Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • চার মাসেও শনাক্ত হয়নি লিপুর ঘাতকরা– বিস্তারিত....
  • মশার প্রকোপে অতিষ্ঠ রাবি শিক্ষার্থীরা– বিস্তারিত....
  • শিশু মেঘলা ও মালিহার হত্যাকান্ডের বিচারের দাবীতে মানবন্ধন– বিস্তারিত....
  • উপজেলা চেয়ারম্যানদের মূল্যায়নের অঙ্গীকার জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের– বিস্তারিত....
  • নাটোরে হয়রানীমূলক মামলা থেকে কলেজ ছাত্র জামিনে মুক্ত– বিস্তারিত....

গ্রাহক হয়রানির শীর্ষে সোনালী ব্যাংক

ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৭

সাহেব-বাজার ডেস্ক : অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা হাজেরা বেগম। ২০০৬ সাল থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের কুষ্টিয়া কোর্ট বিল্ডিং শাখা থেকে নিয়মিত পেনশনের টাকা উত্তোলন করে আসছিলেন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে ওই শাখা থেকে টাকা উত্তোলনের পর ভুলক্রমে পেনশনের টাকা উত্তোলন বইটি ফেলে আসেন। অসুস্থতার কারণে নভেম্বরে পেনশনের টাকা উত্তোলনের জন্য যেতে পারেননি সোনালী ব্যাংকে। ডিসেম্বরে টাকা উত্তোলনের সময় হলে তিনি বুঝতে পারেন, পেনশন উত্তোলন বইটি তিনি ব্যাংকে ফেলে এসেছেন।

বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শাখায় জানালে তারা বইটি পাওয়ার কথা অস্বীকার করে। পরবর্তীতে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পেনশন বই উত্তোলন করতে গিয়ে হাজেরা বেগম জানতে পারেন, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তার পেনশনের টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন। পরবর্তীতে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হয়। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সোনালী ব্যাংকের খণ্ডকালীন কর্মকর্তা সিরাজ উদ্দিনকে পরে চাকরিচ্যুত করা হয়।

১৯৯৫ সালে অগ্রণী ব্যাংকের বাগেরহাট যাত্রাপুর শাখা থেকে চিংড়ি চাষের জন্য ২ লাখ টাকা ঋণ নেন কৃষক কেরামত আলী। বিধ্বংসী সিডরের কারণে ভেসে যায় কেরামত আলীর চিংড়িঘের। ফলে ঋণখেলাপির তালিকায় নাম ওঠে এ কৃষকের। পরবর্তীতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা করে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে কেরামত আলীর কাছ থেকে আদায় করা হয় ৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। অথচ কৃষিঋণের ক্ষেত্রে আসল টাকার দ্বিগুণের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়ের সুযোগ নেই। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অতিরিক্ত ১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা অগ্রণী ব্যাংক আদায় করেছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার কেরামত আলীর কাছ থেকে।

হাজেরা বেগম বা কেরামত আলীই শুধু নন, দেশের ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন হাজার হাজার গ্রাহক। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেই গত পাঁচ বছরে ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ করেছেন ১৯ হাজার ৪৫০ জন গ্রাহক। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আর্থিক অনিয়ম ও হয়রানির শিকার হয়ে ৪ হাজার ৫৩০টি অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক।

গত অর্থবছর সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। এরপর বেশি অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, জনতা, ডাচ-বাংলা, বাংলাদেশ কৃষি, পূবালী, রূপালী ও ইস্টার্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণের বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ফজলে কবির প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন করেন। এ সময় গভর্নর বলেন, দেশের জনগণ ব্যাংকারদের বিশ্বাস করে ব্যাংকে টাকা রাখেন। বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাদের সেবা দিতে হবে। এ সেবা দিতে গিয়ে যে অভিযোগ ও অসন্তুষ্টি থাকে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। ব্যাংক হলো সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। ব্যাংকের মূল কাজ হলো আমানত গ্রহণ ও ঋণ বিতরণ। ভালো ব্যবহার ও সেবা দেয়ার জন্য ব্যাংকের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক ৪ হাজার ৫৩০টি অভিযোগ করেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮৪টি অভিযোগ ফোনে ও ২ হাজার ১৪৬টি অভিযোগ লিখিতভাবে করেন বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক। এসব অভিযোগ শতভাগ নিষ্পত্তি ও গত বছরের তুলনায় কমেছে বলে দাবি বাংলাদেশ ব্যাংকের। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩ হাজার ৯৩০টি, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ৪৭৬ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৪ হাজার ২৯৬টি অভিযোগ করেছিলেন গ্রাহক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে, যা মোট অভিযোগের ৫৮ দশমিক ৭০ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ২৮ দশমিক ২৮ ও বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ অভিযোগ এসেছে। বিশেষায়িত ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে ৪ দশমিক ৪৬, এনআরবি ব্যাংকের বিরুদ্ধে শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দখা যায়, গত অর্থবছরে পাওয়া অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫৬৩টি এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ব্যাংক। এ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মোট ৩৭৩টি অভিযোগ করেন গ্রাহক। তৃতীয় অবস্থানে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে ২৯১টি, ইসলামীর বিরুদ্ধে ২৬৮, জনতার বিরুদ্ধে ২৩১, ডাচ-বাংলার বিরুদ্ধে ২০৪, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১৮৪, পূবালীর বিরুদ্ধে ১৩২, রূপালীর বিরুদ্ধে ১৩১ ও ইস্টার্ন ব্যাংকের বিরুদ্ধে ১২৬টি।

গত অর্থবছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ১২টি, বেসরকারি ব্যাংকে ৭১ ও বিদেশী ব্যাংকে দুটি পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় সবচেয়ে বেশি ১৯ বার পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় চতুর্থ প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আটবার পরিদর্শন চালানো হয় ন্যাশনাল ব্যাংকে। এছাড়া অগ্রণী ব্যাংকে ছয়বার এবং ব্র্যাক, সাউথইস্ট ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকে চারবার করে পরিদর্শন চালায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস বিভাগ (এফআইসিএসডি)।

প্রতিবেদন দেখা যায়, গ্রাহকস্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১৯ হাজার ৪৫০টি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে প্রায় সবই নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এফআইসিএসডির ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে টেলিফোনে সাধারণ ব্যাংকিং-সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১১৬, ঋণ ও অগ্রিম-সংক্রান্ত ৩৫৮, কার্ড-সংক্রান্ত ১৪৭, রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত ১২৭, মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত ৫৮, ট্রেড বিল-সংক্রান্ত ৩১, ব্যাংক গ্যারান্টি-সংক্রান্ত চার ও বিবিধ অভিযোগ ছিল ৫৪৩টি। এছাড়া গত বছর লিখিতভাবে ২ হাজার ১৪৬টি অভিযোগ আসে। এর মধ্যে সাধারণ ব্যাংকিং-সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল ৪৪৬, ঋণ ও অগ্রিম-সংক্রান্ত ৩৮৪, বৈদেশিক বিল-সংক্রান্ত ২৯২, স্থানীয় বিল-সংক্রান্ত ২০৪, কার্ড-সংক্রান্ত ১৫৬, ব্যাংক গ্যারান্টি-সংক্রান্ত ১১০, রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত ৫৭, মোবাইল ব্যাংকিং-সংক্রান্ত ৫৬ ও বিবিধ অভিযোগ ৪৪১টি।

গতকালের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রতারণা ও হয়রানির শিকার তিনজন গ্রাহক বক্তব্য রাখেন। তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর বলেন, ব্যাংকের কাছ থেকে প্রতারণার শিকার হওয়া তিনজন গ্রাহক যেসব অভিযোগ করছেন, তা আশঙ্কার কথা। বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য এগুলো গুরুতর অভিযোগ। বর্তমান ব্যবস্থায় গ্রাহকের হয়রানি ও ঝামেলামুক্ত সেবা প্রদান ব্যাংকিং খাতের একটি অঙ্গীকার হওয়া উচিত। আর এ অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বদ্ধপরিকর।

অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মাদ রাজী হাসান বলেন, ব্যাংক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। আমাদের কাজ হলো গ্রাহককে সেবা প্রদান করা। কিছু মানুষের কাজের কারণে ব্যাংকিং খাত কালিমালিপ্ত হতে পারে। কোনো ব্যাংকের ওপর যদি জনগণের আস্থা কমে যায়, সে ব্যাংক টিকে থাকতে পারে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে আমানতের সুদহার কম। অন্যদিকে ঋণের সুদহার বেশি। এটি হলে প্রতিযোগী দেশের ব্যবসায়ীদের তুলনায় আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে যেতে পারেন।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান আনিস এ খান এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।