নভেম্বর ২৪, ২০১৭ ৬:৫৫ অপরাহ্ণ

Home / শিশির বিন্দু / গুরুদেবের পরশ পেতে…
পতিসরের রবীন্দ্র ভাস্কর্য। ছবি : লেখক

গুরুদেবের পরশ পেতে…

বর্ষাকালে পতিসর নবরূপে পর্যটককে আকৃষ্ট করে। বর্ষায় পতিসর ভ্রমণের মজাই আলাদা। এ সময় আপনি যে প্রান্ত দিয়েই পতিসরে যান না কেন, প্রতিমুহূর্তে প্রকৃতির হাতছানি আপনাকে অনাবিল আনন্দে মাতিয়ে তুলবে। বর্ষায় নদী-বিল কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। লিখেছেন সুমন্ত গুপ্ত

পতিসরের জল-কাদায় মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ। বাতাসে কান পাতলেই ভেসে আসে রবীন্দ্র কণ্ঠস্বর। পতিসর কবিকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলে। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কর্মময় সময় কাটে এ পরগনায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর কালিগ্রাম পরগনার সদর কাচারি পতিসরে কবি আবার আসেন। প্রতিষ্ঠা করেন ‘পতিসর কৃষি ব্যাংক’। সেসব আকর্ষণের খোঁজে আমরা গিয়েছিলাম পতিসরে। যান্ত্রিক নগরী ছেড়ে আমরা যখন আত্রাই স্টেশনে এসে নামি, তখন ঘড়ির কাঁটাতে সকাল ৯.৩০টা। স্টেশনটি বেশ পুরনো ও ছিমছাম। ইতিহাসখ্যাত আত্রাই নদীর কারণে এই নামকরণ। আমাদের প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ট্রেনে কলকাতা থেকে সরাসরি এখানে এসে নামতেন। এর পর তিনি তার বিখ্যাত ‘পদ্মা বোট’-এ নদীপথে সোজা চলে যেতেন পতিসরের কাচারিবাড়িতে। কখনও কখনও পালকি ব্যবহার করতেন। কিন্তু আমাদের না আছে নৌকা, না আছে পালকি। তাই সময় বাঁচাতে দ্রুতযান সিএনজি অটোরিকশাই বেছে নিতে হলো। সময় ক্ষেপণ না করে একটা সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে সোজা রওনা হলাম পতিসরের উদ্দেশে। পিচঢালা সড়ক পেরিয়ে এগিয়ে চলেছি। পথিমধ্যে বৃষ্টি আমাদের বরণ করে নিল। আমরা সিএনজিতে বসে বৃষ্টি বেশ উপভোগ করছিলাম। ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। শুরু হলো বাজ পড়া। সে কী বিকট শব্দে বৃষ্টি! আমার ভ্রমণসঙ্গী আকাশ তো ভয়ে অস্থির। ওর ভয় পাওয়া দেখে আমারও কেমন জানি লাগছিল! আমি সূর্যদেবের নাম নেওয়া শুরু করলাম আর আকাশকে অভয় দিতে লাগলাম। সূর্যদেব পাপীর কথা শুনলেন। ধীরে ধীরে বাজ পড়া কমে এলো। রাস্তার দু’ধারে তালগাছের সারি। রোপণ করেছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এসব দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে যাই রবীন্দ্র-স্মৃতিধন্য পতিসরে।

প্রবেশপথে এক জোড়া সিংহমূর্তি আমাদের স্বাগত জানাল। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই মাঝের ফাঁকা জায়গায় দেখা পেলাম গুরুদেবের কংক্রিটের ভাস্কর্য। সেখানে কিছু সময় থমকে দাঁড়ালাম। আমি আবার সেই মুহূর্তকে ক্যামেরায় ধারণ করার চেষ্টা করলাম। দরজার দু’পাশে আছে মার্বেল পাথরে খোদিত পতিসরে সৃষ্ট রবীন্দ্র রচনার কিছু কথা। এক নিঃশ্বাসে পড়ে নিলাম সেসব। আমরা এগিয়ে চললাম সম্মুখ প্রান্তে। কথায় কথায় আকাশ বলল, কবির স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, একবার পতিসর যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল কবির জমিদারি দেখাশোনা নয়, স্বাস্থ্যোদ্ধার। স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ‘একদিন জলের মধ্যে পরিপূর্ণ শান্তির মধ্যে সম্পূর্ণ নির্জনতার মধ্যে নিঃশব্দে বাস করে আমার শরীরের অনেক উপকার হয়েছে। আমি বুঝেছি আমার হতভাগা ভাঙ্গা শরীরটা শোধরাতে গেলে একলা জলের উপর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই।’

আকাশের কথা চলছে আর আমরা এগিয়ে চলছি মিউজিয়ামের দিকে। রবীন্দ্রনাথের চেনা-অচেনা বিভিন্ন ছবি দিয়ে তিনটি ঘর সুন্দর করে সাজানো। রবীন্দ্রনাথের অন্য দুটি কুঠিবাড়ি শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের চেয়ে এটি অনেক বেশি গোছানো। এখানে রবীন্দ্র ব্যবহৃত আরাম কেদারা, লোহার সিন্দুক, গ্গ্নোব, বাথটাব, চিঠিপত্রের অনুলিপি, পদ্মা বোটের নোঙর, জানালার কাচ প্রভৃতি সামগ্রী পরম যত্নে সংরক্ষিত। সামনে এসে দেখা মিলল রবীন্দ্রনাথ মাথা উঁচু করে যেন দাঁড়িয়ে আছেন এবং আমাদের অভয়বাণী দিচ্ছেন। কাচারিবাড়ির সামনে রয়েছে রবীন্দ্র সরোবর, ফাঁকা মাঠ এবং মাঠ সংলগ্ন নাগর নদী। কাচারিবাড়ির উত্তরদিকে খননকৃত বিরাট দীঘি। দক্ষিণ দিকে রয়েছে কবির হাতে গড়া স্কুল ‘কালিগ্রাম রবীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’। সেখানে রয়েছে মাটির দেয়াল ও টালির ছাউনিতে তৈরি স্কুলের প্রথম ভবন। আমরা নদীপারের দিকে এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল আহমদ রফিক গ্রন্থাগার। উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। কথা হলো স্থানীয় বাসিন্দা রফিক সাহেবের সঙ্গে। তিনি বললেন, স্থানীয় কয়েকজন রবীন্দ্রপ্রেমিক মিলে বছরপাঁচেক ধরে গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরিটি। অজ-পাড়াগাঁয়ে এ ধরনের লাইব্রেরির কথা ভাবাই যায় না। প্রচুর সংগ্রহ; অধিকাংশই রবীন্দ্র বিষয়ক। আমরা লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এগিয়ে চললাম বাজারের দিকে। সেখানে পরোটা, ডিম ভাজি, চা খেয়ে হাঁটা ধরলাম। সঙ্গে রয়ে গেল কবিগুরুর পরশ।

কীভাবে যাবেন

নওগাঁর আত্রাইয়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ খুবই ভালো। তাই আত্রাইয়ে যেতে হলে ট্রেনই উত্তম। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন নীলসাগর এক্সপ্রেসে চড়ে প্রথমে আত্রাই যেতে পারেন। এ ছাড়াও নওগাঁ ও নাটোরের সঙ্গে আত্রাইয়ের যোগযোগ ভালো। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাস কিংবা ট্রেনে নওগাঁ/সান্তাহার বা নাটোর এসে পরে আত্রাই যেতে পারেন। নাটোর ও নওগাঁ থেকে বাস, ট্রেন ও নদীপথে নৌকায় আত্রাই যাওয়া যায়। আত্রাই থেকে পতিসর কাচারিবাড়ি যেতে হবে নছিমনে চড়ে, যা পর্যটকদের ভ্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ট্রেন স্টেশনের নিচেই রয়েছে নছিমন/ভটভটি স্ট্যান্ড। আত্রাই থেকে পতিসরের দূরত্ব ১৪ কিমি। পতিসরে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো হোটেল নেই। সরকারি একটি ডাকবাংলো আছে। পূর্ব অনুমতি থাকলে এখানে রাত্রি যাপন করা যায়। তা না হলে নওগাঁ শহরের যে কোনো আবাসিক হোটেলই ভরসা।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

বরফের স্বর্গ মানালি শিশিরবিন্দু ডেস্ক : ভ্রমণপিপাসু বাঙালিদের জন্য ঘরের পাশেই আছে এমন একটি দেশ যেটা দর্শনার্থীদের সুপার শপের মত।

বরফের স্বর্গ মানালি

শিশিরবিন্দু ডেস্ক :  ভ্রমণপিপাসু বাঙালিদের জন্য ঘরের পাশেই আছে এমন একটি দেশ যেটা দর্শনার্থীদের সুপার …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *