নভেম্বর ২২, ২০১৭ ১০:৪২ অপরাহ্ণ

Home / slide / সাগর-রুনি হত্যা : মামলার তদন্তে ব্যর্থ র‌্যাবও!

সাগর-রুনি হত্যা : মামলার তদন্তে ব্যর্থ র‌্যাবও!

সাহেব-বাজার ডেস্ক : সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পর র‌্যাবও ব্যর্থ হতে চলেছে। গত ৫ বছর ধরে আলোচিত এ ঘটনায় আদালতে অগ্রগতি তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। উল্টো ৪৬ বার সময় নিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। নতুন করে আগামী ২১ মার্চ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এমন পরিস্থিতিতে ডিবির পর র‌্যাব ব্যর্থ হওয়ায় নতুন করে সিআইডিকে দিয়ে মামলা তদন্তের দাবি তুলেছেন নিহত রুনির ভাই নওশের রোমান।

সাগর-রুনীর পরিবারের দাবি, গত ৫ বছরে আলোচিত সব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে আলোচিত এ জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়নি। দেশের সাংবাদিক নেতাদের প্রতিও ক্ষোভ রয়েছে এই পরিবারের। ঘটনার পর একযোগে আন্দোলনে নামলেও রহস্যজনক কারণে একটি পক্ষ মাঝপথে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে তদন্ত প্রক্রিয়ায় ঢিলেমিভাব জোরালো হয়েছে। সব সাংবাদিক এক থাকলে দ্রুতই এ মামলার রহস্যভেদ করা সম্ভব হতো।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাবের তদন্ত ও ফরেনসিক শাখার সহকারী পুলিশ সুপার মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, ডিএনএ টেস্টে ঘটনাস্থলে দুইজন অজ্ঞাত ব্যক্তির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ওই দুজনকে খুঁজে বের করতে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া সন্দেহভাজন ১৩০ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। এছাড়া এই মামলার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেসব আলামত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলোর রিপোর্টও হাতে এসেছে। এগুলোর আলোকে তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে চুরি হওয়া ল্যাপটপ বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা জানার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পত্রালাপ অব্যাহত আছে। হত্যার শিকার দম্পতি সাংবাদিক হওয়ায় এখনো তাদের অনেক সহকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। গ্রিলকাটা চোর ও ডাকাতের বিষয়েও নিবিড়ভাবে তদন্ত অব্যাহত আছে। তবে দ্রুতই এই মামলার অভিযোগপত্র বা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব কিনা সে বিষয়টি স্পষ্ট করেননি তদন্ত কর্মকর্তা মহিউদ্দীন আহমেদ।

জানা গেছে, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাড়িতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ। এ হত্যাকাণ্ডে দেশ-বিদেশে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে এসে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন পুলিশকে তদন্ত শেষ করার জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। সেই ৪৮ ঘণ্টা এখন পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি।

২০১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েই মহীউদ্দীন খান আলমগীর ১০ অক্টোবরের মধ্যে সাগর-রুনির হত্যারহস্য উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন। এরপর ৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে বাসার দারোয়ান এনামুলকে ধরতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরে এনামুলকে গ্রেফতার করলেও মামলার কোনো সুরাহা হয়নি।

সূত্র মতে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পরে প্রথমে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ ও পরে ডিবি এই মামলার তদন্তভার পায়। দায়িত্ব পাওয়ার ৬২ দিনের মাথায় (২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল) হাইকোর্টে ব্যর্থতা স্বীকার করে ডিবি। এরপর আদালত র‌্যাবকে মামলার তদন্তের নির্দেশ দেন। সেই থেকে র‌্যাব মামলাটি তদন্ত করছে। তদন্তভার পেয়েই ভিসেরা পরীক্ষার জন্য কবর থেকে সাগর-রুনির লাশ উত্তোলন কর হয়। র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানান, ভিসেরা পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাদের মৃত্যুর আগে কোনো প্রকার বিষাক্ত বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করানো হয়নি। আর ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ছুরিকাঘাতে রক্তক্ষরণ ও আঘাতের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

২০১৪ সালের আগস্টে আদালতে দেওয়া মামলার তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনে র‌্যাব জানায়, হত্যার স্থান থেকে জব্দ করা আলামতগুলোর মধ্য থেকে ছুরি, ছুরির বাঁট ও বঁটিতে খুনির আঙুলের ছাপ ও ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায় কি না, তার জানতে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়। এ ছাড়া সাগর ও রুনির পরনের কাপড়, যে কাপড় দিয়ে সাগরের হাত ও পা বাঁধা হয়েছিল, গ্রিলের অংশ, ঘটনাস্থলে পাওয়া চুল, ভাঙা গ্রিলের পাশে পাওয়া মোজা, দরজার লক, দরজার চেইন, ছিটকিনি রাসায়নিক ও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাগারে পাঠানো হয়।

মামলায় গ্রেফতার করা আটজনসহ, সন্দেহভাজন ও নিহত সাগর-রুনির নিকটাত্মীয়—এ রকম মোট ২১ জনের লালা নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজন, সাগর-রুনির স্বজন, সহকর্মীসহ মোট ১৫০ জনের জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। গ্রেফতার ৮জন হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, সাইদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনামুল, পলাশ রুদ্র পাল এবং নিহত দম্পতির বন্ধু তানভীর রহমান। তাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজনই ২০১৪ সালের আগস্টে মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র‌্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেফতার হন। প্রথম পাঁচজন ও নিরাপত্তারক্ষী এনামুল এখনো এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাবাস করছেন। কর্মকর্তারা জানান, এই আটজনের কারও বিরুদ্ধে সাগর-রুনি হত্যায় জড়িত থাকার ন্যূনতম প্রমাণও মেলেনি।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো আলামত পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলে মামলার রহস্য উদঘাটিত হবে বলে এর আগে র‌্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। এখন সেই সব প্রতিবেদন র‌্যাবের হাতে। কিন্তু সেখান থেকে পাওয়া দুজন অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ বহনকারী ব্যক্তি এখনো শনাক্ত হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত সাংবাদিক দম্পতির চুরি যাওয়া ল্যাপটপ উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত চলছে গ্রিলকাটা সন্দেহভাজন চোর ও ডাকাতের বিষয়েও। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত মোট আটজনের মধ্যে ছয়জন এখনো কারাগারে।

ডিবির তৎকালীন দুজন সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনারের (বর্তমান তারা এডিসি) সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তারা চারজনের একটি চোরের দলকে ধরেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মাহফুজ। মাহফুজকে নিয়ে ঘটনার ১০ দিন পর ওই এলাকায় যায় পুলিশ। মাহফুজ কর্মকর্তাদের দেখিয়ে দেন, কীভাবে ওই বাড়ির পাশে থাকা একটি মাঠে তারা চারজন একত্রিত হন। এরপর মাহফুজ পাইপ বেয়ে উঠে দেখিয়ে দেন কীভাবে রাতের বেলা পাইপ বেয়ে তিনি চারতলায় উঠেছিলেন। ওই চোরের দলের কথামতো গলিয়ে ফেলা কিছু সোনার টুকরাও উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু ওই বাসা থেকে চুরি যাওয়া ল্যাপটপগুলো উদ্ধার করা যায়নি।

সবকিছু উদ্ধার না করে মামলার প্রতিবেদন দিলে বিষয়টি মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না বলে মত দেন ডিবির ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। শেষ পর্যন্ত তারা মামলার তদন্ত থেকে পিছিয়ে যান।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

স্পিকার ও ভারতের হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ

সাহবে-বাজার ডেস্ক : জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এমপির সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *