অক্টোবর ১৭, ২০১৭ ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ

Home / slide / সেলিম আল দীনের উত্থান-পর্ব । অনুপম হাসান
সেলিম আল দীনের উত্থান-পর্ব । অনুপম হাসান
সেলিম আল দীনের উত্থান-পর্ব । অনুপম হাসান

সেলিম আল দীনের উত্থান-পর্ব । অনুপম হাসান

সেলিম আল দীন (১৯৪৯-২০০৮) বাংলাদেশের নাট্যধারায় অভিনব আঙ্গিক সংযোজন করে স্বীয় স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দিয়েছেন। গবেষক-শিক্ষক ও নাট্যকার সেলিম আল দীন বড় বেশি অকালে মাত্র ৫৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা অপূরণীয়। তিনি ১৯৪৯ সালের ১৮ নভেম্বর ফেনী জেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম মফিজ উদ্দিন। সেলিম আল দীনের পিতৃ প্রদত্ত নাম মু. মঈন উদ্দিন আহমেদ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সেলিম আল দীন নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। অনেকেই হয়তো তাঁর পিতৃ প্রদত্ত নাম জানেন না। পিএইচডি গবেষণা করেছেন ‘মধ্যযুগের বাঙলা নাট্য’ বিষয়ে। তিনি কর্মজীবনে অধ্যাপনা পেশায় নিযুক্ত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নাটক ও নাট্যতত্ত্ব’ বিভাগে। পেশাগত কারণে সেলিম আল দীনের নাটকের সাথে গাঁটছড়া গড়ে ওঠে। তিনি গবেষণা করতে গিয়েই বাঙালি ও বঙ্গভূমির ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট হন। তাছাড়া শৈশব-কৈশোরের উপকূল অঞ্চল ঘেঁষা মানুষের জীবন-সংস্কৃতির সাথে তাঁর বেড়ে ওঠা জীবনাভিজ্ঞতাও ব্যতিক্রমী নাটক রচনায় উৎসাহিত করেছেন। তাঁর রচিত নাটক বাঙালি ও বঙ্গভূমির ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচায়ক। বাংলা জনপদের মানুষের জীবনাচরণের মধ্যে যে, নাটকীয় উপাদান আছে এবং নিত্যদিন প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনকথাই তাঁর নাটকের বিষয়বস্তু। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এলোমেলো জীবনাচারণ অবিকল উপস্থাপন করে সেলিম আল দীন বাংলা নাট্য-ঘরাণায় একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে নেন। তাঁর রচনাগুলো তিনি নিজে অবশ্য বিশেষ কোনো সাহিত্য শাখার অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষপাতী নন। তিনি পাঠকের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন, তাঁর রচনা সাহিত্যের কোন শাখার অন্তর্ভুক্ত হবে, তা নির্ধারণ করার জন্য। ‘বনপাংশুল’-এর ভূমিকায় তিনি রচনাটিকে উপাখ্যান, নাটক, গাথাকাব্য যেকোনো নামেই পাঠকের গ্রহণের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেছেন। সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটক সম্পর্কে এক মন্তব্যে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক উল্লেখ করেন : ‘সেলিম আল দীন এই কথানাট্যের রচয়িতা, বাংলা নাটকের এক প্রধান পুরুষ; সেলিম অনবরত সন্ধান করে চলেন প্রকাশের নতুনতর মার্গ; নতুন,কিন্তু বাংলা ভাষার সৃষ্টি এবং হাজার বছরের ধারাবাহিকতার অন্তর্গত অবশ্যই।’

নাটকে একদিকে আছে মহাকাব্যিক বিন্যাস, অন্যদিকে বাঙালির নিজস্ব গল্পগাথা। বিশেষত এসব নাটকের উপস্থাপনা কৌশলেও নাট্যকার বাঙালি জীবনের বিশ্বাসচেতনাকে লালন করেছেন সযত্নে। সেলিম আল দীন-ই সম্ভবত প্রথম বাঙালি নাট্যকার, যিনি বাঙালির স্বীয় পরিবেশ প্রেক্ষাপট থেকে নাট্যোপাদান সংগ্রহ করে নাট্য-নির্মাণ করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর নাট্যাঙ্গনে সেলিম আল দীন অসমান্য কৃতিত্বের দাবিদার। তাঁকে বাংলাদেশের নাটকের অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও অত্যুক্তি হয় না। সমকালীন সাহিত্যে বিশেষত নাটকে তাঁর পাণ্ডিত্য, জীবনবোধের গভীরতায়, আঙ্গিক সচেতনতা, নাট্য-নিরীক্ষা ঈর্ষণীয়। সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের শেকড় সন্ধান করেছেন, বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির ভেতর। তিনি খুঁজে পেয়েছেন বাঙালির স্বীয় নাট্যকৌশল। নাট্যশিল্পী সেলিম আল দীনের নাটকে সম্বন্ধে সমালোচক মন্তব্য করেছেন :
‘অধরা শিল্পের নিত্য পূজায় ধ্যানমগ্ন শিল্পীর চৈতন্যে অনুক্ষণ এক সুর খেলে। অস্তিত্বের বীণা তারে -বাণীর দেবী ঝংকার তোলেন নবরূপে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। মূর্ত-বিমূর্তের জগতে তাঁর সার্বক্ষণিক বিচরণ ভূমি। শিল্পের সৃজন-কর্ম সেজন্যেই সাধন সত্য। প্রকৃত শিল্পী তাঁর নন্দনবিশ্বে মগ্নচিত্ত সাধক। সেলিম আল দীন সাধক শিল্পী-শিল্পের ব্রতচারী। একনিষ্ঠ সাধকের প্রাত্যহিক কৃত্যের অপরিহার্যতার তুল্য তাঁর শিল্প সৃজন কৃত্য।’
সেলিম আল দীন নাটক রচনার শুরু থেকেই পাশ্চত্য আঙ্গিক ত্যাগ করতে চেয়েছেন। তবে প্রথম দিকে তাঁর রচনায় পাশ্চাত্যের ছাপ অধিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে তিনি বাঙালির নিজস্ব গল্পগাথা এবং যাপিত জীবনের নাটকীয়তা খুঁজে পান। যা তিনি ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হরগজ’, ‘হাতহদাই’, ‘চাকা’, ‘যৈবতীকন্যার মন’ প্রভৃতি নাটকে তুলে ধরেছেন। সেলিম আল দীনের নাটক রচনায় এই আঙ্গিক সচেতনতা সম্পর্কে সমালোচক মন্তব্য করেন :
‘এ যাবৎ কাল ধরে আমরা যে ইউরোপীয় একক নন্দন ভাবনার আওতায় ছিলাম, তিনি তার মধ্যে নিজেকে বিলীন করেননি, তিনি বাঙালির সাংস্কৃতিক বিশিষ্টতা ও যৌথ অবচেতনার জগৎকে বিনির্মাণ করে চলেছেন তাঁর কাজে, তাঁর পাঠকৃতিতে। এবং এই সূত্রে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে শুধু পুনঃনির্মাণই করছেন না, তাকে উন্নীতও করেছেন। তাঁর কাজে যে স্ট্রাকচারাল এপিকের লক্ষণ দৃষ্ট হয়, তা তাঁকে আজ ভিন্ন বাচনে তুলে ধরতে বাধ্য করে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সেলিম আল দীনের নাটকে বঙ্গভূমি এবং বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির পুনর্বিন্যাস যেমন তিনি করেছেন, তেমনি তিনি এ জনপদের ভূমি-সংলগ্ন মানুষের জীবনবৃত্তান্ত নাট্যকাহিনীতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচিত নাটকের কাহিনী মহাকাব্যিক বিশালতা হোমারের ইলিয়াড-ওডেসির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বাঙালি জাতিকে তার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি প্রাচ্যের সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন বাঙালির নিজস্ব জীবনের গাথাই নাটকের নবতর নির্মাণে সহায়ক হতে পারে। তিনি তাঁর বিশ্বাসকে শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। সেলিম আল দীন দেশীয় ঐতিহ্যের শেকড়ের সন্ধানে আগ্রহী ছিলেন। ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর সাথে নাট্যকার সেলিম আল দীনের যে সেতু বন্ধন, সেখানে খুঁজে পাওয়া শেকড়সন্ধানী শিল্পচেতনা। ‘ঢাকা থিয়েটার’-এর মটো হচ্ছে : ‘বাংলাদেশ একটি সংগ্রাম ক্ষুব্ধ অকুতোভয় জনপদের নাম। যুদ্ধ ঝড় জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে এই জনপদ সমুন্নত জীবনের আকাক্সক্ষাকে প্রজ্জ্বলিত করেছে তার সামুদ্রিক দুই চোখে। এই দেশ, তার ইতিহাস, সংগ্রাম, সংস্কৃতি, সবকিছুকে আমরা সম্মান করি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, আত্রাই, ধরলার কূলে কূলে নামহীন গোত্রহীন মানুষের সংগ্রামী জীবন আমাদের নাটকের বিষয়বস্তু।’
