ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ

Home / slide / আবার প্রাণ ফিরবে সাধারণ গ্রন্থাগারে

আবার প্রাণ ফিরবে সাধারণ গ্রন্থাগারে

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের বয়স এখন ১৩৩ বছর। স্বাভাবিকভাবেই জীর্ণ হয়ে উঠেছে এর ভবন। কাদার দেয়ালে ঢুকেছে উঁই পোকা। সেখান থেকে বেরিয়ে নষ্ট করছে মূল্যবান বইপত্র। পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় পাঠক সংখ্যাও কমেছে অনেক আগে। ফলে জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারছে না গ্রন্থাগারের বহু মূল্যবান ৩৬ হাজার বই।

এ অবস্থায় গ্রন্থাগারটিকে এবার আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঝুঁকিপূর্ণ পুরনো সেই দোতলা ভবনটি ভেঙে নতুন আধুনিক ভবন নির্মাণ হতে যাচ্ছে অচিরেই। নতুন এই গ্রন্থাগার ভবনে থাকবে অত্যাধুনিক একটি মিলনায়তন। থাকবে নাট্যমঞ্চ। এর মাধ্যমে রাজশাহীর সাংস্কৃতিক চর্চা আরও বিকশিত হবে বলেও আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ সমস্ত কাজে অর্থায়ন করছে ভারত সরকার। আর বাস্তবায়ন করছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। ভবনটি নির্মাণে ব্যয় করা হবে চার কোটি ৩৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা। রাসিকের ‘সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ এবং প্রত্নতত্ব অবকাঠামো উন্নতি সাধন ও সংরক্ষণের মাধ্যমে রাজশাহী মহানগরীর টেকসই উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় অন্য পাঁচটি প্রকল্পের সাথে গ্রন্থাগার আধুনিকায়ন প্রকল্পটিও স্থান পেয়েছে।

প্রকল্পের পরিচালক রাসিকের যান্ত্রিক ও বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রেয়াজাত হোসেন জানান, রাজশাহীর পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারত সরকার সিটি করপোরেশনকে ২১ কোটি ৯৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা দিয়েছে। এই পাঁচ প্রকল্পের মধ্যে সাধারণ গ্রন্থাগার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সিটি করপোরেশনের কাছে আবেদন করেন। এরপরই সাধারণ গ্রন্থাগার পুননির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এটি নির্মাণ শেষ হলে আবার প্রাণ ফিরে পাবে রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার।

সাধারণ গ্রন্থাগারের নতুন ভবনটি হবে তিনতলা। কিন্তু উচ্চতা হবে পাঁচতলার সমান। সুদৃশ্য ওই ভবনের নিচে থাকবে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। ভেতরে থাকবে অফিস, গ্রন্থাগার ও প্রায় তিনশো আসন বিশিষ্ট একটি মিলনায়তন। এর সঙ্গে থাকবে একটি নাট্যমঞ্চ। সেখানে থাকবে নারী-পুরুষ অভিনয় শিল্পীদের জন্য আলাদা মেক-আপ রুম, চেঞ্জিং রুম ও রিহার্সেল রুম। থাকবে উন্নত সাউন্ড সিস্টেমও। পুরাতন ভবনটির আদলে সেখানে একটি রেপ্লিকাও স্থাপন করা হবে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, গ্রন্থাগার পুননির্মাণের ঠিকাদার নির্বাচনে এরই মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। আরসিসিএল-আরই-এমসি নামে একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান কাজটি পেয়েছে। গত ১১ মে ঠিকাদারকে কার্যাদেশও দেয়া হয়েছে। পরে পুরাতন ভবন অপসারণের জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে। আগামি ৪ অক্টোবর নিলামের দরপত্র জমা দিবেন ঠিকাদাররা। এরপরই পুরাতন ভবন অপসারণের কাজ শুরু হবে। আর পুরাতন ভবনের মালামাল বিক্রি করে যা অর্থ পাওয়া যাবে তা গ্রন্থাগারের হিসাবেই জমা দেয়া হবে।

রেয়াজাত হোসেন বলেন, গ্রন্থাগার ভবন নির্মাণের মেয়াদকাল হচ্ছে আগামি বছরের জুন পর্যন্ত। আগামি অক্টোবরে ভবন অপসারণ সম্ভব হলে পরের মাস থেকেই নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হবে। সম্প্রতি রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা গ্রন্থাগার কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসকসহ অন্য সদস্যদের সঙ্গে এ ব্যাপারে মতবিনিময় করেছন। তিনি এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভবন নির্মাণের শতভাগ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা যায়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দিঘাপাতিয়ার জমিদার রাজা প্রমদা নাথ রায়ের দান করা জমিতে কাশিমপুরের জমিদার রায় বাহাদুর কেদার নাথ প্রসন্ন লাহিড়ী বর্তমান গ্রন্থাগার ভবনটি নির্মাণ করেন। ১৮৮৪ সালে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। রাজশাহী নগরীর মিয়াপাড়ায় অবস্থিত বলে এটিকে ‘মিয়াপাড়া সাধারণ গ্রন্থাগার’ বলেই অনেকে চেনে। গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠাতা রানী ভবানীর বংশধর রাজা আনন্দনাথ।

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সরোজিনী নাইডু, মোহিতলাল মজুমদার, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জলধর সেন, স্যার আজিজুল হক, সজনী কান্ত দাস, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, শরৎচন্দ্র বোসসহ আরও অনেকে গ্রন্থাগারটিতে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের চারটি গ্রন্থাগারের মধ্যে এই গ্রন্থাগারকে বিভাগীয় লাইব্রেরির মর্যাদা দিয়েছেন।

আগে এর নাম ছিল রাজশাহী সাধারণ পুস্তকালয়। ১৯৭৫ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনীর মাধ্যমে নামকরণ হয় রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রন্থাগারের জন্য নিজ হাতে স্বাক্ষর করে বই উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সে বই এখনো রয়েছে। তবে নেই আগের মতো পাঠক। এখন পুননির্মাণের মধ্যে দিয়ে গ্রন্থাগারটি নবজীবন লাভ করলে আবার পাঠক আর সাংস্কৃতিক কর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারের সাহিত্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং কবিকুঞ্জের সাধারণ সম্পাদক কবি আরিফুল হক কুমার বলেন, গ্রন্থাগারের এখনকার দেয়ালে গাঁথুনি কাদার। তাই পুরনো এ ভবনটি সংস্কারের আর কোনো উপায় নেই। এটি এখন খুব ঝুঁকিপূর্ণ। তাই নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সাধারণ গ্রন্থাগার রাজশাহীর ঐতিহ্যোর একটি অংশ। এ ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করতেই নতুন ভবন করা হচ্ছে। নতুন ভবনে গ্রন্থাগারের বইগুলোর ক্যাটালগ ডিজিটাল করা হবে। ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাবও থাকবে। ফলে সেখানে প্রচুর সংখ্যক পাঠক এবং গবেষকদের আগমন ঘটবে। তারা ঐতিহ্যবাহী এই গ্রন্থাগারকে ঘিরে এখন আশার আলো দেখছেন।

ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ডা. এফএমএ জাহিদ বলেন, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী সাধারণ গ্রন্থাগার শুধু বই পড়ার জন্যই হবে না। সেখানে যে মিলনায়তন করা হচ্ছে সেটি খ্বুই প্রয়োজন। এর মাধ্যমে রাজশাহীর সাংস্কৃতিক চর্চাও বিকশিত হবে। নতুন ভবন নির্মাণ রাজশাহীবাসীর জন্য একটি সুসংবাদ। নতুন ভবন হলে বই পড়ায় নতুন ধারা যেমন তৈরি হবে, তেমনি সাংস্কৃতিক বলয়টাও রক্ষা পাবে।

ডা. জাহিদ বলেন, ‘বিদেশ থেকে অতিথি এনে রাজশাহীতে এখন একটি অনুষ্ঠান করবো তেমন পরিবেশ নেই। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মতোও জায়গা নেই। নতুন ভবনটি নির্মাণ হলে সে সঙ্কট দূর হবে। আবার পুরনো ভবনের দেয়ালে উঁই পোকা ঢুকে গেছে। সেখান থেকে বেরিয়ে বইপত্র নষ্ট করছে। নতুন ভবন হলে মূল্যবান বইগুলোও রক্ষা পাবে। আমরা এই ভবন নিয়ে খুবই আশাবাদী।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের রাজশাহী মহানগরের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার ঘোষ বলেন, নতুন করে নির্মিত হতে যাওয়া ভবনটিতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে একটি করে কক্ষ বরাদ্দ করার জন্য তারা দাবি তুলেছেন। সংগঠনগুলো ভাড়া দিয়েই সেখান থেকে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। এর ফলে গ্রন্থাগার যেমন লাভবান হবে, তেমনি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসবে।

এসবি/এমই

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

রাজশাহীতে গৃহবধূর লাশ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মহানগরীতে সুচিত্রা দাস (৩০) নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *