Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • রাসিকের অস্বাভাবিক হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধি তদন্তের নির্দেশ মন্ত্রণালয়ের– বিস্তারিত....
  • দুর্গাপুরে পুকুর খননের অভিযোগে চারজন আটক– বিস্তারিত....
  • জয়পুর মাদ্রাসার দাখিল পরীক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান– বিস্তারিত....
  • ছাত্রলীগ নেতাকে হাতুড়ি দিয়ে পেটালো আ’লীগের নেতারা– বিস্তারিত....
  • মোহনপুরে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ– বিস্তারিত....

‘বাধ্য হয়েই তারা জঙ্গি জীবনে’

ডিসেম্বর ২৭, ২০১৬

সাহেব-বাজার ডেস্ক : পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, নব‌্য জেএমবির যে কয়জন নারী সদস‌্য এ পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন বা আত্মসমর্পণ করেছেন, তারা সবাই স্বামীর চাপে বা সামাজিক কারণে ওই পথে গেছেন বলে ধারণা পেয়েছে পুলিশ। আশকোনায় জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের মধ‌্যে সন্তান নিয়ে দুই নারী জঙ্গির আত্মসমর্পণ এবং গ্রেনেড ফাটিয়ে এক নারীর আত্মাহুতির ঘটনার তিন দিন পর বুধবার সাংবাদিকদের এ তথ‌্য দেন মুনিরুল।

তিনি বলেন, “নব্য জেএমবিতে এমন কোনো নারী নেই যিনি নিজের ইচ্ছায় জঙ্গিবাদে জড়িয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার, আত্মসমর্পণ করে রিমান্ডে থাকা নারীদের কাছে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য এবং বিভিন্ন অভিযানে পাওয়া আলামত থেকে জানা গেছে সামাজিক কারণে, আত্মীয় স্বজনদের বিরাজভাজন হওয়ার ভয়ে এবং স্বামীদের চাপে তারা জঙ্গিবাদে যুক্ত হয়েছেন।” খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর।

জুলাইয়ের শুরুতে গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব‌্যাপক অভিযানের মধ‌্যে চলতি বছর জুলাই মাসে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে জেএমবির তিন নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়, যাদের স্বামীরাও জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে সে সময় পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়।  ওই মাসেই সিরাজগঞ্জ শহরে জেএমবির সন্দেহভাজন চার নারী সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ; তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হাতবোমা, বোমা তৈরির সরঞ্জাম ও উগ্র মতবাদের বই।

এরপর অগাস্টে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির চার নারী সদস্যকে র‌্যাব গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যারা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ছাত্রী। পুলিশের ভাষ‌্য অনুযায়ী, ওই চারজন তহবিল ও কর্মী সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

গত ৫ সেপ্টেম্বর সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার গান্ধাইল ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ইতলী গ্রাম থেকে চার নারীকে গ্রেফতারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা ‘জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য’। ওই পরিবারের ছেলে ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ অক্টোবরে গাজীপুরের এক জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন।

এরপর ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরের একটি বাড়িতে পুলিশি অভিযান গেলে সেখানে নব‌্য জেএমবির নেতা তানভীর কাদেরী আত্মহত‌্যা করেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। আর তানভীরের স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ওরফে খাদিজা, গুলশান হামলায় জড়িত নুরুল ইসলাম মারজানের স্ত্রী আফরিন ওরফে প্রিয়তি এবং জেএমবি নেতা বাসারুজ্জামান চকলেটের স্ত্রী শারমিন ওরফে শায়লা আফরিনকে পুলিশ আহত অবস্থায় আটক করে।

ওই তিন নারী মরিচের গুঁড়া ও ছোরা নিয়ে হামলা চালিয়েছিলেন বলে সেদিন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন। তিনজনের মধ‌্যে একজন পুলিশের গুলিতে আহত হন, বাকি দুজন ছুরি দিয়ে আত্মহত‌্যার চেষ্টা করেন বলে জানায় পুলিশ।

তানভীর-ফাতেমা দম্পতির জমজ ছেলেদের একজনকে আজিমপুরের অভিযানের সময় আহত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়। আরেক ছেলের খোঁজ করতে গিয়ে আশকোনায় আরেক জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পায় পুলিশ।

শনিবার ওই বাড়িতে অভিযানের সময় দুই শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করেন পলাতক জঙ্গি রাশেদুর রহমান সুমনের স্ত্রী শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫) এবং মিরপুরে নিহত নব‌্য জেএমবির নেতা সাবেক মেজর জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার ওরফে শিলা ওরফে সুমাইয়া ওরফে মারজুন (৩৪)। অভিযানের এক পর্যায়ে পলাতক জঙ্গি রাশেদুর রহমান সুমনের স্ত্রী শাকিরা ওরফে তাহিরা (৩৫) এক শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে কোমরে বাঁধা গ্রেনেড ফাটিয়ে আত্মঘাতী হন। আর অভিযান শেষে ওই বাসার ভেতরে তানভীর-ফাতেমা দম্পতির আরেক ছেলে আফিফ কাদেরীর লাশ পাওয়া যায়।

মনিরুল বলেন, তানভীর কাদেরীর স্ত্রী আবেদাতুল ফাতেমা ‘স্বামীর চাপে’ জঙ্গিবাদে জড়ানোর কথা বলেছেন জিজ্ঞাসাবাদে। “তার একটা সুন্দর জীবন ছিল। স্বামী ভালো চাকরি করতেন। স্বামী জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হবার পর তার কারণেই এই নারী জঙ্গি দলে ভিড়তে বাধ্য হন।”

তানভীর কাদেরী এক সময় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং শাখার কর্মকর্তা ছিলেন। আর তার স্ত্রী ছিলেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ‘সেইভ দ্য চিলড্রেন’ এর কর্মকর্তা। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা বলে তারা চাকরি ছাড়ার কয়েক মাস পর তাদের সন্ধ‌ান পাওয়া যায় আজিমপুরের জঙ্গি আস্তানায়।

“ওই নারী বলেছেন, তার যেহেতু দুটি সন্তান রয়েছে, স্বামী জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে খবর পেলে সামাজিকভাবে ছোট হয়ে যেতে হত। আত্মীয়-স্বজনরা তাকে কখনোই মেনে নিত না। তাই অনেকটা মনের বিরুদ্ধে তাকে স্বামীর সঙ্গে থাকতে হয়েছে।”

মনিরুল জানান, পুলিশের হাতে আটক প্রিয়তিও তার স্বামী জঙ্গি নেতা নুরুল ইসলাম মারজানকে ‘অত্যন্ত স্বৈরচারী’ মেজাজের লোক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। “নিজের সব ইচ্ছা তিনি স্ত্রীর উপর চাপিয়ে দিতেন। প্রিয়তি তার মামার বাড়িতে বড় হয়েছে। লেখাপড়াও তেমন জানা নেই, চাকরি নেই। তাকে দেখার মতো কেউ ছিল না। জঙ্গি মতাদর্শে না গেলে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যাবে- এমন ভয় কাজ করত।”

মনিরুল বলেন, “দুই নারীই বলেছেন, তারা মন থেকে কখনোই জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাস করেন না। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে যারা মানুষের ক্ষতি করে তাদের আদর্শকে তারা কোনদিন সমর্থন করেন না। তারপরও স্বামীর চাপে বাধ্য হয়ে তারা জঙ্গিদের সঙ্গে ছিলেন।”

জঙ্গি সুমনের স্ত্রী শাকিরার আত্মঘাতী হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়ে মনিরুল বলেন, “তার আগের স্বামী ইকবাল ক্যান্সারে মারা গেছেন। বর্তমান স্বামী সুমনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে এমন খবর রয়েছে। ওই নারী হতাশায় ভুগছিলেন। সেখান থেকেই আত্মঘাতী হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন বলে আমাদের মনে হয়েছে।”

এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “জঙ্গি নেতারা তাদের সন্তানদেরও জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে চাইতেন। তারা মনে করতেন সন্তানের মাকে তাদের মতাদর্শে আনা গেলে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। এজন্য তারা স্ত্রীদের জঙ্গি মতাদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে গড়ে উঠতে চাপ দিতেন।”

আশকোনায় গ্রেফতার জেবুন্নাহার শীলা ও তৃষা মনিসহ আটজনকে আসামি করে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেছে পুলিশ। ওই মামলায় শীলা ও তৃষাকে সাতদিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

শীলার স্বামী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে মিরপুরের রূপনগরের একটি বাসায় পুলিশের অভিযানে নিহত হন। এরপর শীলা তার দুই সন্তানকে নিয়ে আজিমপুরের সেই জঙ্গি আস্তানায় ওঠেন, যেখানে তানভীর কাদেরীর পরিবারের সদস‌্যরাও ছিল।

পুলিশ সেখানে অভিযান চালানোর চার দিন আগে এক বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে সেখান থেকে সরে যান শীলা। তার সাত বছর বয়সী মেয়েটি আজিমপুরে অন‌্যদের সঙ্গে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তারপর থেকে শীলাকেও খুঁজছিল পুলিশ; তিন মাস পর তাকে পাওয়া যায় আশকোনার আস্তানায়।

সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জাহিদ ‘নব্য জেএমবি’র শীর্ষনেতা তামিম চৌধুরীর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ ছিলেন। তিনি এই জঙ্গি গোষ্ঠীর সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতেন বলে পুলিশ জানায়। সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায় ২০১৪ সালে কানাডা গিয়েছিলেন কুমিল্লার বাসিন্দা জাহিদ। সেখান থেকে ফেরার পর তার মধ‌্যে বদল চোখে পড়ে স্বজনদের। এরপরই তিনি স্ত্রীকে নিয়ে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েন বলে পুলিশের ভাষ‌্য।