Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে সংঘর্ষ, উদ্বিগ্ন সাংসদ বাদশা– বিস্তারিত....
  • ভোটের ‘ধর্মীয় সেন্টিমেন্টে’ ভাস্কর্য সরানোর ‘পক্ষে’ আ’লীগ-বিএনপি– বিস্তারিত....
  • আমরা আজ হেরে গেলাম : ভাস্কর মৃণাল হক– বিস্তারিত....
  • নতুনদের জন্য ভিডিও এডিটিং কোর্স নিয়ে এলো বিআইটিএম– বিস্তারিত....
  • সৌদিতে রোজা শুরু শনিবার, বাংলাদেশে রবিবার– বিস্তারিত....

বাংলাদেশের স্বাধীনতা : পাওয়া না-পাওয়ার সাড়ে চারদশক । অনুপম হাসান

ডিসেম্বর ১৫, ২০১৬

শিরোনামেই প্রতিফলিত স্বাধীনতা শব্দটির মূল্যায়নের ব্যাপারটি; মূল সুর হিসেবে অনুরণিত– স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বিগত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশ কি পেয়েছে বা পায় নি, তা ফিরে দেখা; মিলিয়ে নেয়া– কি হওয়ার কথা ছিল, কি হয়েছে কিংবা কি হতে পারতো!

এক.
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে প্রায় চার দশক আগে। সময়ের বিবেচনায় চার দশক কম সময় নয়। প্রায় অর্ধশতাব্দী কাল। কিন্তু পিছনে ফিরে তাকালে কিংবা স্বাধীনতার লক্ষ্য উদ্দেশ্য অর্জনের হিসেব করলে গা শিউরে ওঠে এখনো। পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোনো দেশ হয়তো পৃথিবীর ইতিহাসে পাওয়া যাবে না যেখানে একটি স্বাধীন জাতিগোষ্ঠীর সাধারণ জনগণের ভিড়ে পরাজিত শক্তি লুকিয়ে থাকতে পারে এতো দীর্ঘ সময়। স্বাধীনতা লাভের পর অল্প সময়ের জন্য তারা আত্মগোপন করে থাকলেও পঁচাত্তরের বঙ্গবন্ধু-ট্র্যাজেডির পর এই পরাজিত শক্তি শুধু মাথা উঁচু করে নয় রীতিমতো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ওপর অত্যাচার নির্যাতন পর্যন্ত চালিয়েছে। স্বাধীনতার বিরোধীশক্তি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন হওয়ায় তারা প্রকাশেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ছাড়পত্রও পেয়ে যায়। কালে কালে এই পরাজিত স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি এতোটাই শক্তি অর্জন করেছে যে তাদের দাপটে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে পালিয়ে পর্যন্ত বেড়াতে হয়েছে। কথা বলতে পারে নি তারা। যে ব্যক্তিবিহীন বাংলাদেশের অস্তিত্বও কল্পনা করা যায় না, সৌভাগ্যক্রমে পঁচাত্তর সালে তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-কন্যারাও এই পরাজিত শক্তির আস্ফালনে পিতার মৃতদেহের সৎকার পর্যন্ত করতে পারেন নি। তাঁরা চোখের জলও ফেলতে পারেন নি প্রকাশ্যে। বঙ্গবন্ধু শহীদ হওয়ার প্রায় অর্ধযুগ পরে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। কিন্তু দেশে ফিরলেও পিতার হত্যাকারীরা চোখের সামনে থাকলেও তাদের বিচার দাবি করতে পারেন নি। পরাজিত মৌলবাদীশক্তি কালো আইন করে বঙ্গবন্ধুর বিচার কার্যক্রম পর্যন্ত সাংবিধানিকভাবে বন্ধ করে রেখেছিল।

জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, আমি গণতন্ত্রকে জটিল করব। তিনি করেছিলেনও তা অক্ষরে অক্ষরে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার আগেই পাকিস্তানে বিশ্বাসী মৌলবাদীরা বাংলাদেশেও ধর্মের নামে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়ে যায়। ফলে দেশে ফিরে যখন বঙ্গবন্ধু-কন্যা পিতার হাতে গড়া রাজনৈতিক দলের হাল ধরেন তখন তাকে ক্ষমতাসীন সামরিকজান্ত ও রাজনীতির মাঠে মৌলবাদীদের ধর্মীয় রাজনৈতিক উন্মাদনা মোকাবিলা করতে হয়েছে। দৃঢ়চেতা পিতার আদর্শে গড়া শেখ হাসিনাও প্রচণ্ড মানসিক ধীশক্তির অধিকারী। এজন্য দীর্ঘ এক দশকব্যাপী ক্ষমতাসীন সামরিক জেনারেলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, লড়াই করেছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের। নব্বই সালে সামরিক স্বৈরাচার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ত্যাগ করলেও নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরাজয় বরণ করে। যদিও নির্বাচনে কারসাজি করা হয়েছিল। মূলত মৌলবাদী চক্রান্তের কারণেই হাসিনার পরাজয় ঘটে। রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদারিত্ব পায় ধর্ম-ব্যবসায়ী রাজনৈতিক দল। ফলে নব্বই উত্তরকালে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আপাত অর্থে চালু হয়েছিল সেখানেও একাত্তরের পরাজিত শক্তি জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এই ধরাবাহিকতায় তারা ২০০১ সালে রীতিমতো নির্বাচনের ভেল্কি দেখিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে গিয়ে উঠল গণভবনে। তাদের গাড়িতে দেশের জাতীয় পতাকা অপবিত্র হলো। জাতীয় সংসদ তো ১৯৯১ সালেই তারা অপবিত্র করবার ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল। বলাবাহুল্য ২০০১ সালে চার দলীয় জোট নামে মৌলবাদীরা মোর্চা গড়ে তুলে তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর এদেশের ৬৩ জেলায় একসাথে বোমা হামলা করে সাধারণ ও নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে। ‘বাংলা ভাই’-এর মতো জ্বলজ্যান্ত চাক্ষুস আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতাও করেছে। দেশময় সৃষ্টি হয়েছে প্রগতিচিন্তার বিরোধিতা।

অনেক বন্ধুর পথ অতিক্রম করে বাংলাদেশের মানুষ যখন যুদ্ধাপরাদীদের মানবতাবিরোধী অপকর্মের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছে তখনো এই মৌলবাদী পরাজিত শক্তি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কার্যক্রম শুরু করে যাতে করে সরকার তাদের বিচার করতে না পারে। ইতোমধ্যে গত দুই মাসে তারা দেশব্যাপী বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক কাজ করেছে এবং করছে। বিশেষত তারা এবার সরাসরি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের টার্গেট করে তাদের ওপর চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক সদস্যকে আহত ও মারাত্মক জখম করেছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর অতর্কিত এই হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা এখন সাধারণ মানুষের কাছেও আর অস্পষ্ট নয়। স্বাধীনতা বিরোধী পরাজিত এই মৌলবাদীশক্তিকে নৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি বিএনপি বাহুবলও যোগান দিয়েছে। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে যখন তারা দেশব্যাপী অবরোধ কর্মসূচি দিচ্ছে সেই কর্মসূচিকে বিএনপি সমর্থন করে রাজপথে নামছে। মূলত বিএনপির এ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক আদর্শেরই প্রতিফলন ঘটেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিজয়ের এ মাসেও জামাতের অব্যাবহত এ আক্রমণ পরোক্ষে নতুন করে স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই হুমকির নামান্তর।

স্বাধীনতা অর্জনের সাড়ে চার দশক পার করেও যদি স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি এবং প্রগতিশীল মূল্যবোধ সম্পন্ন জনগণ এদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারে তাহলে আর কোনোদিনই বাংলাদেশের মাটিতে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথাই বলতে পারবে না জনমানুষ। তাছাড়া এটাও ভেবে দেখা দরকার যে, তৃতীয় প্রজন্মের নাগরিকরা যদি ধর্মীয় মৌলবাদকে সমর্থন করে কিংবা সামগ্রিকভাবে প্রগতিচিন্তার বিরোধিতা করা হয় তাহলে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাও সম্ভব হবে না। এ প্রসঙ্গে একথাটিও ভীষণ সত্য যে, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক অতিক্রম করে এখনো এদেশের মানুষ স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ শক্তিতে বিভক্ত। এই বিভাজন নিঃসন্দেহে নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। বাংলাদেশে কিভাবে স্বাধীনতার বিপক্ষশক্তি সাড়ে চার দশক পরেও অস্তিত্বশীল থাকে তা ভাবতেও অবাক লাগে। অগ্রজদের মহানুভব রাজনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীশক্তি এখনো এদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশের তৃতীয় প্রজন্মের নাগরিকরাও যদি সেই একই ভুল করে, তাহলে এদেশের স্বাধীনতা স্পষ্টতই হুমকির মুখে পড়বে।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা না গেলে রক্ষা করা যাবে না স্বাধীনতার অর্থ এবং গণতন্ত্রের ধারা। কারণ, নেতৃত্ব পর্যায়ে যাঁদের অবস্থান তাঁরা যদি বাণিজ্যিক মনোবৃত্তি ত্যাগ করতে না পারেন, তারা যদি ব্যক্তি, দল অথবা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে না পারেন, তাহলে দেশ কোনোভাবেই এগিয়ে যাবে না সামনের দিকে; অর্জিত হবে না স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ও লক্ষ্য। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর তাই মনে রাখা দরকার, নির্বাচনের সময় বড় বড় কথা বলে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তা ভুলে গেলে চলবে না; অঙ্গীকার বা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

বিজয়ের এদিনে বাংলাদেশের একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের দৃঢ়প্রত্যয় ও অঙ্গীকার এই হোক : ‘বাংলার মাটিতে স্বাধীনতার বিপক্ষ কোনো শক্তি বা ব্যক্তির অস্তিত্ব টিকে থাকতে দেয়া হবে না।’ একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে সবংশে নির্মূল করতে হলে তাদের শক্তির উৎসকে শেকড় থেকে চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে, অন্যথায় তারা অচিরেই দেশের গণতন্ত্র তো বটেই স্বাধীনতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এজন্য বাংলাদেশের জনগণকে তাদের সংঘবদ্ধ আক্রমণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। বাংলাদেশের জনসাধারণ নিশ্চয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে সক্ষম হবে।

দুই.
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত স্বাধীনতার পর গত হয়েছে প্রায় চার দশকের অধিক সময়; এই দীর্ঘ সময়ের ওপর দৃষ্টি দিলে আমাদের পাওয়া না-পাওয়ার চিত্র সহজেই আমাদের সামনে উঠে আসে। বলার অপেক্ষ রাখে না, স্বাধীনতা এমনিতেই আসে নি; এজন্য সবুজ শ্যামল বঙ্গজননী রক্তস্নাত হয়েছে, খালি হয়েছে অসংখ্য মায়ের কোল, হারাতে হয়েছে আরো অনেক কিছু; কিন্তু এতোকিছুর পর অর্জিত স্বাধীনতা কতটা ফলদায়ক হয়েছে বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনে? আজকের বাস্তবতায় এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে রাশি রাশি হতাশা, ব্যর্থতা না-পাওয়ার তালিকা উপস্থাপন করেও শেষ করা যাবে না। কারণ, এই অন্তহীন ব্যর্থতা, না-পাওয়া কিংবা হতাশার মূলে আছে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিই কতটা সার্থক হতে পেরেছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে! ‘স্বাধীনতা’শব্দটির প্রকৃত অর্থ কিংবা তাৎপর্য দেশের সাধারণ মানুষের নিকট কতটা স্পষ্ট করা গেছে– তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ, স্বাধীনতার পর পরই স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির প্রবল উত্থানে ‘স্বাধীনতা’শব্দটিই বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। চার দশক পরেও এদেশের রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে বিভক্ত; এটা দেখলে বলাই যায়, বাংলার সাধারণ মানুষের নিকট স্বাধীনতার সুফল যেমন পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় নি, তেমনি স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্যেরও কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। কিন্তু চার দশক পরেও কেন অর্জিত স্বাধীনতার সুফল বাংলা মায়ের সকল সন্তানের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হয় নি, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে!

স্বাধীনতাকে কেন সার্থক করে তোলা যায় নি, তার ফিরিস্তি লম্বা; তা নিয়ে পৃথক প্রবন্ধ লিখতে হবে, এজন্য সময়ও লাগবে বিস্তর সময়। এখানে আমরা মোটা দাগে এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করতে পারিÑ একাত্তর সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ যখন দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডি এবং তার পর থেকে দেড় দশক এ দেশের মানুষকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে, অনেকাংশে তা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনামলের মতোই। আবার সেই গণতন্ত্র যখন নব্বইয়ে নূর হোসেন কিংবা ডা. মিলনের মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমাদের নাগালের আওতায় এলো, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই পুনরায় এ দেশের সাধারণ মানুষ তাদের ভাগ্যোন্নয়নের কথা ভেবে নতুন আশায় বুক বাঁধল।

ইতোমধ্যে আমরা সেই গণতান্ত্রিক শাসনের অধীনেও কাটিয়ে দিয়েছি দীর্ঘ দুই দশক। কিন্তু দুই দশক পরে অর্জিত গণতন্ত্রের মূল্যায়ন করা হলে স্বজনপ্রীতি দলবাজি আর ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উৎকট চেহারা ছাড়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ কিছু এ দেশের মানুষ দেখেছে বলে মনে হয় না। ফলে বলা যায়, গণতন্ত্রও এখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এই গণতন্ত্রও পারে নি; দেশের সকল নাগরিকের চিকিৎসা স্বাস্থ্য শিক্ষা বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতে। এরই ফলে স্বাধীনতা অর্জনের চার দশক পরেও এখনো স্কাইস্ক্র্যাপারের পাদদেশেই গড়ে ওঠে ঝুপড়ি ঘর, বস্তি আর চারপাশে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বিত্তহীন হতদরিদ্র মানুষের মিছিল। এই মিছিলের অন্তর্গত ধ্বনি হচ্ছে– খাবার চাই, থাকার জায়গা চাই, চিকিৎসার সুবিধা চাই, শিক্ষার অধিকার ও পরিবেশ চাই; এ ধরনের অসংখ্য দাবি।

এখানেই শেষ নয়, আছে আরো অসংখ্য অসঙ্গতি; যে ফিরিস্তি এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে দেয়া সম্ভব নয়। তারপরও একথা সত্য যে, একাত্তরে লাল-সবুজের পতাকা অর্জনের পর বিশ্বের দরবারে বাঙালি জাতির সামগ্রিক প্রাপ্তিও উল্লেখ করার মতো। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পোশাক শিল্পে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, আমাদের দেশ ক্রিকেট খেলায় এলিট দেশগুলোর সাথে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এমনকি ২০১১ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অন্যতম আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করেছে সফলভাবে।

বাংলাদেশের অনেক নাগরিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে; গড়ে উঠেছে সেখানে বাঙালি কমিউনিট। কোনো কোনো দেশের রাজনীতিতেও সক্রিয় অংশ গ্রহণ করছে বাঙালি। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে পক্ষান্তরে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের-ই ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন তারা। এ দেশের অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রী বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। উল্লেখ্য, অতি সম্প্রতি এ দেশের কৃতী সন্তান মুসা ইব্রাহিমের এভারেস্ট বিজয়ের কৃতিত্বে বিশ্বের মানুষ আরো একবার জেনেছে বীর বাঙালির গৌরবগাথা।

এখন বাংলাদেশে উন্নত দেশগুলোর মতো কিংবা তাদের চেয়েও উন্নত চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর আদলে গড়ে উঠেছে আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার যে, স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পার হওয়ার পরও আমাদের দেশের সরকার একটি সুষ্ঠু ও সার্বজননী শিক্ষানীতিমালা জাতিকে দিতে পারে নি। কুদ্রত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের পর অনেকগুলো শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে, তাঁরা কাজও করেছেন কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে– স্বাধীনতার চার দশক পর, আজো আমাদের সামনে সুষ্ঠু একটি শিক্ষা নীতিমালা নেই। এদিকে ১৯৯২ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন চালু হওয়ার পর দেশে প্রায় শতাধিক বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; অবশ্যই তা প্রয়োজনের তাগিদেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অথচ এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নেই সরকারি কোনো সুষ্ঠু নীতিমালা; যা আছে, তা কোনো কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারছে না, অসৎ কর্মকর্তা এবং অসাধু লোকজনের দৌরাত্ম্যে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় আন্তরিকভাবে এ বিষয়ে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন; আশাকরি তিনি সকলকে সাথে নিয়ে, সকলের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একটি নীতিমালা প্রণয়ন করবেন। তিনি ইতোমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরিও করেছেন, কিন্তু অদ্যাবধি তা বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর আরোপ করতে পারেন নি। প্রসঙ্গত স্মরণ রাখা দরকার যে, জাতিকে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব না হলে কোনোভাবেই একটি উন্নয়নকামী দক্ষ জনগোষ্ঠী যেমন তৈরি করা সম্ভব হবে না, তেমনি দেশের সাধারণ নাগরিকের উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে না। কারণ, ‘এডুকেশন ইজ দ্য ব্যাকবোন অব এ্যা নেশন’।

স্বাধীনতার সুফল বা বিজয়ের সুফল জনসাধারণের দোরগোঁড়ায় পৌঁছে দিতে হলে সুষ্ঠু শিক্ষানীতির যেমন দরকার তেমনি দরকার সুস্থ রাজনীতি চর্চারও। বর্তমানে মেধাশূন্য যে ধারার রাজনীতিচর্চা দেশে চলছে এবং রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে বাণিজ্য; অথবা রাজনীতিতে যে দুর্বৃত্তায়ন চলছে, তা অবশ্যই দেশের স্বার্থে জনগণের স্বার্থে সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায়, দেশ ক্রমাগত এক শূন্যতায় আটকে পড়বে, যে শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে বেরিয়ে আসা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা না গেলে রক্ষা করা যাবে না স্বাধীনতার অর্থ এবং গণতন্ত্রের ধারা। কারণ, নেতৃত্ব পর্যায়ে যাঁদের অবস্থান তাঁরা যদি বাণিজ্যিক মনোবৃত্তি ত্যাগ করতে না পারেন, তারা যদি ব্যক্তি, দল অথবা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে চিন্তা করতে না পারেন, তাহলে দেশ কোনোভাবেই এগিয়ে যাবে না সামনের দিকে; অর্জিত হবে না স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ ও লক্ষ্য। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর তাই মনে রাখা দরকার, নির্বাচনের সময় বড় বড় কথা বলে জনগণের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তা ভুলে গেলে চলবে না; অঙ্গীকার বা নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করতে হবে। স্বজনপ্রীতি, ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয়করণের নীতি ত্যাগ করতে হবে, তা করা না গেলে কোনো দলই ক্ষমতায় আসীন হয়ে ঘোষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না; নির্বাচনী ইশতেহারের বড় বড় কথা কিংবা দেশ গড়ার স্বপ্নগুলো আতুরঘরেই মরে যাবে! এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়ানোর, জনগণের কথা ভাবার, সকলের কাছে স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার। অন্যথায় প্রতিবছর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে টেবিল চাপড়ে বক্তৃতা দিয়ে, সেমিনার সিম্পোজিয়াম করে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য থেকে দূরেই সরে যেতে হবে। অতএব বিগত সাড়ে চার দশকে ঘটে যাওয়া ভুলত্রুটির হিসেব কষে এখনই উচিত সামনে এগিয়ে যাওয়ার– শপথ নেয়া।

অনুপম হাসান : শিক্ষক ও গবেষক।