আগস্ট ২০, ২০১৭ ২:২৯ পূর্বাহ্ণ
Home / slide / এগিয়ে মোহাম্মদ আলী, জনবিচ্ছিন্ন ভুলু

এগিয়ে মোহাম্মদ আলী, জনবিচ্ছিন্ন ভুলু

নিজস্ব প্রতিবেদক : জমে উঠেছে রাজশাহী জেলা পরিষদের নির্বাচনি প্রচারণা। নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুই প্রার্থী। তবে প্রচারণায় বেশ এগিয়ে আছেন আনারস প্রতীকের প্রার্থী আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা মোহাম্মদ আলী সরকার। দিনরাত তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন জেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।

অপরদিকে প্রচারণায় বেশ পিছিয়ে পড়েছেন জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক তালগাছ প্রতীকের প্রার্থী মাহবুব জামান ভুলু। ভোটাররা বলছেন, প্রশাসক থাকাকালে মাহবুব জামান ভুলু একেবারেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। নানা অনিয়ম-দুর্নীতিরও অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এ কারণে তিনি এখন ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যেতে পারছেন না। তবে রাজশাহীর তিন এমপি পিছিয়ে পড়া ভুলুকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন।

রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছর মাহবুব জামান ভুলু জেলা পরিষদের প্রশাসক থাকাকালে আগাম ঘুষ ছাড়া তারা সেখান থেকে একটি কাজও পাননি। অনেকে আগাম টাকা দিয়ে এখন পর্যন্ত কাজও পাননি, টাকাও ফেরত পাননি। আবার এ নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে জেলা পরিষদে গেলে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এখন তিনি ভোট চাইতে তাদের দুয়ারে যাওয়ারই সাহস পাচ্ছেন না।

সম্প্রতি মাহবুব জামান ভুলুর বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন জেলা পরিষদের কর্মচারিরা। ‘ভুক্তভোগি কর্মচারি মহল’ নাম দিয়ে গণমাধ্যমে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে তারা ভুলুর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা অভিযোগ তোলেন। অভিযোগে তারা বলেন, গত কয়েকটা বছর তারা ভুলুর চরম স্বেচ্ছারিতার মধ্যে দিনাতিপাত করেছেন। এছাড়াও ভুলুর বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয় লিখিত ওই অভিযোগপত্রে।

জানা গেছে, ভুলুর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। এর আগে ২০১৩ সালে রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলার চেয়ারম্যানরা ভুলুর বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে তারা ওই সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগে তারা বলেছিলেন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়েছে। এছাড়াও ২০১৩-১৪ অর্থবছরে পাওয়া দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা লুটপাট করা হয়। রাজশাহীর ৯ উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা (ইউএনও) জেলা পরিষদের বরাদ্দ কমিটির সদস্য হলেও প্রশাসক মাহবুব জামান ভুলু একক সিদ্ধান্তে সব বরাদ্দ নিয়ে লুটপাট চালান।

অভিযোগে আরও বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যারা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ নগদ প্রদান করেন, কেবল তাদেরই প্রকল্প দেয়া হয়। আর ওই ঠিকাদাররা আবার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লাভে প্রকল্প বিক্রি করে দেয়। এতে ভুলুর আমলে কাজ বাস্তবায়ন হয় মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এসব অনিয়মের কারণে জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে ৮ উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা পরিষদের সব সভা বর্জন করতেন। ভুলুর কাছে হয়রানির শিকার হয়ে গত বছরের ৮ মার্চ আদালতে মাহবুব জামান ভুলুর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছিলেন হাবিব মো. এনামুল হক নামে রাজশাহীর এক ঠিকাদার। মামলা নম্বর ০৩/২০১৫।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে কথা বলতে শুক্রবার সন্ধ্যায় মাহবুব জামান ভুলুর মুঠোফোনে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে পরে ফোন করতে বলেন। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আবার ফোন করা হলে নাম পরিচয় না জানিয়ে এক ব্যক্তি ফোন ধরে জানান, মাহবুব জামান ভুলু এখনও ব্যস্ত আছেন, কথা বলতে পারবেন না। তাই এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাহবুব জামান ভুলু ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ আসনের প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক থাকায় তিনি জয়ের মুখ দেখতে পারেননি। এবার জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী সরকারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ভুলুর প্রতীক তালগাছ। আর মোহাম্মদ আলীর আনারস। খোদ ভোটাররা বলছেন, প্রশাসক থাকাকালে ভুলু জেলা পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের কোনো জনপ্রতিনিধিকে সম্পৃক্ত করেননি। ভুলু এতোটাই জনবিচ্ছিন্ন ছিলেন, অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি জেলা পরিষদ চেনেনই না। নানা বিতর্কও আছে ভুলুকে নিয়ে।

এসব কারণে তিনি এখন ভোট চাইতে ভোটারদের দুয়ারে যাওয়ারই সাহস পাচ্ছেন না। তবে রাজশাহী-১ আসনের এমপি ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-৩ আসনের এমপি আয়েন উদ্দিন ও রাজশাহী-৫ আসনের এমপি আবদুল ওয়াদুদ দারা নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে তার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভোট চাইছেন। এ নিয়ে নির্বাচনের অপর প্রার্থী মোহাম্মদ আলী সরকার এই তিন এমপির নামে দফায় দফায় রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন। সহকারী রিটার্নিং অফিসার তাদের শোকজ করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদ আলী সরকার প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভায় গিয়ে ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছেন। তবে মাহবুব জামান ভুলু যাচ্ছেন না ভোটারদের কাছে। তিনি নির্বাচনি সভার আয়োজন করে ভোটারদেরই ডেকে পাঠাচ্ছেন। তারপর তাদের কাছে ভোট চাইছেন। কখনও কখনও ওই তিন এমপিও ভোটারদের জড়ো করে ভুলুর পক্ষে ভোট চাইছেন। তবে এ সময় ভোটাররা এমপিদের সামনে ভুলুর নানা অপকর্ম তুলে ধরে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।

ভোটাররা বলছেন, ভুলুর নির্বাচনি সভায় যাওয়ার জন্য এমপিদের পক্ষ থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে। ভোটের সময় প্রার্থীরা ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে কড়া নাড়ার কথা থাকলেও ভুলুর সেই সাহস না থাকায় তিনি এমপিদের দিয়ে নির্বাচনি সভা করছেন। ভোটাররা এমপিদের ভয়ে সেখানে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। ফলে ভোটারদের মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ভুলুর তালগাছ। অপরপক্ষে মোহাম্মদ আলী সরকার প্রতিটি ইউপিতে ইউপিতে গিয়ে গণসংযোগ করছেন। ফলে এরই মধ্যে ভোটারদের আকৃষ্ট করে ফেলেছে মোহাম্মদ আলীর আনারস।

মোহাম্মদ আলী সরকার বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের জেলা পরিষদ ‘চেনাবেন’। বিলুপ্ত করবেন জেলা পরিষদের ‘পার্সেন্টেজ’ প্রথা। সরকারি বরাদ্দের সুষম বন্টন করে রাজশাহীর উন্নয়ন করবেন তিনি। আর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের সিদ্ধান্তের বাইরে একটি কাজও করবেন না তিনি। তাদের সঙ্গে নিয়েই একটি আদর্শ পরিষদ উপহার দিতে চান তিনি।

তবে কে আসছেন জেলা পরিষদে? ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ আলী সরকার, নাকি সাবেক প্রশাসক মাহবুব জামান ভুলু? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ দিন জেলার ১৫টি ভোটকেন্দ্রে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। রাজশাহী সিটি করপোরেশনসহ জেলার সবগুলো পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের এক হাজার ১৭১ জন জনপ্রতিনিধি তাদের ভোটে নির্বাচিত করবেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

রামেক হাসপাতালের শিশু বিভাগে ফটো থেরাপি মেশিন দিলো রোটারি ক্লাব

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীতে রোটারি ক্লাব অব মেট্রোপলিটনের ১৪তম কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার বিকেলে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *