Ad Space

তাৎক্ষণিক

মৃত্যু ও পুনর্জন্ম : বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন । নূহ-উল-আলম লেনিন

জানুয়ারি ১০, ২০১৭

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ ঘটলেও প্রকৃত বিজয় কিন্তু অসম্পূর্ণই থেকে যায়। সত্য বটে আমরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালন করি। কিন্তু বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তার প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কার্যত শেষ হয়নি এবং স্বাধীনতাও পূর্ণতা অর্জন করেনি। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। আর সেদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা পূর্ণ হলো বলে মনে করতে থাকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ ১৬ ডিসেম্বর ঘটলেও তাদের প্রকৃত পরাজয় এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সমাপ্তি ঘটে ১০ জানুয়ারি। এ বিবেচনায় ১০ জানুয়ারি হতে পারত মুক্তিযুদ্ধের বিজয় দিবস। তেমনি ৭ মার্চ হতে পারত আমাদের স্বাধীনতা দিবস। ইতিহাসের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে বলা যায়, প্রকৃতপক্ষে ৭ মার্চের ভাষণেই তো বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ‘আনুষ্ঠানিকতার’ কাছে যেন একটু বাড়াবাড়িভাবেই দায়বদ্ধ।
স্বাধীনতার এতদিন পর এ বিষয়ে বিতর্ক উত্থাপন অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। আমি কিন্তু বিতর্কের জন্য নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট করার জন্য প্রসঙ্গটির অবতারণা করলাম। ধরা যাক, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি বঙ্গবন্ধুকে বিচারের নামে হত্যা করত তাহলে সেদিন কী পরিস্থিতি হতো? আমরা কি তখন আমাদের বিজয়ী মনে করতাম? অথবা বঙ্গবন্ধুকে আটকে রেখে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা (ভুট্টোসহ) যুদ্ধবন্দি পাকিস্তানি ৯৫ হাজার সেনাসদস্যের মুক্তির শর্ত জুড়ে দিয়ে বার্গেনিং করত? তাহলে কী হতো আমাদের মনোভাব? অসম্ভব ছিল না তৎকালীন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মানুষ হয়তো বঙ্গবন্ধুকে অক্ষত-জীবিত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার জন্য ভারত সরকারের ওপরই চাপ সৃষ্টি করত পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সিমলা চুক্তির জন্য অপেক্ষা করতে চাইত না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিন-চতুর্থাংশ আসনে আওয়ামী লীগ-মহাজোট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রেরণায়ই বিজয় লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর অজেয় আদর্শ যেমন পুনর্জন্ম লাভ করেছে তেমনি তা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রবর্তন ও বাস্তবায়িত করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কর্তব্য সম্পূর্ণ করা এবং স্বাধীনতাকে পূর্ণতর করার পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার।

অন্য একটি সম্ভাবনার কথাও ভাবা যেতে পারে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যদি আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ বা ভারতের সঙ্গে টোটাল ওয়ারে জড়িত হওয়ার আগেই অর্থাৎ ১৯৭১-এর মার্চ-এপ্রিলেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করত? কী রূপ নিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ! কী পরিণতিই-বা অর্জন করত?
বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির ঐক্য ও বিজয়ী হওয়ার প্রত্যয়ের কথা ভাবা যায়?
কোনো দ্ব্যর্থবোধকতা না রেখেই বলা যায়, ’বঙ্গবন্ধুহীন’ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কথা অন্তত ১৯৭১-৭২-এ কল্পনা করা যায় না। ইতিহাস তো এটাই যে, পুরো মুক্তিযুদ্ধটাই হয়েছে ওই এক ব্যক্তির নামে, তার প্রেরণায় এবং ’ত্রাতা’ হিসেবে তার বিভূতি গড়ে তোলে। ইতিহাসের নির্মাতা জনগণ এটা সাধারণ সত্য। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ইতিহাসের নির্দিষ্ট বাঁকে বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির ভূমিকাও হয়ে উঠতে পারে নিয়ামক। যেমন আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে জর্জ ওয়াশিংটন ও জেফারসন, রুশ বিপ্লবে ভলাদিমির ইলিচ লেনিন, চীনা বিপ্লবে মাও সেতুং, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মহাত্মা গান্ধী বা দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী দুঃশাসনের অবসানে নেলসন ম্যান্ডেলা। তেমনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নিয়ামক ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা।
১৯৭১-এ পাকিস্তানি সামরিক জান্তা প্রথমেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলে বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্রোধের আগুন যেমন জ্বলতে পারত, তেমনি একটা অকলনীয় ‘মেন্টাল ব্রেকডাউন’ বা পরাজিতের মনস্তত্ত্ব সৃষ্টি হতো। হয়তো বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুজনিত শূন্যতা আমাদের জাতীয় ঐক্যকে বিনষ্ট করত, জনগণকে যুদ্ধের জন্য উদ্দীপ্ত করা দুরূহ হতো এবং খন্দকার মোশতাক ও তার প্রভু মার্কিনিদের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা অসম্ভব হয়ে পড়ত।
পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হিসাবে ভুল ছিল। আসলে এটাই ইতিহাসের নিয়তি। ইতিহাসই যেন তাদের দিয়ে ভুল করিয়েছিল। আমার কথা নয়, পরাভূত পাকিস্তানি সামরিক জান্তার প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া ১৯৭১-এর ১৯ ডিসেম্বর ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। ভুট্টো বিদেশে (যুক্তরাষ্ট্রে) থাকায় ক্ষমতা হস্তান্তর কয়েকদিন বিলম্বিত হয়। তার আগেই ইয়াহিয়া তথাকথিত রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে লটকানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সামরিক আদালতের সেই রায় বঙ্গবন্ধু ধীর শান্ত মনে গ্রহণ করে নিজেকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতও করেছিলেন। রায় ঘোষিত হওয়ার দিবাগত রাতেই বঙ্গবন্ধুকে হেলিকপ্টারে লায়ালপুর জেল থেকে মিয়ানওয়ালি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।
কিন্তু যুদ্ধে অনিবার্য পরাজয়ের পরিস্থিতিতে বেসামাল ও বিপর্যস্ত ইয়াহিয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা বিলম্ব করায় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি তার প্রতিকুল হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রত্যাগত জুলফিকার আলি ভুট্টোর কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে জেনারেল ইয়াহিয়া ভুট্টোকে তার একটি ভুল সংশোধন ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ চান। ইয়াহিয়া বলেন, ‘ভুট্টো পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের প্রত্যর্পণের কথা ভেবে ইয়াহিয়ার ওই প্রস্তাবে রাজি হননি। তথ্যসূত্র : ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতির কথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, They (অর্থাৎ ইয়াহিয়ার বাহিনী). চারপর তিনি বলেছিলেন, রাত ৩টার দিকে মিয়ানওয়ালি কারাগারের জেলার বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে সরিয়ে তার নিজের বাংলোয় নিয়ে যায়, সেখানে আমাকে দু’দিন রাখে এবং পরে সেখান থেকে দূরে একটা নির্জন জায়গায় আরও ৫-৬ দিন বেসামরিক প্রহরায় লুকিয়ে রাখে। বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল, এটা ওই জেলারের বদান্যতা। কিন্তু এর আসল কারণ ছিল পাক-ভারত যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত অস্বাভাবিক পরিস্থিতি এবং সামরিক জান্তার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। কেননা তারপরই তিনি ডেভিড ফ্রস্টকে বলেছেন, ৬ দিন পর তাকে আবার মিয়ানওয়ালি জেলের সেলে ফেরত আনা হয়। সে সময় ৮ জন ভারতীয় যুদ্ধবন্দিকে দিয়ে জেলের সামনে গর্ত খোঁড়া হয়। ওই গর্তে যে তাকে হত্যার পর কবরস্থ করা হবে এটা অনুমান করে বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর প্রস্তুতি নেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে বলে, ভারতীয় বিমান হামলা থেকে আত্মরক্ষার জন্য ট্রেঞ্চ খোঁড়া হয়েছে।
ভুট্টো ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে তাকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ এবং তার (বঙ্গবন্ধুর) পছন্দমতো মন্ত্রিসভা গঠনের অনুরোধ জানান। ভুট্টো এ প্রস্তাব দিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর কথায় সাড়া না দিলে কাতর অনুনয়ের স্বরে উর্দুতে বলেন, ’খোদা কি লিয়ে, পাকিস্তান কো কিসি তারে বাঁচাও’ অর্থাৎ ’আললাহরওয়াস্তে যেভাবেই হোক পাকিস্তানকে বাঁচাও।’
বঙ্গবন্ধু ভুট্টোর প্রস্তাবের জবাব দিয়েছিলেন ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে। মাতৃভূমিতে ফিরে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্সে জনতার মহাসমুদ্রে এসেই পাকিস্তান সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব, ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা এক লহমায় বুঝতে পেরেছিলেন। রেসকোর্সের ভাষণে ‘পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বাঁধন সামান্য হলেও রাখা যায় কি-না’ ভুট্টোর এ অনুরোধ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘…আজ আমি বলতে চাই ভুট্টো সাহেব, আপনারা সুখে থাকুন, আপনাদের সঙ্গে আর না। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সেই স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য মুজিব সর্বপ্রথম তার প্রাণ দেবে। বাঙালি আর স্বাধীনতা হারাতে পারে না।’
বঙ্গবন্ধু প্রকৃতই বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তার প্রাণ দিয়েছেন। ১৯৭১-এর ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বঙ্গবন্ধুকে যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল, প্রকারান্তরে সেই মৃত্যুদণ্ডই তাদের সহযোগীরা কার্যকর করে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে যেমন শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী চক্র হত্যা করতে পারেনি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর সর্বব্যাপী প্রভাবকে এতটুকু ম্লান করতে পারেনি। বস্তুত বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হলেও তার আদর্শকে হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বরং সে আদর্শ আরও শক্তিশালী হয়ে পুনর্জাগরিত হয়েছে এবং তার আলোকচ্ছটায় বঙ্গবন্ধুও পুনর্জন্ম লাভ করেছেন। বরং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় এবং সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বেআইনি করে ঘোষিত হাইকোর্টের রায় ইতিহাসের অমোঘ নিয়তি হিসেবে পাকিস্তানপন্থি খুনিচক্র এবং পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের কবর রচনা করেছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিন-চতুর্থাংশ আসনে আওয়ামী লীগ-মহাজোট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রেরণায়ই বিজয় লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধুর অজেয় আদর্শ যেমন পুনর্জন্ম লাভ করেছে তেমনি তা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনঃপ্রবর্তন ও বাস্তবায়িত করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অসম্পূর্ণ কর্তব্য সম্পূর্ণ করা এবং স্বাধীনতাকে পূর্ণতর করার পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার।

নূহ-উল-আলম লেনিন : রাজনীতিক।