ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ ৮:১১ অপরাহ্ণ

Home / slide / এক মোজাহারেই বেহাল রামেক হাসপাতাল

এক মোজাহারেই বেহাল রামেক হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে উন্নয়ন প্রকল্পে একজন লিফট চালক হিসেবে বিএনপি সরকারের আমলে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান মোজাহার আলী খান। কিছু দিন পর সে প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে চাকরি চলে যায় মোজাহারের। পরে অবশ্য হাসপাতালের ফটোগ্রাফার পদে চাকরি পান মোজাহার।

তবে এবার আর অস্থায়ী নয়। স্থানীয় একজন বিএনপি নেতার স্ত্রীর মাধ্যমে পুরোপুরি স্থায়ীভাবেই নিয়োগ পান মোজাহার। তারপর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাটুকারিতা করে চলে যান স্টেনোগ্রাফার পদে। সেখান থেকে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই হয়ে যান হাসপাতাল পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারি (পিএ)।

এরপর পুরো হাসপাতালেরই নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন মোজাহার। ফার্মেসি থেকে রন্ধনশালা-সবখানেই শুরু হয় তার খবরদারি। অভিযোগ ওঠে, হাসপাতালের নারী কর্মচারিদের অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ারও। নানা-অনিয়ম আর দুর্নীতির তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও সত্যতা মেলে অভিযোগের।

কিন্তু এরপরেও বহাল মোজাহার। ফলে এখন তার কাছেই তটস্থ থাকতে হয় হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের। হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা বলছেন, মোজাহারের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগের সত্যতা মেলায় হাসপাতাল পরিচালক তাকে লোকদেখানোভাবে তার পিএ পদ থেকে অপসারণ করেছেন। কিন্তু তাকে সংযুক্ত করা হয়েছে হাসপাতালের রেকর্ড শাখায়। ফলে মোজাহারের খুঁটির জোর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এখন এক মোজাহারের কারণেই বেহাল হয়ে উঠেছে রামেক হাসপাতাল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে হাসপাতালের একজন নারী কর্মচারিকে অনৈতিক প্রস্তাব দেন পরিচালকের তৎকালীন পিএ মোজাহার। প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় নানাভাবে ওই নারীকে হয়রানির চেষ্টা করতে থাকেন মোজাহার। বাধ্য হয়ে ওই নারী কর্মচারি তখন হাসপাতাল পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন ব্লাড ব্যাংকের প্রধান প্রফেসর ডা. মোসাদ্দেক হোসেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানান, সম্প্রতি তারা হাসপাতাল পরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাদের তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। তাই তারা মোজাহারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোজাহারের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবস্থায় নেয়া হয়নি। শুধু তাকে পরিচালকের পিএ পদ থেকে সরিয়ে রেকর্ড শাখায় দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে মোজাহার এখনও হাসপাতালে নানান অপকর্ম করে বেড়াচ্ছেন। এ নিয়ে তারা হতাশ।

জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এএফএম রফিকুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কমিটি বলেছে, তারা অভিযোগের আংশিক সত্যতা পেয়েছেন। তারা মোজাহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছেন। এ জন্য তাকে রেকর্ড শাখায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে কোনো অপকর্ম করছেন কি না তা তিনি জানেন না।

তবে হাসপাতালের কয়েকজন নারী কর্মচারি জানান, এখনও বেপরোয়া রয়েছেন মোজাহার। হাসপাতালের একাধিক নারী কর্মচারির সঙ্গে রয়েছে তার অস্বাভাবিক সম্পর্ক। এদের মধ্যে পিএ থাকা অবস্থায় মোজাহার হাসপাতালের বর্হিবিভাগের একজন মটিভেটরকে পরিচালকের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে বসিয়েছেন। ওই মটিভেটরের মাধ্যমে মোজাহার এখনও পরিচালকের কার্যালয়ে আধিপাত্য বিস্তার করে আছেন। মটিভেটরের কাছেও তটস্থ থাকতে হয় অন্যান্য নারী কর্মচারিদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোজাহার আলীর বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। খোদ তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। মোজাহার এসএসসি পাস হলেও এইচএসসি পাসের সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এ জন্য বেশ কিছু দিন আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক রাহিলা খাতুন হাসপাতালে একটি চিঠি দিয়ে মোজাহারের নিয়োগ সংক্রান্ত সব নথিপত্র তলব করেছিলেন।

অভিযোগের সংক্ষিপ্ত বিবরণে দুদকের এই কর্মকর্তা আরও লিখেছিলেন- হাসপাতালের বিভিন্ন নিয়োগের ক্ষেত্রেও মোজাহার আলীর বাণিজ্য ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে রাহিলা খাতুন মোজাহারের নিয়োগপত্রসহ সকল কাগজপত্র তলব করেছিলেন। এছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান পরিচালক থাকাকালে নিয়োগ পাওয়া হাসপাতালের সব কর্মচারির কাগজপত্রও তলব করেছিলেন রাহিলা খাতুন।

এদিকে বেপরোয়া মোজাহার আলীর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথেও খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য ২০১১ সালে হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুস সবুর মিয়া তৎকালীন ফটোগ্রাফার মোজাহার আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিলেন। পরে বিভিন্ন মহলে জোর তদবির চালিয়ে চাকরিতে ফেরেন মোজাহার।

এদিকে হাসপাতালের নারী কর্মচারিকে অনৈতিক প্রস্তাব দেয়ার ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটিকে সম্প্রতি হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. আলী আকবর সরকার লিখিতভাবে তার বক্তব্য জানিয়েছেন। এতে তিনি বলেছেন, মোজাহার আলীর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ তার কাছেও সত্য বলে প্রতিয়মান। এ ধরনের কাজ মোজাহার আলীর দ্বারাই সম্ভব। এটি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট।

লিখিত বক্তব্যে স্টোর অফিসার বলেছেন, মোজাহারের প্রধান সহযোগি হাসপাতাল পরিচালকের কার্যালয়ের এমএলএসএস আবদুল খালেক। কিছু দিন আগে একজন রোগির সঙ্গেও মোজাহার আলীর অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কর্মচারিদের ভাষ্যমতে, মোজাহার আলী হাসপাতালে নানাভাবে অবৈধ লেনদেনের সাথে জড়িত।

ডা. আলী আকবর লিখেছেন, রন্ধনশালায় মোজাহারের সহযোগি প্রধান বাবুর্চি মোক্তার আলী। তিনি প্রতিনিয়ত মোজাহারের বাসায় মাছ, মাংস, কলা ও ডিম সরবরাহ করে থাকেন। এছাড়া মোজাহার বিভিন্ন কর্মচারির মাধ্যমে নিজের নামে এবং বেনামে দামি দামি ওষুধ ফ্রি স্লিপের মাধ্যমে স্টোর থেকে উত্তোলন করেন। পরিচালকের পিএ থাকার কারণে অবৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্টোর থেকে দামি দামি ওষুধ নেয়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল।

হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে চাকরিতে ঢোকার পর কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়েছেন মোজাহার। দেশের বাড়ি খুলনায় হলেও অবৈধ টাকার জোরে তিনি রাজশাহী শহরে জমি কিনে বানিয়েছেন বাড়ি। অনেক অভিযোগ উঠলেও প্রায় সময়ই তিনি মোটা টাকা খরচ করে পার পেয়ে যান।

মুঠোফোনে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মোজাহার আলী বলেন, কোনো অভিযোগ নয়, পরিচালক পারেন, তাই তাকে রেকর্ড শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। মোজাহার আলী মুঠোফোনে এর বেশি কথা বলতে চাননি। তিনি তার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুরোধ করেন।

এসবি/আরআর/এসএস

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

চাঁপাইনবাবগঞ্জে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি দিবস পালন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : ‘সবার জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট’ এই প্রতিপাদ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *