আগস্ট ১৭, ২০১৭ ৭:৩৭ অপরাহ্ণ
Home / slide / হাসান আজিজুল হকের গল্পে প্রকৃতি । চন্দন আনোয়ার
হাসান আজিজুল হকের গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ-প্রকৃতির বন্ধন একই সুতোয় গাঁথা মালার মতো। প্রায় ভয়ংকর রাক্ষসে একটা সময়ে যে কিশোর দেশান্তরিত হয়েছিলেন সেই কিশোরের লেখক হয়ে উঠার ইতিহাসের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই অখণ্ড বাংলার একটি সামগ্রিক ফোকাস।
হাসান আজিজুল হকের গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ-প্রকৃতির বন্ধন একই সুতোয় গাঁথা মালার মতো। প্রায় ভয়ংকর রাক্ষসে একটা সময়ে যে কিশোর দেশান্তরিত হয়েছিলেন সেই কিশোরের লেখক হয়ে উঠার ইতিহাসের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই অখণ্ড বাংলার একটি সামগ্রিক ফোকাস।

হাসান আজিজুল হকের গল্পে প্রকৃতি । চন্দন আনোয়ার

পাকিস্তান সময়ের বাংলা কথাসাহিত্যের যে নবযাত্রা ঘটেছিল, তার অন্যতম প্রাণপুরুষ হাসান আজিজুল হক। অবিভক্ত বাংলার রাঢ়বঙ্গের বর্ধমানের যবগ্রামে তাঁর জন্ম এবং গ্রামেই মানস গঠনের ষোল বছর অতিক্রম, দেশবিভাগের কারণে স্থানান্তরিত হয়ে বাস্তুভিটা ছেড়ে দক্ষিণবঙ্গের খুলনায় বসবাস, বি এল কলেজে তারুণ্যের দুরন্ত দিন কাটানো, অতঃপর উচ্চশিক্ষার্থে এবং চাকুরির সূত্রে উত্তরবঙ্গের রাজশাহী শহরে স্থায়ী আবাস-এই তিন বঙ্গের ভৌগোলিক অভিজ্ঞতাই হাসানের মানস গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। ছোটগল্পের যে প্রাণ, সামান্য কিছুতে অসামান্যের ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তোলা, তা তাঁর রক্তেই মিশে ছিল।  প্রচণ্ড জিজ্ঞাসু হাসানের দুরন্ত শৈশবের সময়টায় অবাধ বিচরণ ঘটে প্রকৃতির রাজ্যে। সব কিছুতেই যেন কিছু খুঁজে ফিরতেন। যে কারণে, বুনোফল মুখে দিতেও দ্বিধা করতেন না, কী তার স্বাদ জানতে। কোন কোন দিন হাসানের কেটেছে ধানের শিষ কুড়িয়ে, ধান কেটে নেবার পরেও ক্ষেতে পড়ে থাকা ধান কুড়িয়ে কুড়িয়ে, সে ধান দশ টাকায় বিক্রি করে জুতো কেনার মতো কাজ করে। সারাদিনমান সামান্য সামান্য কাজ করে অসামান্য আনন্দ পেতেন। অসাধারণ গুরুত্ব দিয়ে করতেন সামান্য কাজ। পোকা-মাকড় ধরা ও মারা, সাপ মারা, পাখির বাসা থেকে ডিম চুরি করা, ভূত-প্রেতের সঙ্গে দোস্তি, কালিবলির পূজায় জ্যান্ত কালির সাথে সাক্ষাৎ, মাদারের গান শোনা, লাঠি খেলা, কড়ি খেলা, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা, বন্ধুদের সাথে বাজি ধরা, গ্রাম্যযাত্রা দেখা, শিয়াল তাড়িয়ে বেড়ানো, প্যান্টের পকেটে লজেন্স, মুখে লজেন্স নিয়ে স্কুলে গমন ইত্যাদি গ্রামবাংলা চিরায়ত প্রকৃতি অন্বিষ্ট কাজ করে হাসানের বাল্যকাল কেটেছে। বিশেষ করে, গাছ থেকে গাছান্তরে হুনুমানের মতো ফল-ফলাদি অন্বেষণে এই বালকের ছিল অদম্য ইচ্ছা। হাসানের স্মৃতিচারণ: আমার কোনো ভয় নেই। আম গাছে চড়ি–কদবেল গাছ, হর্তুকি গাছ, বহেড়া গাছ, তেঁতুল গাছ, নিমগাছ, তালগাছ-কোন গাছই বাদ নেই। এদের ফল তো খেয়ে দেখতেই হবে! হর্তুকি চিবিয়ে পানি খেলে সরবত খাওয়া হয়। পাকা বহেড়া, পাকা নিম চুষতে মন্দ লাগে না। আর নুন মাখানো তেঁতুল নুন-জড়ানো পাকা আমের মতোই চমৎকার খেতে। এতোরকম খাদ্য চেখে দেখব না কেন? বনফুল, বঁইচি, কাঁচা আম, তালশাঁস, কাদাজাম, কাঁচা পেয়ারা এসবতো রীতিমত খাদ্য। (ফিরে যাই ফিরে আসি)

রাঢ়ের ষোল বছরের যাপিত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই স্মৃতির আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে পরিণত হাসানকে পৌঁছে দিয়েছে যশ-খ্যাতির হিমালয় উচ্চতায়। যে কারণে, রাঢ়বঙ্গের প্রকৃতি, মানুষ, মানুষের জীবনপ্রণালি হাসানের গল্পভুবনে একচেটিয়া আধিপত্য। প্রত্যক্ষ, বা পরোক্ষভাবে হাসান মানসে রাঢ়প্রকৃতি জেগে আছে আপন স্বাতন্ত্র্য ও ঔজ্জ্বল্য নিয়ে।

অখিল ক্ষুধা, অফুরান প্রাণচাঞ্চল্য, দুরন্তপনা নিয়ে প্রকৃতিতে মুক্ত বিহঙ্গের মতোই দাপুটে বেড়িয়েছেন বালক হাসান, তাকিয়েছেন বিস্ময় ও জিজ্ঞাসার চোখে। বিভূতিভূষণের অপুর মতোই এই বালকেরও ঘর-গৃহস্তি ছিল প্রকৃতির রাজ্যে, জীবনের প্রথম পাঠ ও সবচেয়ে বড় পাঠও নিয়েছেন প্রকৃতির উদার পাঠশালা থেকেই। আর যে কারণেই, বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’র অপুর স্বপ্নময় রহস্যজগতের মোহগ্রস্ত হাসান ওরকম করেই লিখতে শুরু করে দিয়েছিলেন ‘মাটি ও মানুষ’ নামে একটি উপন্যাস। প্রায় ষোল বছরের রাঢ়ের যবগ্রামের জীবন  হাসানের মানুষ গঠনের প্রস্তুতিকাল। বিপরীত দিকে, রাঢ়ের রুক্ষ, ধূসর, খটখটে প্রকৃতির বিবর্ণতাও হাসানের চোখে পড়ে ভয়ানক খেদ ও বাস্তবতা নিয়ে। বিশেষ করে, রাঢ়ের ভূ-প্রকৃতি বাংলার যে কোন অঞ্চলের তুলনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের। রসকষহীন, চারিদিকে টিলার মতো উঁচু উঁচু, জমির বড়ো বড়ো ফাটল দিয়ে পাতালরাজ্য দেখা যায়, তীব্র কটকটে রোদে গ্রীস্মে মরুভূমি, নদী নেই বলে বর্ষায় তীব্র স্রোত ইত্যাদি নিয়েই রাঢ়ের-ভূ-প্রকৃতি। আর এই বিরূপ ভূ-প্রকৃতির কারণেই অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বন্যা, খরা, দুর্যোগ-দুর্ভিক্ষ রাঢ়ের জনপদের অনিবার্য নিয়তি।

রাঢ়ের ষোল বছরের যাপিত জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই স্মৃতির আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে পরিণত হাসানকে পৌঁছে দিয়েছে যশ-খ্যাতির হিমালয় উচ্চতায়। যে কারণে, রাঢ়বঙ্গের প্রকৃতি, মানুষ, মানুষের জীবনপ্রণালি হাসানের গল্পভুবনে একচেটিয়া আধিপত্য। প্রত্যক্ষ, বা পরোক্ষভাবে হাসান মানসে রাঢ়প্রকৃতি জেগে আছে আপন স্বাতন্ত্র্য ও ঔজ্জ্বল্য নিয়ে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে এতটা প্রাণবন্ত  ও জীবন্ত হয়ে রাঢ় প্রকৃতি কোন গল্পকারের লেখায় আসেনি।

হাসান আজিজুল হকের জীবনে প্রকৃতির সহজাত সত্তাটি স্নিগ্ধ মধুরতা ও স্বপ্নময়তা নিয়ে ধরা দেয় যখন স্থানান্তরিত হয়ে দক্ষিণবাংলার খুলনায় আসেন। রাঢ়ের নির্মেদ, রুক্ষ, নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছেলে বিস্ময় বিমূঢ়ের মতো লক্ষ করেন নদী নালা খাল, বিল, পাহাড় ও গাছ লতাপাতা নিয়ে দক্ষিণবাংলা সবুজের দেশ, স্বপ্ন ও রূপকথার দেশ। এখানে তাঁর শিল্পীমন ও চোখের তৃষ্ণা মেটাবার অপার সুযোগ।

রাঢ়বঙ্গের বর্ধমানের যবগ্রামের সেই জিজ্ঞাসু বালক দক্ষিণবঙ্গের সবুজ প্রকৃতির পাঠ সমাপ্ত করে উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির রূপ-রস গ্রহণ করে পরিপুষ্ট ডালপালা বিস্তৃত বটবৃক্ষের মতো বাংলা ছোটগল্পে মহীরুহ হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের ছোটগল্পের পালাবদলের নায়ক হাসান আজিজুল হক। রাঢ়বঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ-উত্তরবঙ্গ এই তিন ভূখণ্ডের ত্রিমোহনায় দণ্ডায়মান অপরাজেয় লড়াকু ক্ষত্রিয় হাসান আজিজুল হকের সৃষ্ট চরিত্ররাও প্রায় এই তিন অঞ্চলের ব্রাত্যজন, সাধারণ মানুষ। আর এই জীবনকাব্যের শিরা-উপশিরায় নিরন্তর বহমান প্রকৃতির অমৃত ও গরল।

বিভূতিভূষণের মতো শিশুর সরল মন ও সবুজ চশমা চোখে নিয়ে হাসান প্রকৃতির দিকে তাকাননি, বরং তাকিয়েছেন মানিকের মতো নিরেট সাদা ও নিরাসক্ত চোখে বা চশমা খোলা চোখে। তাঁর গল্পের শরীরে প্রকৃতি আর মানুষ এক অভিন্ন সত্তা, অভিন্ন চরিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকে। তাই গল্পের কাহিনির পরিবেশ তৈরিতে স্বতন্ত্রভাবে প্রকৃতির বিস্তৃত ফিরিস্তিও চোখে পড়ে না। একটি শকুন, একটি উটপাখি বা একটি করবী গাছও অনায়াসেই হয়ে যেতে পারে ব্যক্তি বা সমষ্টির অস্তিত্বের ধারক। হাসান তাঁর প্রথম গল্প ‘শকুন’ গ্রামের পরিবেশ-প্রতিবেশ নিয়ে লিখেছেন, প্রকৃতি গল্পের অস্থি মজ্জায়। ‘শকুন’ প্রকৃতি রাজ্যে অশুভ এবং অকল্যাণের প্রতীক। হিংস্র ভয়ানক প্রকৃতির এই পাখিটির মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার বীভৎস দৃশ্য প্রাণিজগতে হিংস্রতার চরম নিদর্শন। শোষণে-নিষ্পেষণে–লুণ্ঠনে মানুষও প্রকৃতির এই প্রাণিটির মতোই শ্বাপদ। প্রেম-প্রীতি-মায়া-মমতা বিবর্জিত শকুনের মতো হিংস্রদের দখলে চলে যাচ্ছে সব। প্রচণ্ড সমাজমনস্ক এই কথক জীবনের প্রকৃত বাস্তবকে তুলে ধরতে গিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নয়, বরং বিপরীত পিঠের নিষ্ঠুরতাকে চালু ছবির মতো তুলে এনেছেন, কখনও ভয়ানক পরিহাস ও শ্লেষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন।

নদী-খাল-বিল-হাওড়ের এই জনপদের জনজীবনের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব বা পরিচালনা যাই বলি কেন সবই প্রকৃতির হাতে ন্যাস্ত। তাই, নদী-বিল শুকালে জনপদের জীবনেরও প্রাণশক্তি শুকিয়ে আসে। হাসানের গল্পে  নদী ও বিল-হাওড় এতটাই গুরুত্বের সাথে এসেছে কখনও সেসব চরিত্রের মতোই ভূমিকা পালন করে। তাঁর রাঢ়ের জীবনে বিল একটি বিরাট অবস্থান নিয়ে আছে, আর এদিকে আছে বরেন্দ্রভূমির বিস্তৃত- বিরান ধু ধু মাঠ। অন্যদিকে,  জালের মতো ছড়িয়ে থাকা দক্ষিণবঙ্গের নদ-নদীগুলো যেমন হাসানের শিল্পীমনের মানচিত্র, তেমনি পদ্মাবিধৌত রাজশাহীতে প্রাত্যহিক বসবাসের কারণেও নদী কখনই অনুপস্থিত থাকেনি তাঁর লেখায়। ঋতুবৈচিত্র্যের নিয়ম-রীতি আর আগের মতো নেই। প্রকৃতিতে উষ্ণতা বৃদ্ধির ছোবল লেগেছে গ্রামের নদী-নালা-খালে-বিলে। নদীতে জল নেই, খালে-বিলে জলের থইথই নেই, নৌকার মাঝিমাল্লার সেই জারিসারি গান আর জলের কলকল কলরব এই সময়ের মানুষের কাছে স্বপ্ন। ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ’-এই অভিধাটি ক্রমেই কার্যকারিতা হারাচ্ছে। সেই সাথে নদী-বিল  চলে যাচ্ছে পুঁজিপতিদের দখলে। নদী ভরাট হয়ে সৌরম্য অট্টালিকা উঠছে। করমালি, রহমালি, মনোহর, মন্তাজ, কালী, কৃষ্ণভামিনীর মতো কৃষকদের প্রতিনিয়তই দাঁড়াতে হচ্ছে শোষণ ও নির্যাতনের মুখোমুখি। ‘আমৃত্যু আজীবন’ গল্পের করমালির কাছে বিল তারই জীবনের মতো অচেনা, দুর্জ্ঞেয়  ও জমাট রহস্যের জায়গা। বিল তাকে স্বপ্ন দেখায়, বিলের মাটি, ঘাস, বাতাস সকলেরই সাথে করমালির যেমন আত্মিক ও মায়ার বন্ধন, তেমনি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের দীক্ষাও সে বিলের কাছে থেকেই পেয়েছে। তাই শোষণ ও নিপীড়নের প্রতীক সাপের লেজ কেটে নিয়ে করমালির বোধোদয় ঘটে শোষণের হাত থেকে ওদের মুক্তি নেই। তার ভাষায়  ‘কেউ মারিতে পারে না, ওরা মারা যায় না কোনদিন।’অবশেষে করমালিকেই হারতে হয়, করমালিরাই হারে, এবং সাপের মতো ছোবলকারী ভূমিদস্যু ও পুঁজিপতিরা চিরদিনই জিতে।

আগেই বলেছি, তারাশঙ্করের পরে বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাসের রাঢ়ের উত্তরাধিকার হিসেবে হাসান আজিজুল হকের নাম আসে। পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি, সামাজিক বৈষম্য, খাদ্য ও অর্থসংকট ইত্যাদি হাসানের অসংখ্য গল্পের বিষয়। আলাদা করে ‘রাঢ়বঙ্গের গল্প’নামে তাঁর একটি গল্পসংকলনও আছে। তবে রাঢ়বঙ্গের ভূ-প্রকৃতি, জনজীবনের সর্বাধিক বিশ্বস্ত রূপায়ণ ‘জীবন ঘষে আগুন’ নামক বিশালায়তনের গল্পে। প্রচণ্ড খরা ও এর ফলে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে মানবিক বিপর্যয় চরমে থাকে রাঢ়ে।

এখন কোনো গান নেই।

জ্যৈষ্ঠের আকাশে কোনো রকমের ছায়া নেই।

কোনো বৃক্ষও নেই।

লাঙল, গরু, জোয়াল, নারী, স্ত্রী-কন্যা-পুত্রের জন্যে কোনো মাটি নেই। (জীবন ঘষে আগুন)

হাসান আজিজুল হকের গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ-প্রকৃতির বন্ধন একই সুতোয় গাঁথা মালার মতো। প্রায় ভয়ংকর রাক্ষসে একটা সময়ে যে কিশোর দেশান্তরিত হয়েছিলেন সেই কিশোরের লেখক হয়ে উঠার ইতিহাসের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই অখণ্ড বাংলার একটি সামগ্রিক ফোকাস।

হাসান আজিজুল হকের কৈশোরের স্মৃতিজড়িত রাঢ়প্রকৃতির বাস্তবচিত্র ‘জীবন ঘষে আগুন’ গল্পে। পুরোহিত শাসিত বাবু শ্রেণির বিপরীতে তেঁতুল বাগ্দীর জীবনসংঘাতকে একই প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে সমাজ জীবনের কুৎসিত চেহারাটি নিরাভরণ করে দিলেন লেখক। দেশ-কাল-প্রকৃতি ও সমাজের প্রেক্ষাপটে প্রাচীন সংস্কারের ও পটভূমিতে গল্পটির বিষয়বস্তুকে বিবেচনায় না আনলে লেখকের মূল উদ্দেশ্যের সাথে মিলানো যাবে না। একদিকে নিষ্ঠুর প্রকৃতি, অন্যদিকে পুরোহিত ও কায়েমি স্বার্থবাদীর লাভ-লোভের ফাঁদ, দুইদিক থেকে শোষণের শিকার অন্ত্যজ মানুষেরা জীবনধর্মের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয় চিরকাল। আর তখন নিষ্ঠুর প্রকৃতির কাছে থেকেই দীক্ষা-শিক্ষা পেয়ে জমাট বরফের মতো দিনে দিনে অন্ত্যজের ভিতরে জমে ক্ষোভ আর রোষের ভয়ানক বারুদ। যোগ্য নেতৃত্ব পেলে এই বারুদ জ্বলে উঠতে পারে ভয়ানক লেলিহান হয়ে। সমাজ জীবনের এক গভীর উপলব্ধি থেকে লেখক জেনেছেন-এই বিরোধের মীমাংসা কোথায়? একটাই মীমাংসার পথ খোলা আছে- শোষণের  যূপকাষ্ঠ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়া। শোষকের বিষদাঁত সমূলে উৎপাটন করে শোষণলিপ্সু সমাজ কাঠামোকে নির্দয় আঘাতের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা। বাস্তববাদী কোন শিল্পী এই কাজ করে থাকেন কাপালিকের মতোই নিষ্ঠুর হয়ে, শিকড়সহ শোষণের বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটনে কলম চালান। হাসান আজিজুল হক তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থেকেছেন। মানুষের সমাজকে সত্যিকার অর্থে মানুষের করতে হলে এই ধরনের বিস্ফোরণমূলক বিপ্ল¬বের বিকল্প নেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অস্তিত্ব বাঁচাতে শোষিতেরা যখন মরণকামড় ধরে তখন শোষকের পরাজয় নিশ্চিত। চলমান সমাজবাস্তবতার সাথে সংগ্রামী শিল্পীপুরুষ এমন করে বিরোধে জড়িয়েছেন যে, গণ আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। অন্ত্যজ বাগ্দী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের মরণ লড়াইকে স্বীকৃতি দিয়ে লেখক এক ও একাত্মা হয়ে মিশে গেছেন।

ছোটগল্প মূলত গদ্যধর্মী হলেও কখনও কখনও কবিতাও ছোটগল্প হয়ে যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা জমি’ গুণে-মানে একটি সার্থক ছোটগল্প বলা যায়। আবার একরাত্রি, পোস্টমাস্টার ইত্যাদি অসংখ্য গল্পে সমৃদ্ধ কবিতার চরণ মিলে। বলা যায়, রোমান্টিক কবিতার সাথে ছোটগল্পের আত্মিক মিল অত্যন্ত নিবিড়। যে কারণে উনবিংশ শতকের রোমান্টিক কবিতার যুগেই ছোটগল্পের জন্ম এবং বিকাশকাল। হাসান আজিজুল হকের গল্প কখনও-সখনও কবিতার রোমান্টিক সত্তাকে ছুঁয়েছে। তবে কখনই রবীন্দ্রনাথ-বিভূতিভূষণের মতো করে নয়, বরং আধুনিকতম কবি জীবনানন্দের কবিতা অধিকভাবে সামনে আসে। এই বললে অতুক্তি হবে না যে, হাসানের প্রকৃতির  কাব্যিক বর্ণনা অনেকাংশেই জীবনানন্দ প্রভাবিত। বস্তত জীবনানন্দ দাশ সূর্যের মতো এমনি এক সম্মোহন নিয়ে উপস্থিত, আধুনিক কোনো কবি তো বটেই, আধুনিক গল্পকারও সেই সম্মোহনের ফাঁদে পা ফেলতে বাধ্য, ‘অন্তরের গহন গোপন রহস্য মহারহস্য আবিষ্কার করতে হলে মাঝে মাঝে বসতে হয় সমুদ্রের তীরে কিংবা খোলা আকাশের নিচে। আমাদের জীবনে জীবনানন্দ সেই সমুদ্রতীর, সেই অনবরুদ্ধ দীপ্ত আকাশ।’প্রচণ্ড বাস্তববাদী-জীবনবাদী গল্পকার হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রেও এই সত্যের অনুকৃতি ঘটেছে। কিশোর হাসান ছেলেবেলাতেই জীবনানন্দের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছেন প্রকৃতির ও মানুষের নিবিড় রহস্য অনুসন্ধানের। যে কারণেই, জীবনানন্দের কবিতায় বহুল ব্যবহৃত রৌদ্রের গন্ধ, হেমন্তের খোলা মাঠ, শীতের রাত, শিশির, ঘাস ইত্যাদি অসংখ্য শব্দ ঘুরেফিরে এসেছে তাঁর গল্পে। জীবনানন্দের কবিতার মতোই ইমপ্রেশনিস্ট ছবি হাসানের গল্পেও দুর্লভ নয়। এবং যেটি সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো তা হল, জীবনানন্দের মৃত বাংলার রূপের মতোই হাসানের নদী-খাল-বিল-হাওড় মৃত, সেখানে আর স্রোত নেই, প্রকৃতি রাজ্যে জেঁকে বসে আছে শীত, হেমন্তের খোলা মাঠে শূন্যতার হাহাকার।

হাসান আজিজুল হকের গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ-প্রকৃতির বন্ধন একই সুতোয় গাঁথা মালার মতো। প্রায় ভয়ংকর রাক্ষসে একটা সময়ে যে কিশোর দেশান্তরিত হয়েছিলেন সেই কিশোরের লেখক হয়ে উঠার ইতিহাসের মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই অখণ্ড বাংলার একটি সামগ্রিক ফোকাস। রাঢ়বঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ-উত্তরবঙ্গ এই তিনভূখণ্ডের বদলে যাওয়া প্রকৃতি, জীবনবীক্ষা সবই হাসানের গল্পে ফাইলবন্দি হয়েছে একটা স্থির প্রত্যয় নিয়ে, যা আঞ্চলিকতার দোষ থেকে আশ্চর্যরকমভাবে মুক্ত হয়ে শাশ্বতভাবে আধুনিক। হাসান তাঁর গল্পের জমিনে তাঁরই নিজের ভিতরের মানচিত্রের ভিতরের দ্বন্দ্ব, ভিতর বাইরের টান আর টানাপড়েনের চমৎকার একটি গ্রাফিকচিত্র এঁকেছেন। ফলে গল্পের জায়গা-জমি-মানুষ-প্রকৃতি হয়ে উঠেছে প্রাণময়, বৈপরিত্যের মধ্যে তাৎপর্যময়। প্রকৃতি চিরস্বাধীন, চিরচঞ্চল, চিরসজীব, চিরদ্রোহী। সুতরাং প্রকৃতি তন্বিষ্ট মানুষরাও হয় প্রাণবন্ত, কর্মচঞ্চল, দ্রোহে-বিদ্রোহে অপরিমেয় শক্তির প্রতিভূ। হাসানের গল্পে প্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্য ও রূপবৈচিত্র্য যেমন আছে, তেমনি আছে মানুষের উপর প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণ। আর যে কারণেই, তাঁর গল্পের অধিবাসীদেরও খুব বেশি সময় শোষণ-বঞ্চনার শেকলে বেঁধে রাখতে পারে না। হাসানের অধিকাংশ গল্পেই দেখতে পাব শ্রেণিবৈষম্যের-পীড়নের শিকার মানুষেরা একটি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে সমষ্টির শক্তি নিয়ে এগিয়ে গেছে। প্রকৃতি হাসানের কাছে ভয়ংকর-নিষ্ঠুর, কিন্তু সেই ভয়ংকর নিষ্ঠুরতাকেই মানুষের বেঁচে থাকার স্পৃহা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাই, তাঁর গল্পে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও কোমলতা সংগ্রামী জীবনের সামনে বিরাট আশীর্বাদস্বরূপ, যা জীবনকে সতেজ-সুন্দর-কর্মউদ্যোমী করে। তেমনি প্রকৃতির অগ্নিসত্তা বিপ্লব-বিদ্রোহের উন্মাদনা ও প্রেরণা জুগায়, সামগ্রিক অর্থে প্রকৃতি মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়, আশ্রয়-প্রশ্রয়-লালন করে। আর যে কারণেই, ছোটগল্পের লেখক হয়েও, রবীন্দ্রনাথ-বিভূতির পরের হলেও হাসান কোনোপ্রকার ভাবাবেগের জ্বরে আক্রান্ত না হয়ে চালু সময়ের নির্মেদ জীবনকে নির্মেদ প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে একটা ঐক্যসূত্র আবিষ্কার করেছেন। সুস্থ-সুন্দর, সুখ-শান্তির জীবনের জন্য মানুষকে প্রকৃতির অগ্নিমন্ত্রের দীক্ষা নিতেই হবে, মানুষকে যেতেই হবে প্রকৃতির মুক্তপাঠশালায়, তৈরি করে নিতে হবে ঐক্য-দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদে বিশ্বাসী হাসান আজিজুল হকের এই বিশ্বাস আজন্ম।

অলংকরণ : রাজিব রায়

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের সত্যায়িত কপি চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ

সাহেব-বাজার ডেস্ক : সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের সার্টিফাইড …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *