেট তছনছ করে দিয়েছে। সীমিত আয়ের মানুষ হিমসিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে।

দেরিতে হলেও সরকারের চাল আমদানি বাড়ানো, মজুদ বিরোধী অভিযান ও খোলা বাজারে ওএমএসের চাল বিক্রির ফলে বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করলেও বিশৃঙ্খলা দূর হয়নি। গত কয়েকদিনে পাইকারি বাজারে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ছয় টাকা পর্যন্ত কমলেও খুচরা বাজারে তেমন প্রতিক্রিয়া নেই। সেখানে দু’তিনটাকার বেশি কমেনি। বাজারের এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা যেন চিরস্থায়ী হয়ে উঠেছে।

আমাদের দেশে প্রধাণ খাদ্যশস্য চাল হওয়ায় এখানে দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া ব্যাপক হয়ে ওঠে। যেমন ভোক্তা সাধারণের কপাল কুঁচকে ওঠে দুশ্চিন্তায় তেমনি ফায়দা লোটার দল চাঙ্গা হয়ে ওঠে পকেট ভরতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সরকারি-বেসরকারি একাধিক সংস্থার তথ্যমতে দেশে দৈনিক চালের চাহিদা ৯০ হাজার টন। এই হিসাবে একমাসে চালের প্রয়োজন ২৭ লাখ টন। দেশে পাঁচ মাস ধরে চালের বাজার অস্থিতিশীল। দফায় দফায় বেড়েছে দাম। পরিস্থিতি সামাল দিতে চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেবার পর বেসরকারিভাবে আমদানি উৎসাহিত করতে দুই দফায় আমদানি শুল্ক ২৮ থেকে ২৬ শতাংশ কমিয়ে ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তারপরও চালের বাজারে পাগলা ঘোড়ার লাগাম টানা যায়নি।

বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে অন্য বেশ কিছু নিত্যপণ্যের দাম অস্থির হলেও চালের বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। মোটা চালের কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা আর সরু চাল ৪০ থেকে ৪২ টাকা। টানা কয়েকবছর বাম্পার ফলনের ফলে বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠা নিয়ে বেশ কলরবও শোনা যেতে থাকে। মূল্যস্ফীতি নেমে আসে ছয় শতাংশের নিচে। কিন্তু মার্চে হাওয়ের অকাল বন্যায় সৃষ্ট বিপর্যয়ের কারণে চালের মজুদে টান পড়ায় বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তারপর বন্যার ধাক্কা অস্থিরতা বাড়িয়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়।

সরকারি বিপনন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের(টিসিবি) বাজার দরের তথ্যানুযায়ী গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ১৫ থেকে ১৭ টাকা। মিনিকেট নামের চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ১৫-১৯ টাকা, নাজিরশাইল ১৫-১৬ টাকা, মাঝারি মানের চাল ১২-১৩ টাকা, (পাইজাম-লতা) সাধারণ মানের ১২-১৩ টাকা আর মোটা চাল ১৮-২০ টাকা। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিমাসে কমপক্ষে ২৭ লাখ টন চালের ওপর সিন্ডিকেট সদস্যরা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। সরকার ৩৪ টাকা কেজিতে মোটা চাল কিনে থাকে যার বাজার মূল্য এখন ৫০ টাকা।

গত পাঁচ মাসে চালের বাজার অস্থিতিশীল করে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার মত হাতিয়ে নিয়েছে চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। সময়মতো সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে না পারায় তারা জনগণের পকেট কাটার এই সুযোগ পেয়েছে বলা যায় জোরের সাথেই।

এপ্রিলে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে গেলে ক্ষতি হয় লাখ লাখ একর জমির ধান। তারপর আসে বন্যা। হাওয়ের বিপর্যয় ও বন্যায় ধান উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। চালের মজুত তলানিতে এসে ঠেকে। কয়েক মাসের ব্যবধানে চালের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যায়। গত বছরের হিসাব ধরলে এই বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। মন্ত্রীদের কথায়, আশ্বাসে সময় ক্ষেপণের পর শুরু হয় দেশ-বিদেশে ছুটাছুটি। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে যে, যখন মিয়ানমার সরকার লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে তখন সেই সরকারের কাছেই চাল কিনতে যান খাদ্যমন্ত্রী। তারা জানিয়ে দেয়, আগের দামে চাল দেয়া যাবে না, বেশি দাম দিতে হবে। ভারত-ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাল আমদানিতেও সময় লেগে যায়। বেসরকারি আমদানি উৎসাহিত করতে শুল্ক কমিয়েও সময় কুলানো যায়নি। বাজারে চালের সর্বনি¤্ন দর উঠে যায় কেজিপ্রতি ৫০ টাকা।

ক্ষমতাসীনদের মুখে বাজারের স্বাভাবিকতার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারসাজি ও অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে হুশিয়ারি সত্ত্বেও দাম না কমায় শেয় পর্যন্ত তিন মন্ত্রী বসলেন সেই ব্যবসায়ীদের সাথেই। আলোচনায় তাদের সব দাবি মেনে নিয়েই সভাশেষে কেজিতে ২ টাকা কমানোর কথা জানা গেল। এর মধ্যেই আমদানি করা চাল বাজারে আসায় এবং দেশজুরে অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযানে পরিস্থিতি থমকে দাঁড়ায়। হাজার হাজার বস্তা ধান-চাল উদ্ধার হয়। জরিমানা হয় অবৈধ মজুদদারদের। পাশাপাশি শুরু হয় ওএমএসে চাল বিতরণ কর্মসূচি। বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাবে চালের দাম কমতে থাকে।

পরিস্থিতি কেন এমন হলো সেটা নিয়ে নানা মত। পত্রিকায় প্রকাশিত খাদ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে চাল উৎপাদন কম হয়েছে ২০ লাখ টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল সাড়ে তিন কোটি মেট্রিকটন। এর মধ্যে এক কোটি ৯২ লাখ টনই বোরো। এটাই আমাদের প্রধাণ ফসল। এ সময়েই সরকারের খাদ্য গুদামে বড় ধরনের সংগ্রহ কার্যক্রম চলে। এবার সে সময়েই উপর্যুপরি বিপর্যয়ের ফলে ব্যাহত হয় খাদ্য সংগ্রহ কার্যক্রম। চালের হিসাবে প্রায় ৯ লাখ টন সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এ যাবৎ পাওয়া গেছে মাত্র ২ লাখ ৬০ হাজার টন। এর কারণ খোলাবাজারে দাম বেড়ে যাওয়া। সরকার নির্ধারিত ৩২ টাকা কেজিতে মিলাররা চাল দিতে সক্ষম হননি। এ ক্ষেত্রে বাস্তবতা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় চাল সংগ্েরহ লক্ষ্যমাত্রার ধারেকাছেও যাওয়া যায়নি। এই দুর্বলতার কারণে বাজারে হস্তক্ষেপও করা সম্ভব হয়নি। ফলে চালের মূল্য বৃদ্ধি অস্বাভাবিক হওয়া ঠেকাতে আমদানির বিকল্প ছিল না। কিন্তু সেখানেও অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতি বেসামাল করে তোলে।

মার্চের অকাল বন্যায় হাওরের বিপর্যয়ে ফসলহানির পর পরই তড়িৎগতিতে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। বন্যার আলামতও ঘুম ভাঙায়নি সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের। তারা মুখের কথা দিয়েই সব কিছু সামাল দিতে চেয়েছেন। ফলে বাজার চলে যায় সিন্ডিকেটের দখলে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে সমন্বয়ের অভাব, বাজার ব্যবস্থাপনার অকার্যকারিতা ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার লোভ পরিস্থিতি অস্বাভাবিক করে তোলে। এমন অবস্থা যে সেটা নতুন বলা যাবে না।

কথায় বলে সময়ের এক ফোঁড় , অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান। চালের বাজার অস্থির, অনিয়ন্ত্রিত হবার পেছনে এ কথাটা ভুলে যাওয়াই কাজ করছে। যারা দায়িত্বপূর্ণ পদে আছেন তাদের দূরদর্শিতার অভাব ও পূর্ব অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ায় এমন পরিণতির পুনরাবৃত্তি মোটেই কাম্য নয়।

ভবিষ্যতে এমন অবস্থা এড়াতে সার্বক্ষণিকভাবে বাজার মনিটরিংয়ের পাশাপাশি সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। খোদ কৃষকদের কাছ থেকে ফসল কেনার ব্যবস্থা করার কথা গুরুত্বসহকারে চিন্তা করা যেতে পারে। এজন্য কন্ট্রাক্ট বা চুক্তিভিত্তিক ফসল উৎপাদন  চালু করা ও শষ্যবীমা ব্যবস্থা পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

ত্যাগ ও উৎসর্গের মর্মবাণী নিয়ে এলো ঈদ

ত্যাগ ও উৎসর্গের বারতা নিয়ে আবারো এলো খুশির ঈদ। আল্লাহ্র সান্নিধ্যলাভে নবী হযরত ইব্রাহিম( আ:) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *