সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭ ৩:১৫ অপরাহ্ণ

Home / বর্ণবাণ / বঙ্গবন্ধু : বাঙালির চেতনার বাতিঘর । এম আবদুল আলীম
ড. এম আবদুল আলীম

বঙ্গবন্ধু : বাঙালির চেতনার বাতিঘর । এম আবদুল আলীম

বাঙালি একটি ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ জাতি। বহু যুগের ইতিহাসের পথ-পরিক্রমায় অগণিত মানুষের চিন্তা-কর্মের সারনির্যাস থেকেই গড়ে উঠেছে বাঙালির স্বকীয় সত্তা, আপন অস্তিত্ব। কত মুনি-ঋষি, সন্ত-সাধক, পির-আউলিয়া, দরবেশ-ফকির, আউল-বাউল যে এই জাতির চেতনা-জগৎ বিনির্মাণে কাজ করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। এছাড়া প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী-ভাববাদী দর্শন এবং নানা মনীষীর বাদ-মতবাদ বাঙালির চেতনাকে করেছে শানিত। বুদ্ধ-মহম্মদ-যিশু-কৃষ্ণ এসব অবতার ও মহামানবের ধর্মীয় চিন্তায় বাঙালির ভাব-পরিমণ্ডল হয়েছে আচ্ছন্ন। চণ্ডীদাসের মানব-প্রত্যয়, লালনের অসাম্প্রদায়িকতা, নানক-কবির-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মানবিকবোধ— সবকিছুই বাঙালির চেতনার আকাশকে করেছে মহিমান্বিত। কালে কালে গড়ে ওঠা বাঙালির যে শ্বাশ্বত বৈশিষ্ট্য, তা গভীরভাবে ধারণ করেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির চিরন্তন সত্তাকে ধারণ করেছিলেন বলেই বাংলার কোটি কোটি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল, স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল এবং সর্বোপরি তাঁর নেতৃত্বে ইস্পাত-কঠিন ঐক্যের মাধ্যমে বহু ত্যাগ স্বীকার করে অর্জন করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল ব্যক্তি নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, একটি চেতনার বাতিঘর। এদেশে যুগে যুগে অনেক স্বাধীনতাকামী নেতার জন্ম হয়েছে। তাঁরা নানাভাবে চেষ্টা করেছেন বাঙালি জাতির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার। কিন্তু কেউই সেভাবে সফল হননি। বাঙালির স্বতন্ত্র আবাসভূমি ও স্বকীয় মর্যাদা কেবল বঙ্গবন্ধুই প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। ইতিহাসের পাতায় চোখ মেললে দেখা যায়, বাঙালি ছিল চিরকালের শোষিত জাতি। ‘ঐতরেয় অরণ্যক’ গ্রন্থে বাঙালিকে ইতর প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে বাঙালির যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে বঞ্চনার কথাই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ‘চর্যাপদে’ বাঙালির যে জীবনচিত্র পাওয়া যায়, তা দুঃখময়। পরবর্তীকালে ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনে বাংলা ভাষা ও বাঙালির জীবন পিষ্ট হয়েছে। দূর অতীতে আর্যদের উন্নাসিকতায় বাঙালির জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে ; শক-হুন-পাঠান-মোগল বাঙালির জীবনে প্রভাব বিস্তার করলেও, বাঙালিদের তারা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেনি। ব্রিটিশ বেনিয়া আর পাকিস্তানি শাসকেরা তো বাঙালির উপর চালিয়েছে অত্যাচারের স্টিমরোলার। মোদ্দা কথা হলো, বাঙালির ইতিহাস মূলত শোষণ-বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার ইতিহাস। এই বঞ্চিত বাঙালিকে মুক্তি দিয়েছেন শেখ মুজিব। মুক্তির সে পথ মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এজন্য তাঁকে দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। জীবন-যৌবনের মূল্যবান সময় কাটাতে হয়েছে জেলখানার অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সহ্য করতে হয়েছে অনেক জুলুম-নির্যাতন।

বঙ্গবন্ধু সত্যিই বাঙালির চেতনার বাতিঘর। তিনি যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন লড়াই করেছেন, এদেশের মানুষ তা গ্রহণ ও ধারণ করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেছে। তাঁর আদর্শ বুকে ধারণ করেই তারা অমিতবিক্রমে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে চেতনার মর্মমূলে স্থান দিয়ে জীবনের পথ চলে

এই বাংলায় আমরা বহু জাতীয়তাবাদী নেতার আবির্ভাব ও তাঁদের অবদানের কথা জানি। দেশবন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক, নেতাজীর বিপ্লবী আহ্বান, শের-ই-বাংলার গর্জন, সোহরাওয়ার্দীর প্রজ্ঞা, ভাসানীর সংগ্রাম—সকলের প্রচেষ্টায় বাঙালির চেতনায় জাতীয়তাবাদী বোধ জাগ্রত হলেও, তা স্বাধীনতা অর্জনের শক্তি অর্জন করতে পারেনি। সেটা সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর দ্বারা। বঙ্গবন্ধু নানা সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে এসে ১৯৭১ সালে উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন : ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো—এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশআল্লাহ্—এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম—এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ শুধু তাই নয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বাংলার আকাশ মহাদুর্যোগপূর্ণ, দানবীয় শক্তি আর অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তান বাহিনী যখন বাঙালির টুটি চেপে ধরে, তখন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ আবারও সরব হয়ে ওঠে। গভীর রাতে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের প্রাক্কালে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুললো, যার যা কিছু ছিল তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়লো। শুরু হলো সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। এরপর বহু ত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি অর্জন করল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ কৃতিত্ব পুরোটাই বঙ্গবন্ধুর। তিনিই পাবলেন বাঙালি জাতির জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। আর এ জন্যই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং ইতিহাসের মহানায়ক।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার-মানবতাবাদী চেতনায় বিশ্বাসী। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন : ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেভি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিষ্টান বলে কিছু নেই। সবাই মানুষ।’ বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে তাঁর এই উদার, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চেতনা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। এজন্যই বাংলার হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সকলেই তাঁর ডাকে সাড়া দিয়েছে। যুগ যুগ ধরে বাঙালির চেতনায় যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ সুপ্ত অবস্থায় ছিল, ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে তা উপ্ত হয়। এর ফলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী চেতনায় গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল কেঁপে ওঠে। পরবর্তীকালে নানা আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি স্বাধীন রাষ্ট্রের মালিক হয়। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার কোটি কোটি মানুষ তাঁর প্রতি গভীর বিশ্বাস স্থাপন করেছিল। পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ও জাতির পিতার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের অমর সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এটিকে তিনি চেতনার গভীরে স্থান দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সংস্কৃতিই হচ্ছে জাতির প্রাণ, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া জাতির প্রকৃত মুক্তি আসতে পারে না। ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭১ এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন : ‘দেশের গণমুখী সংস্কৃতিকে বিকশিত করার উদ্দেশ্যে সাহিত্য-সংগীতে কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীদের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, সুখ-দুঃখকে প্রতিফলিত করতে হবে। সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। তাই মাটি ও মানুষকে কেন্দ্র করে গণমানুষের সুপ্ত শক্তি ও স্বপ্ন এবং আশা-আকাক্সক্ষাকে অবলম্বন করে গড়ে উঠবে বাংলার নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতি।’

বাংলার মানুষকে বঙ্গবন্ধু মনে-প্রাণে ভালোবাসতেন। তৃণমূল পর্যায়ের অগণিত মানুষের সঙ্গে তিনি আত্মিক বন্ধন স্থাপন করেছিলেন। তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল এদেশের মানুষের সকল দুঃখ-দুর্দশা দূর করে তাদের মুখে হাসি ফোটানো। ১৮ জানুয়ারি, ১৯৭৪ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বলেছিলেন : ‘আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারব না—পারব না—পারব না—পারব না।’ বঙ্গবন্ধু যখন বাংলার কোটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কাজে ব্যস্ত, তখন তাঁর বিরুদ্ধে ভেতরে ভেতরে চলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি আর দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা মীরজাফরের উত্তরসূরিরা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মর্মমূলে কুঠারাঘাত হানতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করতে এবং পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরে যেতে চক্রান্ত শুরু করে। এ কাজে তারা ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নরপশুরা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। জাতির ভাগ্যাকাশে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মুছে ফেলার ঘৃণ্যতম কাজ। ইতিহাসের বিকৃতি আর অপপ্রচার চলে সমানভাবে। তবে চূড়ান্ত বিচারে ষড়যন্ত্রকারীরা পরাজিত হয়। শত চেষ্টা করেও তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বাঙালির চেতনা থেকে মুছে ফেলতে পারেনি। অপশক্তি সাময়িকভাবে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করলেও, বঙ্গবন্ধু কোটি কোটি মানুষের মনে ব্যাপকভাবে স্থানলাভ করেন। তাঁর চেতনার মশাল প্রজ্জ্বালিত হয় বাংলার ঘরে ঘরে। সে চেতনা চির-অম্লান, চির-ভাস্বর; ইচ্ছা করলেই তা মুছে ফেলা যাবে না।

বঙ্গবন্ধু সত্যিই বাঙালির চেতনার বাতিঘর। তিনি যে আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সারাজীবন লড়াই করেছেন, এদেশের মানুষ তা গ্রহণ ও ধারণ করেছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে হাসতে হাসতে জীবন উৎসর্গ করেছে। তাঁর আদর্শ বুকে ধারণ করেই তারা অমিতবিক্রমে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজও বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে চেতনার মর্মমূলে স্থান দিয়ে জীবনের পথ চলে। যতদিন বাঙালি জাতি থাকবে, যতদিন বাংলাদেশ নামক দেশ থাকবে, যতদিন বাংলার গছে গাছে ফুল-ফল আর পাখির কণ্ঠে গান থাকবে; ততদিন বঙ্গবন্ধু আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকবেন। তিনি চিরকালের বাঙালির চেতনার বাতিঘর হয়ে থাকবেন। পরিশেষে কবি রফিক আজাদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে হয় :

দু-যুগ ধরে যার আদর্শে সারাটি দেশ লড়লো,

তিরিশ লক্ষ বীর বাঙালি হাসিমুখে মরলো—

অনাদিকাল সেই মানুষটির কথা লোকে কোটি মুখে বলবে,

বুকের ভেতর অরূপ বতন মুখচ্ছবি সারাক্ষণই জ্বলবে।

এদেশেরই ধূলিকণায় অঝোর ধারায় থাকবে যে নাম বহমান,

প্রিয় সে মুখ আর কেউ নয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

. এম আবদুল আলীম : ডিন, মানবিক সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এসবি/এসএইচ

 

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

ক্ষুদ্রঋণ সহায়তার নামে অত্যাচার কবে বন্ধ হবে । আহমদ রফিক

‘বেসরকারি সাহায্য সংস্থা’এত বড় শব্দটির বদলে ‘এনজিও’। এই ছোট্ট, সংক্ষিপ্ত শব্দটিই বরাবর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *