Ad Space

তাৎক্ষণিক

গাইবান্ধার পুলিশ হত্যার নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর হতাশা

জানুয়ারি ৪, ২০১৭

সাহেব-বাজার ডেস্ক : গাইবান্ধায় চার পুলিশ সদস্য হত্যার পর প্রায় চার বছর হতে চললেও মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস দমন এবং উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বুধবার রংপুর বিভাগের সঙ্গে এক ভিডিও কনফারেন্সে তিনি বলেছেন, “২০১৩ সালের ঘটনা এখনো এই পর্যন্ত? তাহলে আর দ্রুত বিচারের কী হচ্ছে!”

বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আজকে তো আমার একজন এমপিকে হত্যা করল। এরপরে আর কত ঘটনা ঘটবে কে জানে…।”

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইবুনাল যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণার পর বামনডাঙ্গাসহ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালায় জামায়াতকর্মীরা।

সেদিন তারা বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়িতে ঢুকে চার কনস্টেবলকে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই মামলা এখনো দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন।

এ প্রসঙ্গ টেনে গত সোমবার সুন্দরগঞ্জের শাহবাজ এলাকায় সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের জানাজার ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া বলেন, “সেই মামলার আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে পারলে আজ লিটন হত্যার মতো ঘটনা ঘটত না।‘কিছু কর্মকর্তার অবহেলার কারণে’ এতদিনেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি বলে মন্তব্য করেন ডেপুটি স্পিকার। এরপর বুধবার রংপুর বিভাগের পাঁচ জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সরকারপ্রধানও সেই প্রসঙ্গে কথা বলেন।

গাইবান্ধার নবম শ্রেণির ছাত্রী ঐশ্বর্য সিংহের সঙ্গে কথা বলার পর সাংসদ লিটন হত্যা মামলার অগ্রগতি জানতে জেলার পুলিশ সুপার মো. আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, পুলিশ কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে।

জবাবে গাইবান্ধার এসপি বলেন, “৩১ ডিসেম্বর অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। গাইবান্ধা-১ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। আমরা ইতোমধ্যে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তদন্ত করার জন্য ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছি। পুলিশসহ বিশেষায়িত সংস্থার কর্মকর্তাসহ সকলেই ঘটনাস্থলে গেছেন বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানান আশরাফুল ইসলাম।

লিটন হত্যা মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করতে আমরা দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছি। যে করেই হোক, যেই হোক না কেন… সঠিক তথ্য উদঘাটন করব।”

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি মোতায়েনের কথাও বলেন পুলিশ সুপার।

এ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি এখানে একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে চাই। ২০১৩ সালে এই সুন্দরগঞ্জসহ গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায়, সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ি, তারপর গোবিন্দগঞ্জ, শাদুল্লাহপুর, ফুলছড়ি বিভিন্ন জায়গায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল এবং পুলিশ পিটিয়ে হত্যা করেছিল জামাত-বিএনপি। সে সময় চারজন পুলিশকে হত্যা করে। পরবর্তীতে ২০১৪ ও ১৫ সালে আরও দুজন পুলিশকে হত্যা করে। সেই খুনীরা এ পর্যন্ত ধরা পড়েছে কিনা।”

গাইবান্ধার এসপি জবাবে বলেন, “২৩৫ জন আক্রমণ করে। ১৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনে সোপর্দ করেছি। বাকিরা পরবর্তীতে আমাদের… আইনের আওতায় আসে। প্রত্যেককে আমরা আইনে সোপর্দ করেছি। এই মামলাটি তদন্ত করে ২০১৪ সালে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এবং এটা দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে অপেক্ষায় আছে। আগামীকালই একটা ডেট আছে।”

গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি মওলানা আব্দুল আজিজসহ ২৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ওই অভিযোগপত্র দেয় সুন্দরগঞ্জ থানার তখনকার ওসি মোজাম্মেল হক।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগেরই দেড়শর বেশি নেতা-কর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর হয়েছে, তাদের দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য সব লুটপাট হয়েছে… যেভাবে তাণ্ডব চলেছে ১৩ তে ১৪ তে ১৫ তে… এই আসামিগুলো যদি দ্রুত ধরা না পড়ে… আজকে তো একজন আমার এমপিকে হত্যা করল।…”

এসব ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দ্রুত বিচার… ১৩ সাল থেকে আজকে ১৭, তাহলে দ্রুত বিচারের কী হল? এটাও আমাদের দেখতে হবে,” বলেন প্রধানমন্ত্রী।

গাইবান্ধায় ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, হুইপ মাহাবুব আরা বেগম গিনি, জেলা প্রশাসক মো. আব্দুস সামাদ, গাইবান্ধা পৌরসভার মেয়র শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবীর মিলনসহ জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও সাংস্কৃতিককর্মীসহ পেশাজীবীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বাংলার মাটিতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান যেন না হয়।”

সুন্দরগঞ্জে আওয়ামী লীগের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জামাত ও জঙ্গিবাদ রুখে দিয়েছিল বলেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। একজন সংসদ সদস্যকে এভাবে হত্যার ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।”

গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মোটরসাইকেলে করে আসা অজ্ঞাতপরিচয় তিন যুবক সুন্দরগঞ্জে বাড়িতে ঢুকে লিটনকে গুলি করে হত্যা করে।

তার স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে জামায়াতই তার স্বামীকে হত্যা করেছে বলে তার ধারণা। আওয়ামী লীগের নেতারাও একই সন্দেহের কথা বলেছেন।

তবে জামায়াত এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতে তাদের উপর দোষ চাপানো হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, “অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিল লিটন।…আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলব, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”

রংপুর বিভাগের ছয় হাজার ২৯৯টি স্থানে প্রধানমন্ত্রীর এই ভিডিও কনফারেন্সের বক্তব্য দেখানো হয় এবং প্রায় ৩২ লাখ নাগরিক তা শোনেন বলে মুখ্য সচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী জানান।

প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে পঞ্চগড়ের মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান বীর প্রতীক ও চা বাগানের শ্রমিক সুমী আক্তারসহ বয়স্ক ভাতাপ্রাপ্ত একজনের কথা শোনেন।

এরপর রংপুরের এক মাদ্রাসা শিক্ষক জঙ্গিবাদের বিষয়ে কোরআনে যা বলা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করেন।

পরে কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়াছড়ার চম্পা বেগম এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়া দিনাজপুর সদর উপজেলার জামে মসজিদের ইমাম, একজন শিক্ষক ও একজন লিচু ব্যবসায়ীও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন।

ভিডিও কনফারেন্সের ঢাকা প্রান্তে গণভবনে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। –খবর বিডিনিউজ