নভেম্বর ১৮, ২০১৭ ৬:০৪ অপরাহ্ণ

Home / slide / বাংলা ভাষা ও বাঙালি থেকে সরে আসা যাবে না: ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন

বাংলা ভাষা ও বাঙালি থেকে সরে আসা যাবে না: ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন

ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস। বাঙালিদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই বাংলা ভাষার ইতিহাস বর্ণিল ও রক্তমাখা। যা পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার ইতিহাসে নেই। কিন্তু বর্তমানে ভাষাপ্রেম আমাদের মধ্যে কতটা পরিলক্ষিত হচ্ছে? ভাষা দিবসে আমাদের নাটক বা চলচ্চিত্রে দু’-একটি ভাষাগল্প তুলে ধরা হলেও সারাবছর চলে ভাষার বিকৃতি।

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রাজশাহীর ছিল ঐতিহাসিক ভূমিকা। বাংলা ভাষার জন্য এ আন্দোলনে প্রথম রক্ত ঝরেছিল রাজশাহীতেই। রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিকদের মধ্যে কয়েকজন এখনও বেঁচে রয়েছেন। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন। রাজশাহী নগরীর শিরইল এলাকায় তাঁর নিজ বাসায় গিয়ে কথা হয় মহান এ ভাষাসৈনিকের সঙ্গে।

মাহী ইলাহি :  বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কৃতি নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই?
আবুল হোসেন : খুব খারাপ লাগে আমরা যে ভাষার জন্য আন্দোলন করেছি সে ভাষা আর নেই। শ্মশান বলা যাবে না, বলতে হবে গোরস্থান। আবার সেই আমরা পাকিস্তানে ফিরে গেছি। আমার দুর্ভাগ্য যে বেঁচে থাকা অবস্থায় এইগুলো দেখতে হচ্ছে। দাওয়াত বলতে হয় নিমন্ত্রণ বলা যাবে না। আমার খুব আশ্চর্য লাগছে এত টাকা খরচ করে পাঠ্যপুস্তক ছাপাচ্ছেÑ কিন্তু খুবই বাজেভাবে বই ছাপাচ্ছে। ভাষার প্রশ্ন আসুক, স্কুলের প্রশ্ন আসুক বা যায় আসুক না কেন, বিশেষ করে শিক্ষার উপরে যে বিরাট বৈষম্যÑ শহরের শিক্ষা একরকম, শহর থেকে গ্রামে আরেকরকম, উপজেলায় আরেকরকম ভিতরে যেয়ে আবার  আরেক রকম।

মাহী ইলাহি : আপনার বৈচিত্র্যময় জীবনের গল্প শুনতে চাই।
আবুল হোসেন : আমার জন্ম ভারতের পশ্চিমবাংলার মালদা জেলায়। আমি মালদা জেলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তখন শিক্ষাবোর্ড ছিল না। যখন আমরা পরীক্ষা দেই। তখন আমরা ছিলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ ব্যাচ। তারপর থেকে বোর্ড হয়ে গেল। আমি মালদা জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করি ১৯৫১ সালে। আর ১৯৫১ সালে চলে এসে আমি রাজশাহী কলেজে ভর্তি হয়। তখন পাসপোর্টের কোনো কড়াকড়ি ছিল না।

মাহী ইলাহি : রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন কিভাবে শুরু হলো?
আবুল হোসেন : এখন যে রাজশাহীকে দেখা যাচ্ছে সেই রাজশাহী ছিল না সেইসময়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে রাজশাহী কলেজ, কলেজিয়েট স্কুল, লোকনাথ হাই স্কুল, বিবি হিন্দু অ্যাকাডেমি আর পিএন গার্লস স্কুল ছিল। রাজশাহী কলেজে তখন শিক্ষকও ছিল ভালো। যার ফলে চট্টগ্রাম বা সিলেট থেকে সব ছেলেমেয়েরা রাজশাহী কলেজে পড়তে আসতো। ঢাকার চেয়ে রাজশাহী শিক্ষায় অনেক এগিয়ে ছিল। তখন আমি রাজশাহী কলেজের ছাত্র, শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। কিন্তু ৪৮ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল ভাষার আন্দোলন। তখন সেইসময়ে রাজশাহীতে একমাত্র কলেজ রাজশাহী কলেজ। এখন যে মুসলিম হোস্টেল নাম তখন ‘মুসলিম’ কথাটা ছিল না। পাকিস্তান হবার পর মুসলিম কথাটা এসেছে। হোস্টেলে থাকতো হিন্দুছেলেরা। একটাই শুধু ব্লক ছিল। সেসময় মুসলমান ছেলেরা পড়তে আসতো না।

রাজশাহীতে যারা ভাষা আন্দোলন করেছে তারা সবাই রাজশাহী কলেজে পড়তো। তখন আমাদের সঙ্গে যারা রাস্তায় আন্দোলনে হেঁটেছে তারা সবাই ভাষাসৈনিক। তাদের থেকে আমাদের আলাদা করে দেখার কোনো মানে হয় না। কারণ যারা রাস্তায় আমাদের সাথে হাঁটতো, আমাদের সাথে স্লোগান দিতো, তারা সবাই ভাষাসৈনিক ছিল। যার ফলে এখন রাজশাহী থেকে যে পাঁচজনকে ভাষাসৈনিকের নাম দেয়া হয়েছে এটা আমি মানতে পারছি না। কেউ শুধু আমাদের ভাষাসৈনিক বললে আমি খুব দুঃখ পাই। ভাষাসৈনিক মানে ভাষার জন্য যারা আন্দোলন করেছে তারা সবাই ভাষাকর্মী, তাই না।

মাহী ইলাহি : ১৯৫২ সালে আপনারা কতজন নিয়ে আন্দোলন করেছেন?
আবুল হোসেন : রাজশাহীর ভাষা আন্দোলন রাজনীতির বাইরে না। আওয়ামী লীগের সৃষ্টি হলো, প্রথমে আওয়ামী মুসলিম লীগ। অনেক পরে মুসলিম তুলে দিয়ে সেটা হলো আওয়ামী লীগ। কিন্তু অনেকেই মুসলিম আওয়ামী লীগে থেকে গেল।

সেসময় ছাত্রলীগ রাজশাহীতে ছিল না। একটাই ছাত্র সংগঠন ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র ইউনিয়ন অনেক পরে গঠিত হলেও রাজশাহীতে ছাত্রলীগকে খুঁজেই পাওয়া যেত না। রাজশাহী কলেজে ভর্তি হলাম ১৯৫১ সালে। রাজশাহী কলেজে পাকিস্তানের মতো নিয়ম করেছে ড. জহুরি। সবাইকে শেরওয়ানি পরতে হবে। শেরওয়ানি  না পরলে পার্শেন্টেজ পাওয়া যেত না। ওই শেরওয়ানি পরে আমি কলেজ যেতাম।
রাজশাহী কলেজে ভাষা আন্দোলন শুরু হলো। জড়িয়ে পড়লাম। ভাষার জন্য মিছিল হতো। বড়রা সামনে থাকতো আমি পেছনে থাকতাম। ওই সময় ভাষা আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। চলে এলো ২১শে ফেব্রুয়ারি। সেসময় সহজে কিন্তু নির্দেশ দেয়া যেত না। কালোও ব্যাজও ধারণ করা যেত না।

মাহী ইলাহি : কতসাল থেকে কালো ব্যাজ ধারণ করা যেত না?   
আবুল হোসেন : ৫৪ সালের নির্বাচনের পর দেখা গেল, কালো ব্যাজ ধারণ করা যাবে না। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিই কালো টুপি বানানোর। বর্তমানে আরডিএ মার্কেট তখন পুকুর ছিল। সেই পুকুরের আশেপাশে পুলিশ ভয়ে আসতো না। ওখানে দর্জি ডেকে আমরা কালো টুপি বানিয়ে পরলাম।

মাহী ইলাহি : ভাষা আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহী ছিল?
আবুল হোসেন : ভাষা আন্দোলন প্রথম ঢাকাতে শুরু হয়। কিন্তু মূল ধরা যায় রাজশাহীকে। যত আন্দোলন হতো সব ছিল রাজশাহী কলেজ কেন্দ্রীক। সারাদেশ থেকে রাজশাহী কলেজে পড়তে আসতো সবাই।

মাহী ইলাহি : বাংলাদেশের প্রথম শহিদ মিনার রাজশাহীতে কীভাবে নির্মিত হয়?
আবুল হোসেন : রাজশাহী কলেজে ডি ব্লক ছিল। সেই ব্লকের একটি রুমে থাকতেন গোলাম আরিফ টিপু। আমরা  প্রত্যেকদিন মাঠে খেলতাম আর সন্ধ্যায় তার কাছে গিয়ে বসতাম। ঢাকার কোনো খবর পাওয়ার সেসময় উপায় ছিল না। খবরের কাগজ আসতো ট্রেনে। রাজশাহীর ঘোড়ামারা এলাকা ছিল ব্যবসার অঞ্চল। ব্যবসা করতো মারওয়ারিরা। ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় গুলি করা হয়েছিল সেটা আমরা মারওয়ারিদের কাছ থেকে শুনেছিলাম। সে খবরটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। আলোচনা করতে গিয়ে মাথায় আসলো শহিদ মিনার তৈরি করার কথা। রাজশাহী কলেজের এ ব্লকের সামনে সিমেন্ট, বালু, ইট আর কাদা দিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারির রাতেই করা হয়েছিল।

মাহী ইলাহি : শহিদ মিনার তৈরির সময় কতজন উপস্থিত ছিলেন?
আবুল হোসেন : রাজশাহী কলেজের হোস্টেলের ৫০ থেকে ৬০ জনের মতো উপস্থিত ছিল। ১৪৪ ধারা জারির কারণে বাইরে থেকে কেউ আসতে পারেনি। কিন্তু শহিদ মিনারটি বেশিক্ষণ থাকেনি।

মাহী ইলাহি : রাতেই কি শহিদ মিনারটি ভেঙে দেওয়া হয়?
আবুল হোসেন : শহিদ মিনারটি রাতেই পুলিশের সহযোগিতায় মুসলিম লীগের গুণ্ডারা ভেঙেছিল।

মাহী ইলাহি : আপনারা যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভাষা আন্দোলন করেছিলেন তা কি সফল হয়েছে?
আবুল হোসেন : না মোটেও সফল হয়নি বরং আরো খারাপ হয়ে গেছে। আমরা যেখান থেকে বের হয়ে এসেছিলাম  আবার সেখানে ফিরে যাচ্ছি।

মাহী ইলাহি : সব পর্যায়ে বাংলা ভাষা চালু হয়নি কেন?
আবুল হোসেন : বাংলাদেশে একমুখী শিক্ষা না হয়ে বহুমুখী শিক্ষা চলে আসছে। সরকার জানেই না বাংলাদেশে কতগুলো ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল আছে। সরকার এও জানে না কতগুলো মাদরাসা আছে। সব শিক্ষা একসাথে হয় না। বাংলাদেশে একই রকম শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে হবে।

মাহী ইলাহি : নতুন প্রজন্মকে আপনার উপদেশ?
আবুল হোসেন : নতুন প্রজন্মের কাছে আমার একটা উপদেশ, বাংলা বা বাঙালি এখান থেকে সরে আসা যাবে না। বাঙালি হতে হলে অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক হতে হবে। ভাষার গুরুত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। বাঙালি, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশকে ভোলা যাবে না। যদি কেউ ভুলে যায় তার বাংলাদেশে থাকার অধিকার নেই। বাংলা ভাষাতে জানতে হলে মূল ইতিহাস জানতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

রাজশাহীতে তিন সাংবাদিকের নামে ছাত্রলীগ নেতাদের মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) ইয়াবা চক্রের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *