সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৭ ২:০১ পূর্বাহ্ণ

Home / slide / জমাটবাঁধা ইউরিয়া, বিপাকে ডিলাররা

জমাটবাঁধা ইউরিয়া, বিপাকে ডিলাররা

মাহী ইলাহি : বোরো মৌসুম শুরুর আগে থেকেই গুদামজাত জমাট ইউরিয়া সরবরাহ হচ্ছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ডিলারদের মাঝে। কিন্তু নিয়ে জমাটবাঁধা এসব সার কৃষকদের মাঝে বিক্রি করতে না পেরে পড়েছেন বিপাকে ডিলাররা।

খোজঁ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ রসায়ন শিল্প সংস্থার (বিসিআইসি) রাজশাহী বাফার গুদামে মজুদ রয়েছে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিকটন জমাটবাঁধা ইউরিয়া সার। এগুলো রয়েছে গুদামেই। এছাড়া গুদামের বাইরেও রয়েছে আরো কয়েক হাজার মেট্রিকটন জমাট সার।

গত মঙ্গলবার এ অঞ্চলের ডিলারা এনিয়ে সভাও করেন। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কৃষি মন্ত্রনালয়ের দৃষ্টি আকর্ষনও করেছেন। সরবরাহের আগেই সারের গুণগত মান পরীক্ষারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এর আগে ২৩ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দফতরে সার মনিটরিং কমিটির সভায় এনিয়ে কথা ওঠে। ডিলারদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে রেজুলেশন করে তা মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়েছেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল হাসান। চিঠি পাঠানো হয়েছে বিসিআইসির রাজশাহী বাফার গুদামেও। তবে এখনো বন্ধ হয়নি জমাটবাঁধা সার বিতরণ।

রাজশাহী সার ডিলার এসোসিয়েশনের সচিব হাবিবুর রহমান জানান, গতবছর চীন থেকে আমদানি করা ইউরিয়া সারগুলো জমাট বেঁধেছে। জানুয়ারি থেকেই কমবেশি করে এ সার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে ডিলারদের। তবে ফেব্রুয়ারীর শুরু থেকেই বরাদ্দের ৪০ শতাংশ দেয়া হচ্ছে জমাটবাঁধা ইউরিয়া। বাকি ৩০ শতাংশ করে দেয়া হচ্ছে কাফকো ও বিসিআইসির বল ইউরিয়া।

ডিলাররা এসব সার নিয়ে গিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করতে পারছেননা। আগেও জমাটবাঁধা ইউরিয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছিলেন তারা। বছর শেষে সেগুলো কম দামে মাছ চাষিদের কাছে বিক্রি করে দেন।

কৃষকদের বরাত দিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ডিলার জানিয়েছেন, কৃষক জমাটবাঁধা সার নিতে চাচ্ছেনা। মজুদ পর্যাপ্ত থাকায় ভালো সার নিচ্ছেন তারা। এছাড়া জমাটবাঁধা সারের গুনগত মান নিয়েও সংশয় রয়েছে তাদের। কিন্তু বাধ্য হয়ে বরাদ্দ উত্তোলন করতে হচ্ছে তাদের।

অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের ডিলারদের জমাটবাঁধা সারের পরিবর্তে দেয়া হচ্ছে নতুন আমদানিকৃত সার। আর এনিয়ে বস্তায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা করে নিচ্ছেন রাজশাহী বাফার গুদামের ইনচার্জের নেতৃত্বে একটি চক্র। ডিলারদের অনেকেই এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার নিজামপুরের কৃষক রবিউল ইসলাম জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। জমিতে নামার আগেই কিনেছেন ইউরিয়া সার। প্রতিবস্তা কাফকো ইউরিয়া কিনেছেন ৭৮০ টাকায়। স্থানীয় ডিলার চীন থেকে আমদানি করা ইউরিয়া ৭২০ টাকায় দিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু জমাটবাধা থাকায় তিনি নেননি। তার মত অনেকেই বেশি দাম দিয়ে নতুন ইউরিয়া নিয়েছেন।

ওই উপজেলার গোপালপুরের কৃষক ইমদাদুল হকের ভাষ্য, ইউরিয়া ঝরঝরে অবস্থায় জমিতে প্রয়োগ করেন তারা। তবে জমাট অবস্থায় থাকলে প্রয়োগ করা যায়না। জমাট ভাঙতে গিয়ে ইউরিয়া গুড়া হয়ে যায়। তাদের ধারণা, এতে ভালো ফল পাওয়া যায়না। তবে ঝরঝরে ইউরিয়া না পেলেই কেবল জমাট ইউরিয়া নেন বলে জানান এই কৃষক।

এদিকে, বুধবার দুপুরে রাজশাহী বাফার গুদামে গিয়ে দেখা গেলো সার ওঠা-নামার কর্মজজ্ঞ। একাজে নিয়োজিত রয়েছেন বিশ জনের মত শ্রমিক। এদের কেউ কেউ গুদামের ভেতরে স্তুপ করা জমাটবাঁধা ইউরিয়া নিয়ে গিয়ে বাইরের ট্রাকে তুলছেন। আবার গুদামে নেয়ার আগেই কয়েকটি ট্রাকে তোলা হচ্ছে নতুন এসে পৌঁছানো সার।

গুদামের প্রবেশ পথের ডান দিকে স্তুপ করে রাখা কয়েকশ মেট্রিকটন জমাটবাঁধা ইউরিয়া। এগুলোর সবগুলোরই বস্তা ছেঁড়া-ফাটা। নতুন করে বস্তাবন্দি করে শিগগিরই তা সরবরাহের কথা ডিলারদের। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় এগুলো নষ্ট হয়েছে এমন অভিযোগ রয়েছে। এনিয়ে ছবি তুলতে গেলে বাধা দেন গুদাম ইনচার্জ আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বলেন, ছবি তোলার অনুমতি নেই। তবে এগুলো সারের গুনগত মান ঠিক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তার জানান, সর্বশেষ মাসছয়েক আগে এগুলোর পরীক্ষা হয়েছে। তাতেই প্রমানিত এগুলো এখনো ব্যবহার উপযোগী। তারা এগুলো বস্তাবন্দির প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এ মৌসুমেই নতুন বস্তায় এসব সার ডিলারদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হবে।

তিনি স্বীকার করেন চীন থেকে আমদানিকৃত গুদামজাত প্রায় ৫ হাজার টন সার জমাটবাঁধা। তবে দাবি করেন, পুরোটাই জমাটবাঁধা নয়। তা ব্যবহার উপযোগী করে ডিলারদের সরবরাহ করা হচ্ছে। আর্থিক সুবিধা নিয়ে জমাট সারের পরিবর্তে ভালো সার দেয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন গুদাম ইনচার্জ।

বিসিআইসি’র রাজশাহী বাফার গুদামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৮ হাজার  মেট্রিকটন ধারণ ক্ষমতার বিপরীতে মজুদ হচ্ছে প্রায় ১৪ হাজার মেট্রিকটন করে। গত জানুয়ারিতে বরাদ্দ এসেছে ১৪ হাজার মেট্রিকটন। এর পুরোটাই বিতরণ হয়েছে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৩৭ জন ডিলারের মাঝে। ফেব্রুয়ারীতে বরাদ্দ রয়েছে ১৪ হাজার ৭০০ মেট্রিকটন। ৮ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত গুদামে এসেছে ৩ হাজার ৪১৯ মেট্রিকটন। আর ডিলার পর্যায়ে বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার ৫৪২ মেট্রিকটন। নগরবাড়ি, বাঘাবাড়ি, খুলনা ও আমীনবাজার থেকে সার আসছে রাজশাহীর বাফার গুদামে। এখানে আসার আগেই বন্দরে পড়ে থাকছে অযত্নে।

এবছর কেবল রাজশাহীতেই বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪১২ হেক্টর। গত ৭ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ২৭ হাজার ৭১২ হেক্টর। এমাস জুড়েই চলবে বোর চারা রোপন। ধানের দাম পাওয়ায় এবছর লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বোরো আবাদ।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

চাঁপাইনবাবগঞ্জে উদ্ধার পুরাতাত্তিক জাতীয় যাদুঘরে হস্তান্তর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা হতে শিবগঞ্জ থানা পুলিশের উদ্ধারকৃত পুরাতাত্তিক শিলালিপি বাংলাদেশ জাতীয় …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *