Ad Space

তাৎক্ষণিক

চন্দন আনোয়ারের গল্প । রাত পোহালে অন্ধকার

জানুয়ারি ১০, ২০১৭

ছেলেমেয়ে দুটির খুনসুটিতে বিরক্ত হয়ে অথবা রান্নাঘর থেকে আসা শুকনো মরিচ ভাঁজার তীব্র ঝাঁঝাল গন্ধে টিকতে না পেরে অথবা হতে পারে প্রতিদিনের অভ্যাস মতো গলির মুখের প্রকাশ মুদির দোকানে সিগারেট কেনার জন্য মানুষটা ঘর থেকে বেরিয়েছিল লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে। বেরিয়ে যাবার সময় সে বলেছিল, আমি আসছি।
চাবিসহ তালা ঝুলছে গেটে। খাবার সব ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। ছেলেমেয়ে দুটির ঘুমানোর সময় হল, মানুষটার কাণ্ডজ্ঞান দেখ! বাইরেই রাত পার করে দেবে নাকি? মোবাইলটাও হাতে করে নিল না। এর মধ্যে কয়েকটা কল এসেছে। তারিন সাধারণত মানুষটার মোবাইল ধরে না। বিচিত্র নাম্বার থেকে সবসময় কল আসে। কলেজের প্রিন্সিপাল, ডিপার্টম্যান্টের চেয়ারম্যান সারাদিনই কল করে। ছাত্র-ছাত্রীরাও যেন বন্ধু পেয়েছে। এক মিনিটও অবসর দেখতে পারে না। খুব ঠেকায় না পড়লে তারিন প্রকাশ মুদির দোকানে যায় না। রাত ১০টা বেজে গেল। এখনো বাইরে কি করছে? ছেলেমেয়ে দুটি আর কতক্ষণ জেগে থাকবে। বাবা ছাড়া খাবেও না। অসহ্য বিরক্তি, অস্থিরতা ও ক্রোধ নিয়ে গেট-ঘর করে তারিন। রাত ১১টা বেজে গেলে ছেলেমেয়ে দুটি ঘুমিয়ে পড়ে না খেয়েই।
মানুষটা সন্ধ্যায় হাঁটতে বের হয় এক সহকর্মীর সাথে। আজ তো লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে বেরিয়েছে। দূরে কোথাও তো যাবার কথা না। প্রকাশ মুদির দোকানেই বোধ হয় গল্পে মজে গেছে। তারিনের বিরক্তি এখন চরমে, ক্রোধে হাত-পা ছোঁড়ে। তাই বলে রাত ১১টা বাজাবে, কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই! প্রকাশ মুদির দোকান পর্যন্ত একা যেতে সাহস হয় না। বাচ্চা দুটি ঘরে, এদের রেখে গেলে কেমন হয়। কিন্তু এখন ভাববার সময় পার হয়ে গেছে, একা হলেও প্রকাশ মুদির দোকানে যেতে হবে। বলা যায় না, রাত পার করে দিতে পারে। সদর দরজা ও গেটে তালা মেরে বের হয় তারিন।
প্রকাশ মুদির দোকানের সামনে একজনও মানুষ নেই। বাইরের লাইট বন্ধ। দোকানের ঝাঁপ নামান। ভেতরে কম পাওয়ারের বাল্ব জ্বালিয়ে খাতায় মুখগুঁজে হিসাব কষায় ব্যস্ত প্রকাশ মুদি। মানুষের পদশব্দ শুনে মুখ তুলে তাকায়। তারিনকে দেখে দোকান থেকে বের হয়, আপনি? এতো রাতে? প্রফেসর সাব কোথায়? এবার তারিন কেঁপে ওঠে। এখানে আর কোনো মানুষ নেই। তাহলে মানুষটা গেল কোথায়? এখানে আসে নি সে? সিগারেট কিনতে বেরিয়েছিল। প্রকাশ মুদি মনে করার চেষ্টা করে। রাত আটটার দিকে কাস্টমারের ভিড় জমেছিল। এই ভিড়ের মধ্যে প্রফেসর ছিলেন কি না। মনে করতে পারে না কিছুতেই। প্রফেসর এলে দু-চারটি কথা না বলে চলে যাবার কথা নয়। কই, মনে পড়ছে না তো? প্রফেসর সাব আজকে এসেছিলেন কিনা, মনে পড়ছে না তো। অন্য কোথাও বেড়াতে…। তারিনের শরীর এবার ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে ওঠে। লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, আর তো কোথাও যাবার কথা নয়। এবার প্রকাশ মুদি অ্যা করে ওঠে, লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে! আর এতো রাত হলো…। যদিও রাত ১১টা খুব বেশি রাত নয়, তবু যেহেতু লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে, তাই বিষয়টা নিয়ে কিছু কথা বলে প্রকাশ মুদি। কোথায় যেতে পারে? আশেপাশে এমন কারো বাসা আছে কি লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে…। তার দোকানের সামনে মাঝেমধ্যেই প্রফেসরের জন্য অপেক্ষা করে কালো খাটো মোটা এক ভদ্রলোক। তার দোকান থেকে সিগারেট কেনে, মোবাইলে টাকা লোড করে। আজ তাকে দেখেছে বলে মনে পড়ে না। প্রকাশ মুদি নতুন করে বাল্ব জ্বালে নি। দোকানের ভেতর থেকে আসা কম পাওয়ারের বাল্বের আলোয় দেখতে পায়, তারিনের কপালের ভাঁজে ভাঁজে শিশিরের ফোঁটার মতো ঘাম, দুই গাল কাঁপছে, ঠোঁট কাঁপছে। বিষয়টিকে স্বাভাবিক করার জন্য বলে, প্রফেসর সাব মাটির মানুষ, আপনি কিয়ের লাগি এতো ভয় পাইতাছেন? কারো বাসায় গিয়া গল্প-টল্প…। তারিন আর দাঁড়াতে পারে নি। মানুষটা বোধ হয় এই ফাঁকে গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত হেঁটে এসে দেখে, ছেলেমেয়ে দু-জনেই গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ঘুম থেকে উঠলে কেন? তারিন গেট খুলতে খুলতে বলে।
ঘুমে থেকে শুনলাম বাবা ডাকছে, তাই…। মেয়েটা বলে।
বাবা এই যে আসছে, তোমাদের খেয়ে নিতে বলেছে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার সময় পায়ে মোচড় লাগায় তারিন উহু করে ওঠে। চোখ জলে টলমল। পাছে ওরা টের পায়, কয়েকবার উহু উহু শব্দ করে আঁচল দিয়ে চোখ মোছে। ঘরে ঢুকেই ছেলেমেয়ে দুটোকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করে। ঘুমে ছেলেটা আর তাকাতেই পারে না। অর্ধেক খাবার ফেলেই বিছানায় গেল এবং ঘুমিয়ে পড়ল। মেয়েটা খাবার শেষ করেই গেল বিছানায়। এখনো ঘুমায় নি। চোখ বুজে এপাশ ওপাশ করছে। ফাঁকে ফাঁকে চোখ খুলে দেখে মা কি করে। সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরোয় যে সহকর্মীর সাথে তার নাম মাঝে মধ্যেই বলে। একদিন বাসায়ও এসেছিলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে নামটা কিছুতেই মনে আসছে না। মেয়েটা এপাশ ওপাশ করছে দেখে তারিন বলে, কিরে, ঘুমাস নি? তোর বাবা যে আংকেলের সাথে সন্ধ্যায় হাঁটতে বেরোয়, তার কি নাম রে, তুই জানিস? এই সুযোগে মেয়েটা লাফিয়ে ওঠে। মোবাইল দাও, আংকেলের নাম্বার বের করে দেই। তারিন ভয় পাচ্ছে, মেয়েটা যদি ধরে ফেলে…। মোবাইলটা হাতে নিয়েই ধমক দিল, পাকামি করতে হবে না। ঘুমিয়ে পড়। বাবা এসে দেখলে কিন্তু ভীষণ রাগ করবে।
মোবাইলে কল ঢুকলেও রিসিভ হয় না। এভাবে এতো রাতে কোনো ভদ্রলোককে ফোন করা, যদি ঘুমিয়ে পড়েন, কি মনে করবেন। কিন্তু এখন ভদ্রতার সময় নেই। ফের কল ঢোকালে এবার রিসিভ হয়, কি ভাই, এতো রাতে? তারিনের হাত কাঁপছে। কাঁপা কণ্ঠে বলে, আমি উনার মিসেস বলছি। উনি কি আপনার কাছে নেই? ও প্রান্ত থেকে চড়া কণ্ঠ শোনা গেল এবং বিছানা থেকে উঠে বসেছে বলে মনে হলো, কি বলেন? আজ তো আমার সাথে দেখাই হয় নি। সন্ধ্যায় ফোন দিয়েছিলাম, নাম্বার বিজি দেখাচ্ছিল।
রাত ৮টার দিকে লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, বাসায় ফেরে নি এখনো। কোথায় যেতে পারে বলতে পারেন?
বিছানা থেকে লাফিয়ে পড়ার শব্দ শোনা গেল, লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে, এখনও ফেরে নি!
মোবাইল বাসায় ফেলে গেছে। যদি একবার…
আসছি আমি। টেনশন করবেন না।

এই লাশটি তার সহকর্মীর নয়। মর্গের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বমি ঠেলে আসছিল। কোনোমতে বেরিয়েই সোজা হেঁটে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। একটি রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু যেতে রাজি না হওয়ায় হাঁটতে শুরু করে। মিনিট দশেক হাঁটার পরে দেখতে পেল ফাঁকা রাস্তায় একটি জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছে এবং মানুষের কোলাহলের শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যে একটি নারীকণ্ঠের গোঙানিও শোনা যায়। একটা কিছু ঘটছে নিশ্চয়।

কলেজে পড়ানো ছাড়া মানুষটা কিছুই করে না। ব্যবসা, রাজনীতি এসব ঝামেলার মধ্যে নেই। পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে তেমন ওঠাবসা নেই। এরকম একজন মানুষকে…। দম বন্ধ হয়ে আসে তারিনের। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। টিভির স্ক্রলের দিকে তাকিয়ে চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। লাল কালির বড় বড় অক্ষরে ব্রেকিং নিউজ আসছে, ‘গাজীপুরে অপহৃত ওয়ার্ড কাউন্সিলর হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার।’ এতোক্ষণে মেয়েটাও ঘুমিয়ে পড়েছে। কলিংবেল বেজে ওঠায় দৌড়ে গিয়ে গেট খোলে এবং সহকর্মী বন্ধুটিকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢোকার পরেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে তারিন, ভাই, আমার বাচ্চা দুটার…। তারিনের শরীর কাঁপছে। সহকর্মী বন্ধুটি হাত ধরে সোফায় বসাল। আপনি এতোদূর ভাবছেন কেন? কোথাও গিয়েছে হয়তো। সে বলছে বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে একই আতঙ্ক তার। লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল যে মানুষ, রাত ১টা বাজে, এখনো ফেরে নি, আতঙ্ক হবারই কথা।
ভয়ে আতঙ্কে হাত-পা ছেড়ে দিয়েছে তারিন।
সম্ভাব্য কয়েকজনের কাছে ফোন করে সহকর্মী বন্ধু। একটি ফোনও খোলা নেই। ছাত্র-সহকর্মী ছাড়া এই শহরের আর কারো সাথে ওঠাবসা তো করে না। এবার সহকর্মী বন্ধুটি কিছুটা অস্থির। ঘরময় পায়চারী করে।
কলেজে কি ওর কোনো শত্রু আছে ভাই? তারিন বলে।
না, কলেজে শত্রু থাকবে কেন? কি বলেন? আমি ভাবছি, গ্রামের বাড়িতে কি কিছু…।
না, না, গ্রামের বাড়িতে ওর কেউ নেই। মা-বাবা মারা যাবার পরে বাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছে।
এখন আর অপেক্ষা করে লাভ নেই। তারিন একা একজন মেয়েমানুষ। আত্মীয় বলে এই শহরে কেউ নেই। কলেজের প্রিন্সিপাল বা ডিপার্টমেন্টের হেডকে ফোন করবে কিনা ভাবে সহকর্র্মী বন্ধুটি। এতো রাতে উনারা ফোন ধরবেন কিনা? এছাড়া এখনই সংবাদটা দেওয়া ঠিক হবে না। যে আতঙ্ক আর ভয়ের কথা ভাবছে, তাই যদি সত্য হয়, তবে রাতারাতিই একটি কিছু করে ফেলতে হবে।
ভাই, চলেন একবার থানায় যাই। আমার কেমন ভয় হচ্ছে। তারিন এবার হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
হ্যাঁ তাই করি, বলে সহকর্মী বন্ধুটি বের হতে গেলে তারিন বলে, আমিও যাব।
না না, বাচ্চারা ঘুমাচ্ছে। ওরা জেগে উঠলে ভয় পাবে।
টাকা পয়সা…।
সে আমি দেখছি।
সহকর্মী বন্ধুটিকে গেট খুলে দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে তারিন। দুপুর রাতের আকাশে জ্বলজ্বলে চাঁদ। রুদ্ধশ্বাসে দৌড়াচ্ছে। তারিনের কেবলি মনে হয়, এই বুঝি মানুষটার ছায়া দেখা গেল। এই অপেক্ষা কী তার নিয়তি হয়ে গেল কিনা, বড় করে একটা শ্বাস ফেলে।
একটি খালি রিকশা পাওয়ায় সহকর্মী বন্ধুটি থানায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগে নি। মানুষের সাড়াশব্দ তেমন নেই। একজন বয়স্ক কনস্টেবল গেটে বসে ঝিমুচ্ছে। মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ মেলে। চোখে কোনো জিজ্ঞাসা চিহ্ন নেই। বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখার কষ্ট থেকে বাঁচতে সে বলে, এখন কাউকে ছাড়া হবে না। কাল সকালে আসেন।
না, আমি ঠিক এই জন্য আসি নি। আমি শুধু…। সহকর্মী বন্ধুটি নিজের পরিচয় দেবার পরে কনস্টেবল যথেষ্ট সম্মানের সাথে কথা বলে। স্যার, আপনার কাকে ধরা হয়েছে?
ধরা হয়েছে কিনা ঠিক জানি না। লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে ঘর থেকে বেরিয়েছিল, এখনো ফিরে নি। তাই, সন্দেহবশত এখানে আসা।
আজ তো লোক ধরাই হয় নি। বিশ-বাইশজন মাত্র। লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে তিন-চার জন আছে। আপনি যাকে খুঁজছেন, সে আছে কি না দেখেন, বলে লকারের সামনে নিয়ে গেল।
ছোট্ট একটা লকার, ভালো করে বসলে ৫ জন মানুষ বসতে পারে, তার ভিতরেই বিশ-বাইশজন ঠাসাঠাসি করে শুয়ে বসে আছে। একজনের শরীরের উপরের আরেকজন গুলি খাওয়া লাশের মতো পড়ে আছে। জিরো পাওয়ারের হলুদ বাল্ব জ্বলছে। সহকর্মী বন্ধুটি লকারের সামনে দাঁড়াতেই যারা জেগে ছিল তারা তো বটেই, যারা চোখ বুজে ছিল, তারাও লোহার শিক ধরে দাঁড়িয়ে তাকে চিনতে চেষ্টা করে। আপনজন কেউ এলো কিনা? তারা লকারে, এ সংবাদ হয়তো জানেই না পরিবার। ওদের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেউ হাঁটতে বেরিয়েছিল, বাজার করতে বেরিয়েছিল কেউ, সংসারের টুকিটাকি কাজে অথবা বন্ধুর সাথে দেখার কথা ছিল কারো। আচমকা হাতে বেড়ি পরিয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়েছে। জিরো পাওয়ারের বাল্বের হলুদ আলোয় সহকর্মী বন্ধুটি তার সহকর্মীর মুখটি খুঁজে পায় নি। একবার ভেবেছিল, নাম ধরে ডাকবে। এই নামের কেউ থাকলে সাড়া দিবে নিশ্চয়। কি মনে করে ডাকা হয় নি।
থানা থেকে বেরিয়ে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে সহকর্মী বন্ধুটি কিছুক্ষণ ভাবল। আর কোথায় যেতে পারে? হাসপাতালে যাবে কি না? যদি…। এরপর আর ভাবতে চায় না। বরং হাসপাতালের দিকেই হাঁটা ধরে। থানা থেকে হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র কয়েক পদক্ষেপ দূরে। এতো বড় হাসপাতালের কোথায় খুঁজবে? কিছুক্ষণ ভেবে মর্গের দিকেই হাঁটে। মর্গের দারোয়ানের সামনে দাঁড়িয়ে কি বলবে ভেবে পায় না। দারোয়ান উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নেহাত প্রয়োজন ছাড়া কোনো মানুষ মর্গের সামনে দিয়ে হাঁটেও না।
আপনি কিছু বলবেন? কাউকে খুঁজছেন? দারোয়ান জিজ্ঞেস করে।
বোবা যেন হঠাৎ কথা বলে ওঠে, আ-আ করে কিছু একটা বলে, কিন্তু দারোয়ানের কান পর্যন্ত পৌঁছায় নি। এবার সে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার চেষ্টা করে, লুঙি পরে গেঞ্জি গায়ে খালি হাতে এখানে কোনো লাশ ঢুকেছে কিনা?
দারোয়ান অত্যন্ত স্বাভাবিক ও অভ্যস্ত কণ্ঠে বলে, এ ঘরে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লাশ ঢোকে।
এই ধরেন রাত আটটার পরে যে কোনো সময়।
রাত আটটার পরে সাত-আটটা লাশ ঢুকেছে? আপনি কোনটা খুঁজছেন?
তার মানে, স্বাভাবিক লাশ নয়, গুলি-টুলি লেগে…
এখন এই রকম লাশই আসে বেশি।
মর্গের ভেতরে লাইট নেই। মেঝেতে লাশগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজান। বিশ-বাইশটা লাশ। দরজা ফাঁক গলিয়ে আসা আলোর একটি লম্বা চিকন আভা পড়েছে লাশগুলির মুখের উপরে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে নিল। একটি একটি করে সব কটি লাশ দেখার পরে একটি লাশের মুখ তার সহকর্মীর মুখের সাথে খানিকটা মিল আছে বলে মনে হওয়ায় ফিরে গেল সেই লাশটির কাছে। এই মানুষটির পরনে লুঙি, কিন্তু গায়ে সাদা পাঞ্জাবি। গুলি বুক ছ্যাঁদা করে পিঠ দিয়ে বেরিয়েছে। লোমশ হাত দুটি বুকের উপরে রাখা। এই লোমশ হাত এবং পাঞ্জাবি দেখে নিশ্চিত হয়, এই লাশটি তার সহকর্মীর নয়। মর্গের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার সময় বমি ঠেলে আসছিল। কোনোমতে বেরিয়েই সোজা হেঁটে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। একটি রিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু যেতে রাজি না হওয়ায় হাঁটতে শুরু করে। মিনিট দশেক হাঁটার পরে দেখতে পেল ফাঁকা রাস্তায় একটি জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির ভেতরে আলো জ্বলছে এবং মানুষের কোলাহলের শব্দ শোনা যায়। এর মধ্যে একটি নারীকণ্ঠের গোঙানিও শোনা যায়। একটা কিছু ঘটছে নিশ্চয়। এই ভেবে সে জিপগাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আঁতকে ওঠে। সাদা গ্লাসের গাড়ি। ভেতরে তিনজন যুবক একজন যুবতী। যুবতীর মুখ বাঁধা। একজন যুবতীর উপরে উঠে আছে। অন্য দুজন যুবতীর দুটি স্তন পাউরুটি ছেঁড়ার মতো বুক থেকে ছিঁড়ে নিতে চাচ্ছে। যুবতীর নড়ার শক্তি নেই। কারণ দুই ঠ্যাং বাঁধা দুই সিটের দুই বেল্ট দিয়ে। আর দুই হাত ধরে আছে দু-জনে। কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ওরা টের পায় নি একজন মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত, সহকর্মী বন্ধুটি ভাবে। ওদের কাছে অস্ত্র আছে। কিন্তু এরা কারা? কার মেয়েকে ছিনতাই করে এনে এভাবে সর্বনাশ করছে! কাজ শেষে ওরা মেয়েটিকে মেরে ফেলবে নিশ্চয়। তার উপস্থিতি টের পেয়ে মেয়েটিকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারে। এতে মেয়েটির জীবন বাঁচবে। এই ভেবে সহকর্মী বন্ধুটি একধাপ এগিয়ে গেল। এবার তারা তার উপস্থিতি ধরতে পারে। কিন্তু তার উপস্থিতিকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না। নিজেদের কাজেই ব্যস্ত। এবার সে বলে, এই তোমরা কারা? এভাবে কার মেয়ের সর্বনাশ করছ? তার কথায় ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কাজ এখন আরো জটিল হয়ে এসেছে। দু-জনের শেষ হয়ে তৃতীয় জনের চলছে। এবং কাজ শেষ হবার আগে ওরা যে তার দিকে তাকাবেও না, এটা সে বুঝতে পারে। হঠাৎ কি মনে করে বলে, পাশেই থানা, আমি এখনই থানায় খবর দিতে যাচ্ছি। এই কথাটি ওদের কানে গেল। যে কাজ করছিল, সে বাদে বাকি ২ জন গাড়ি থেকে নেমে এলো হাঁপাতে হাঁপাতে। তৃতীয় জনের কাজের জন্য মেয়েটিকে আর ধরার প্রয়োজন নেই। মেয়েটি আত্মরক্ষার কোনো চেষ্টাই করছে না। যে ২ জন নেমে এসেছে, তাদের একজনকে দেখে চমকে ওঠে, ছেলেটা তার ডিপার্টমেন্টেরই ছাত্র। ছাত্রসংগঠন করে। ক্লাস কোনোদিনই করে না। ছেলেটি তার সামনে এসে বলে, স্যার, এতো রাতে এই রাস্তায় ঘুরছেন কেন? মাগি খুঁজে বেড়াচ্ছেন বুঝি! সহকর্মী বন্ধুটির মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে হঠাৎ ছেলেটির গালে এক থাপ্পর বসিয়ে দিলে ছেলেটিও আর বিলম্ব করে নি। পকেটের পিস্তলে এক হাত দেয়াই ছিল, একটা গুলি স্যারের বুক বরাবর পাঠিয়ে দিয়ে লাফিয়ে ওঠে গাড়িতে।
রাত শেষ হয়ে আসছে মসজিদগুলোতে আজান পড়তে শুরু করেছে।

অলংকরণ : চারু পিন্টু