‘ঢাকা থিয়েটার’-এর স্লোগান এবং সেলিম আল দীনের রচিত নাটকের বিষয়-প্রেক্ষাপট সমার্থক। তিনি হরগজ নাটকে আঁকেন ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত এক জনপদের লণ্ডভণ্ড চিত্র। ‘কিত্তনখোলা’য় বহমান বেদে জীবনের অসাধারণ এক গল্প নির্মাণ করেন। ‘কেরামতমঙ্গল’-এ দেখান গ্রামের সহজ-সরল মানুষের নানামুখী সংকট এবং উত্তরণের প্রয়াস। ‘চাকা’য় এক বেওয়ারিশ লাশের শেষকৃত্য রচনা করেছেন।
নাট্যকার সেলিম আল দীনের চেতনার ভুবন আবহমান বাংলা জনপদের সংস্কৃতি। সম্ভবত এ কারণেই কোনো না-কোনোভাবে তাঁর নাটকে বাংলার পশ্চাদপদ, অন্ত্যজ মানুষের জীবনচিত্র উঠে এসেছে। সেলিম আল দীন প্রথম পর্বের নাটকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমস্যা উপস্থাপনে সোচ্চার থেকেছেন। ‘জণ্ডিস ও বিবিধ বেলুন’-এ ফকিরের কান্না, বেকারের চিৎকার, ক্ষুধার্তের মিছিল প্রকৃতার্থে স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থিন বৈষম্যের চিত্র। সর্প বিষয়ক গল্প নাটকে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং অস্থিরতার যে চিত্র নাট্যকার তুলে ধরেছেন, সেই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিয়েও সংশয়-অনিশ্চয়তা জেগেছে। ‘এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা’য় নাট্যকার সেলিম সমকালীন ব্যবসায়ী মহলের নৈতিক অধঃপতনের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে কালোবাজারী, খাদ্যে ভেজাল, সন্ত্রাসবাদের উত্থান প্রসঙ্গ প্রভৃতি ঘটনা সেলিম আল দীনের রাজনৈতিক-সামাজিক সচেতনতার পরিচায়ক। ‘সঙ্বাদ কার্টুন’-এ স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ জুড়ে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সংঘাত-সংঘর্ষ সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকা অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তির অন্তর্কলহ, ব্যক্তিবাদের চরম অবস্থান প্রভৃতি বিষয় নাট্যকার শিল্পিত দক্ষতায় ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও শ্লেষের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। সেলিম আল দীনের প্রথম পর্বের ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’-তে উইট-হিউমার-শ্লেষের উপস্থাপনা কৌশলন তীর্ষক। এ নাটকটিকে ‘সঙ্বাদ কার্টুন’-এর নবরূপায়ন হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। নাটকের নায়ক খাদক মুনতাসিরের অন্তহীন ক্ষুধা এবং নির্বিচারে খাদ্য গ্রহণ ইত্যাদি জাদু-বাস্তবতার সংশ্লেষ ঘটিয়েছিলেন নাট্যকার। মুনতাসিরকে যখন অপারেশন করা হয়, তখন তার পেট থেকে বেরিয়ে আসে দড়ি, বেলুন, ব্রেসিয়ার, কাগজ, শাড়ি, অয়েলপেইন্ট, ক্লিপ প্রভৃতি। মুনতাসির প্রতীকী চরিত্র। এ চরিত্রের মাধ্যমে নাট্যকার মূলত বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কতিপয় মানুষ রাষ্ট্রক্ষমায় আসীন হয়েছিল, যাদের অনন্ত ক্ষুধায় রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল হয়েছে। প্রতীকী-প্রতিকল্পে সেলিম আল দীন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন সেসব ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন এঁকেছেন।
প্রথম পর্বের নাটকে সেলিম আল দীন মূলত পাশ্চাত্য নাটকের মঞ্চায়ন কৌশল থেকে বাঙালি সংস্কৃতির নাট্যবীজ সংগ্রহ করেছেন। তবে তিনি ‘করিম বাওয়ালির শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা’ নাটক থেকেই বাঁক পরিবর্তন করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয় পর্বে সম্পূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতির উদ্বোধন ঘটিয়েছেন মঞ্চে। দ্বিতীয় পর্বে ‘কিত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই ’ প্রভৃতি নাটকে বাংলা জনপদের শেকড় সন্ধানে ব্রতী হয়েছিলেন। এরপর সেলিম আল দীন আর পেছনে ফিরে যান নি। তিনি রচনা করেছেন, ‘চাকা’, ‘যৈবতীকন্যার মন’, ‘হরগজ’, ‘বনপাংশুল’, ‘প্রাচ্য’। এসব নাটকে একদিকে আছে মহাকাব্যিক বিন্যাস, অন্যদিকে বাঙালির নিজস্ব গল্পগাথা। বিশেষত এসব নাটকের উপস্থাপনা কৌশলেও নাট্যকার বাঙালি জীবনের বিশ্বাসচেতনাকে লালন করেছেন সযত্নে। সেলিম আল দীন-ই সম্ভবত প্রথম বাঙালি নাট্যকার, যিনি বাঙালির স্বীয় পরিবেশ প্রেক্ষাপট থেকে নাট্যোপাদান সংগ্রহ করে নাট্য-নির্মাণ করেছেন।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন!

নিজস্ব প্রতিবেদক : হঠাৎ করে গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে রাজশাহী জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের আয়োজন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *