Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • রাজশাহী হবে ভিন্নধর্মী মহানগরী: বাদশা– বিস্তারিত....
  • বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা– বিস্তারিত....
  • পাকিস্তানের সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর গুলিতে দুই ভারতীয় সেনা নিহত– বিস্তারিত....
  • ফেইসবুক প্রোফাইল পিকচার ডাউনলোড পদ্ধতি বন্ধ– বিস্তারিত....
  • মোহনপুরে সড়ক দুঘর্টনায় গবেষক মনসুর নিহত– বিস্তারিত....

বামশক্তি কনসোলিটেড হয়ে দাঁড়াতে না পারলে ফিল ইন দ্য ব্লাংক করে ফেলবে ধর্মীয় শক্তি : আবুল বারকাত

ডিসেম্বর ১০, ২০১৬

ড. আবুল বারকাত ‘গণমানুষের অর্থনীতিবিদ’ হিসেবে খ্যাত। বাংলাদেশের প্রগতিশীল অর্থনীতিবিদদের অন্যতম। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক লিমিটেড এর পরিচালনা পর্ষদের সাবেক চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার, কালো টাকা, মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের অর্থনীতি, কৃষি সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে তার রয়েছে ব্যতিক্রমী গবেষণা। বিশ^ব্যাংক-আইএমএফ তথা সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার কলম ও কণ্ঠ বিরতিহীন সোচ্চার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ‘দিন বদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নে তিনি অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন। সম্প্রতি তিনি যশোরে স্থানীয় দৈনিক সত্যপাঠ এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির যৌথ আয়োজনে একটি সেমিনারে যোগ দিতে গেলে তার মুখোমুখি হন ওই সেমিনারের আয়োজক কমিটির অন্যতম সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল। সাক্ষাৎকারে ড. আবুল বারকাত বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল, সরকারের ভূমিকা এবং চলমান বিভিন্ন ইস্যুর উপর কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি সাহেব-বাজার২৪.কমের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।

মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল : মধ্যম আয়ের দেশ বা দিন বদলের স্লোগানের সাথে আমাদের সরকার যে উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করছে সেখানে সঙ্গতি এবং অসঙ্গতি সম্পর্কে বলুন।
ড. আবুল বারকাত : এমনি ইনফ্রা স্ট্রাকচার রিলেটেড বা অবকাঠামো যা আছে, শিল্প সম্পর্কে যা বলা ছিলো, দিনবদলের অঙ্গীকার বা মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার জন্য যা লাগে ব্রিজ, কালভার্ট, বিদ্যুৎ, রাস্তা– এই নিরিখে খারাপ না। কিন্তু মূল কথা যেটা ছিলো, ‘মধ্যম আয়ের দেশ’– কথাটা কিন্তু ছিলো না, ছিলো ‘কম বৈষম্যের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ’। শুধু মধ্যম আয় না। মধ্যম আয় তো সোজা কথা, টোটাল জিডিপিকে পপুলেশন দিয়ে ভাগ করা। এই পপুলেশনের কার কাছে কতোটুকু পৌঁছালো সেটা এর মধ্যে নেই। সেই কারণে দিন বদলের সনদের মধ্যে খুব সচেতনভাবেই লেখা হয়েছিলো ‘কম বৈষম্যপূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশ’। বৈষম্য কমছে না। এটা হচ্ছে মূল কথা। অবকাঠামোগত দিক থেকে অনেক কিছুই ঘটছে, যেটা উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু বৈষম্য হ্রাসের জন্য যা যা করণীয় সেগুলোর অনেক কিছুই বলা আছে, অনেক কিছুই প্লানিং কমিশনের ডকুমেন্টে… অনেক জায়গায় বলা আছে, কিন্তু সেগুলো হচ্ছে না।

কাবুল : এজন্য কোথায় কোথায় হাত দিতে হবে?
বারকাত : এখানে বড় ধরনের শিল্পায়ন এবং কৃষিভূমি ও জলা সংস্কার– নিঃসন্দেহে এটা করতেই হবে। না হলে হবে না। বৈষম্য কমবে না এগুলো না করলে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশে কম্পারেটিভ এ্যাডভ্যান্টেজ যেগুলোতে আছে, তাতে তুলনামূলক সুবিধা অন্যদের তুলনায় কারণ বিশ্বায়নের এই যুগে কমপিট করতে হবে। হোলসেল প্রাইভেটাইজেশান উত্তর না কিন্তু। যা পাওয়া যাবে তাই বিরাষ্ট্রীয়করণ করা– তা নয়। বরঞ্চ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন যেসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে, যেমন- পাটকল ইত্যাদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এ্যাকটিভলি পরিচালনা করা উচিত।

কাবুল : এখান থেকে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, যেটা সেমিনারে আপনার বক্তব্যে আপনি বলেছেন, কৃষি সংস্কার সম্পর্কে খুব কম বলা হয়েছে, ভূমি সংস্কার সম্পর্কে বলা হয়েছে বেশি– এটা ঠিক আছে। একই সময়ে আমরা যেটা লক্ষ্য করি…
বারকাত : (থামিয়ে দিয়ে) ভূমি সংস্কার সম্পর্কে কথা হয়েছে, কিন্তু কাজ হয় নি। কৃষি সংস্কার নিয়ে তো কোনো কথাই তেমন হয় নি। কিন্তু ভূমি সংস্কার নিয়ে কথা হয়েছে, কাজ হয় নি। যেমন ‘দিন বদলের সনদে’ ভূমি সংস্কার নিয়ে কথা ছিলো এরকমÑ ভূমি সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। সময়টা ২০০৯। সব কমিশনই হয়েছে, এই একটা কমিশন কিন্তু হয় নি। এটা কী সচেতনভাবেই হয় নি নাকি… সচেতনও হতে পারে, কারণ ভূমি সংস্কার কমিশন গঠন করলে কাজটাও করতে হবে। আর ভূমিতে হাত দেয়া, আমি আগেও বলেছি, আগুনে হাত দেয়া– একই রকম জিনিস। ক্যাডার বেজড্ পলিটিক্স ছাড়া ভূমি সংস্কার সম্ভব না, কৃষি সংস্কার সম্ভব না।

কাবুল : আমরা দেখেছি, আশির দশক থেকে প্রধানত ‘কাঠামোগত সংস্কারের’ নামে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এর পরামর্শে আমাদের দেশে ব্যাপক বি-শিল্পকরণ হয়েছে। এই গভর্নমেন্ট বলেছিল, এইগুলো তারা আবার স্থাপন করবে, কিন্তু সেটা আমরা লক্ষ্য করছি না। তাহলে কৃষিখাতের এই অবস্থা, শিল্পের এই অবস্থা, সে ক্ষেত্রে ‘ডেভেলমেন্ট’ বলতে আমরা যেটা বুঝি, যেটা আপনি বললেন, সবার শেয়ারিং সেটা আসলে হবে কী না?
বারকাত : হবে না। আমি উত্তর দিয়েছি, সেটা হবার জন্য একটি রাজনৈতিক কাঠামো দরকার। যদি তাই হতো, তাহলে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর তো একথা বলতেন না যে, ‘সরকার কই? রাজনীতি কই? এটা কোন সরকার আছে?’ বলতে বলতে তিনি বললেন, ‘সরকার আওয়ামী লীগের না, শেখ হাসিনার সরকার।’ তার মানে কী? গুরুতর কথাবার্তা বললেন তিনি।

কাবুল : আপনি যেটাকে বলছেন যে, ‘ফ্রি ইকোনমি’ বলতে যেটা বোঝায় ঠিক সেটা হয়নি– বিকৃত…
বারকাত : মুক্তবাজার অর্থনীতি বললে যা বোঝায়, প্রথমত মুক্ত বাজার অর্থনীতি ইতিহাসে কখনোই কোনোদিনও মুক্তও ছিলো না, দরিদ্রবান্ধবও ছিলো না। নেইদার ফ্রী নর পুওর ফ্রেন্ডলি। সেই মুক্তবাজারের মধ্যে আবার, আমি যেটা দেখাতে চেষ্টা করেছি, ‘রেন্ট সিকাররা’ (অবৈধ সম্পদ আহরণকারী) সব করে। সেটা তো হাইলি ডিসপুটেড। আবার রেন্ট সিকারদের বস হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিকভাবে একদম সাম্রাজ্যবাদকে যারা হ্যান্ডল করে তাদের এজেন্ট হিসাবে। এতো কিছু চুঁইয়ে পড়ে লাস্টে গিয়ে আমি ভূমি সংস্কার করবো, বৈষম্যহীন করবো– একটুও হবে না। যেখানে পেলা হিসাবে তারা অনেক জিনিস তৈরি করে, যেমন গ্রামীণ ব্যাংক– এরকম অনেক পেলা আছে তাদের।

কাবুল : প্রাকটিক্যালি আপনি যে কথা বলেছেন যে, ফ্রি ইকোনমি কখনোই ফ্রি ছিলো না। গত শতকের গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় জেএম কেইনস যখন গভর্নমেন্ট ইন্টার ফেয়ারন্সের (সরকারি হস্তক্ষেপ) কথা বলেন, তখন অনেকেই তাকে মার্কসবাদী বলে ‘গালি’ দিয়েছিলেন।
বারকাত : না, ইতিহাসে কখনোই ছিলো না। … হ্যাঁ, বলা হয়ে থাকে যে, দেয়ার আর টু মার্কর্স। ওয়ান ইজ কার্ল মার্কর্স যিনি ক্যাপিটালিজম ধ্বংস করার কাজ করেছেন, এ্যানাদার ইজ জন মেনার্ড কেইনস– সেকেন্ড মার্কস যিনি ক্যাপিটালিজমকে ধ্বংসাবস্থা থেকে উদ্ধার করেছেন এবং ডিটারমিনেশান্স পলিসি দিয়েছেন।

রামপাল নিয়ে যে বিষয়টা আমি কোনো কিছুই পাচ্ছি না, সেটা হলো, পশুর নদী দিয়ে দেড়শ’ দু’শ ট্রলার যায়, জাহাজ যায়। রুজভেল্ট সেতু পর্যন্ত আসে। কয়লা আনার প্রসঙ্গ যখন আসবে, তখন তো এই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। দুইশ’ ট্রলার-জাহাজ যদি আসে তার সমস্যা আছে। ট্রলার-জাহাজের সাউন্ড আছে। এগুলো সুন্দরবন দিয়েই আসবে। এগুলো সুন্দরবনকে কিভাবে এ্যাফেক্ট করবে, তার জীববৈচিত্র্যের কী হবে না হবে, এই নিয়ে খুব সিরিয়াস কোনো কথাবার্তা কিন্তু নেই।

কাবুল : তাহলে আমরা কি একথা বলতে পারি, সেই সূচনা থেকেই এ পর্যায় পর্যন্ত মুক্তবাজার অর্থনীতির চরিত্রে মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয় নি?
বারকাত : না, না কোনো পরিবর্তন হয় নি।

কাবুল : যে কৃষি ও শিল্পের কথা আমরা বললাম জাতীয় আয়ে তার অবদান তো কম।
বারকাত : না, না। কৃষির কম এটা ভুল। এটা হচ্ছে সরকারি কথা। আমাকে সঠিক কথাটাই বলতে হবে। কৃষি পণ্যের মূল্যটা হিসাব করেই তো জিডিপিতে যোগ করে। বাংলাদেশে কৃষি পণ্যের মূল্য সবসময় ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমোডিটির তুলনায় সচেতনভাবে তলার দিকে রাখা হয়। তো মূল্যটা যদি এ্যাডজাস্ট করা হয়, কৃষি পণ্যের রিয়াল মূল্য যতো হবে, সেইটা এ্যাডজাস্ট করে যদি জিডিপি হিসাব করা হয় তাহলে কৃষিতে জিডিপির যে অবদান দেখানো হয় তা দ্বিগুণ বাড়বে।

কাবুল : কিন্তু আমরা এখানে দেখি যে, গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি এবং আমাদের…।
বারকাত : (আবার থামিয়ে দিয়ে) এটা তো সরকারি তথ্য… সরকারি তথ্য! আমি তথ্যটাকেই চ্যালেঞ্জ করছি। কৃষির অবদান বলতে যে পার্সেন্টেজটা দেখানো হয়, মিনিমাম তার দ্বিগুণ হবে যদি কৃষিপণ্যের প্রাইস কম্পেয়ার টু শিল্প পণ্য। কারণ কৃষক তো শিল্প পণ্য কেনে। কৃষক তো সার কেনে। এটা তো কৃষি পণ্য না। কৃষক তো সেচের যন্ত্র কেনে, এটা তো কৃষি পণ্য না। সেইগুলোর দাম কেন বেশি? আর তা দিয়ে যে পণ্যসেবা কৃষকরা দেয় তার দাম কেন তুলনামূলকভাবে কম? দামের সমীকরণ যদি আমি ধরি, তাহলে কৃষিপণ্যের দামটা যা হয় সেই দামটা তার দাম না। তার অন্তর্নিহিত মূল্যে দ্বিগুণ বেশি। তাই যদি হয়, কৃষিপণ্যের জিডিপিতে যে শেয়ার দেখানো হয় সে শেয়ার তো দ্বিগুণ বেশি।

কাবুল : সেমিনারের বক্তব্যে আপনি যে ‘ট্রায়ঙ্গলের’ কথা বলেছেন সেখান থেকে এটা পরিষ্কার যে, করাপশান নির্মূল বা গুড গভর্নেন্সের যে কথা আমরা বলি সেটা আসলেই এ অবস্থায় সম্ভব না।
বারকাত : এ ট্রায়ঙ্গল রেখে হবে না। দুটিকে ভাঙতে হবে। ভেঙ্গে ‘সরকার-রাষ্ট্র’ এবং ‘রাজনীতি’ মাথায় নিয়ে ‘রেন্টসিকা’তলায় নিতে হবে। ট্রায়ঙ্গলটা এরকম আছে– উপরে রেন্টসিকার, নিচে স্টেট ও সরকার এবং পলিটিক্স। এই ট্রায়ঙ্গলটা এরকম হতে হবে, স্টেট-সরকার ও রাজনীতি এখানে (উপরে) থাকবে আর রেন্টসিকাররা তার অধীনস্ত থাকবে। এখন রেন্টসিকারদের অধীনস্ত সবাই, ওরা যা বলে তাই-ই হয়।

কাবুল : তাহলে তো যে পলিটিক্স এখন আছে তা রিপ্লেস করে অন্য পলিটিক্স আনতে হবে।
বারকাত : এখন প্রশ্ন যদি এমন হয়, যারা রাজনীতি করছেন এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা এটা পারবে কি না– এই তো ? আমার মতে, পারবেন না। তারা যেটা পারবেন, বিভিন্ন রকম ছোটখাটো পেলা-টেলা দিতে পারবেন। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য সোশ্যাল সেফটি প্রোগ্রাম আছে ৯৪টা। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, অমুক তমুক ইত্যাদি। আমি হিসাব করে দেখেছি যে, এইসব ভাতা ওই যে বিধবা বা বয়স্কদের দেয়া হয় তার যা আয় সেই আয়ে এই ভাতাগুলো যোগ করলে তার দারিদ্রবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয় না, কাছাকাছিও যায় না।

কাবুল : আপনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন পাঁচ বছর প্রায়। আমাদের দেশে পাবলিক সেক্টর এবং প্রাইভেট সেক্টরে অনেকগুলো ব্যাংক আছে। অনেকেই সরকারি ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো ঢালাওভাবে করেন, যেগুলো আপনার জানা আছে। আপনার অভিজ্ঞতায় কী বলে?
বারকাত : যারা সরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং যারা করান, অভিযোগ তো আসে মিডিয়া থেকে। তাই তো? ওই মিডিয়ার মালিক যারা তারা সবাই সরকারি ব্যাংকের টাকা মেরে মালিক হয়েছেন বেশিরভাগ। লিখে দেন, আমার নাম দিয়েই লিখে দেন। যারা অভিযোগগুলো করেন, মিডিয়ার মাধ্যমে অভিযোগগুলো আপনাদের কাছে আসে। পত্রিকা বা টেলিভিশন থেকে আপনাদের কাছে আসে। এটা তো আকাশ থেকে আসে না, এইসব কিছু এবং মিডিয়াগুলোর যারা মালিক তারা প্রায় সবাই সরকারি ব্যাংকের টাকা মেরে মালিক। এখন এই সেন্স-এ যদি হয় তাহলে সরকারি ব্যাংকের তুলনায় ওরা এফিসিয়েন্ট, টাকাটা মেরে দিতে পারেন। এইটার বিরুদ্ধে আমরা বলতে পারি। দ্বিতীয়ত সরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে বলার নাই, তার কারণ হলো– ৫৬টি ব্যাংক। এই ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে যদি সরকারি ব্যাংক ইনএফিসিয়েন্ট হয়, অদক্ষ হয় তাহলে জনতা ব্যাংক কী করে ২০১২-১৩ সালে সর্বোচ্চ অপারেটিং প্রফিট এবং নেট প্রফিট করলো? এটা তো রাষ্ট্র-মালিকানাধীন ব্যাংক। তার মানে, পারে। হয়তো করে না। কথাটা এই জায়গায়, আমার ধারণা, পারে কিন্তু করে না। জনতা ব্যাংক কেন পারলো ৫৬টা ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ অপারেটিং প্রফিট, নেট প্রফিট, সিএসআর– তার কারণ ব্যাংকের টপে যারা থাকেন– একজন না, একাধিক ব্যক্তি, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ম্যানেজমেন্ট। আমি মনে করি ব্যাংকের একেবারে টপ যিনি থাকেন, তার ব্যক্তিগত কোনো ইন্টারেস্ট যদি না থাকে, চেয়ারের প্রতি যদি মোহ না থাকে এবং তার যদি স্বকীয়তা থাকে এবং তিনি যদি অনেস্ট হন এবং তিনি যদি একটু জ্ঞানসমৃদ্ধ হন, ভাল হয়। এতোগুলো গুণ একসঙ্গে পাওয়া কঠিন, হলে ভাল।

কাবুল : ব্যাংক সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্ন– সারা দুনিয়াব্যাপী যে আলোচিত ঘটনা, আমাদের সেন্ট্রাল ব্যাংকের টাকা আত্মসাতের ঘটনা, ড. ফরাসউদ্দীনের নেতৃত্বে তার যে তদন্ত রিপোর্ট তা প্রকাশ হচ্ছে না কেন?
বারকাত : বিষয়টি সারা দুনিয়াব্যাপী আলোচিত হচ্ছে না। এটা বাংলাদেশে হচ্ছে, বাইরে কোথাও হচ্ছে না। কারণ সারা দুনিয়াতে এটা ঘটছে। আমি যেটা শুনেছি, সেটা হচ্ছে যে, ড. ফরাসউদ্দীন সাহেবের রিপোর্টের মধ্যে যা আছে তাতে সেন্ট্রাল ব্যাংকের অনেককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা আদৌ কোনোভাবে জড়িত না। পাশাপাশি সিআইডি যে রিপোর্টটা করেছে, সেই রিপোর্টের মধ্যে ফরাসউদ্দীন সাহেব যেসব নাম দিয়ে অভিযোগ করছেন, সেই অভিযোগগুলো ওখানে নেই। এখন সিআইডির রিপোর্টটা গ্রহণযোগ্য হবে না ফরাসউদ্দীন সাহেবেরটা হবে। আমার মতে, দুইটার কোনোটাই গ্রহণ না করে দুটো রিপোর্টই বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ডে দিয়ে দেয়া উচিত। বোর্ড জনগণকে জানিয়ে দিক, ঘটনাটা কী। আর ফরাসউদ্দীন সাহেবের রিপোর্টে যদি অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকজনদেরকে তা হলে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ফেরত পাবে না, বাংলাদেশ ফেরত পাবে না। কারণ বিদেশি সুইফট এবং রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংক যারা আছে, তারা বলবে, তোমাদের লোকজনই জড়িত, আগে এদের ঠিক কর।

কাবুল : এই মুহূর্তের বার্নিং ইস্যু রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে যে বিতর্ক হচ্ছে এক্ষেত্রে আপনার অবস্থান বা মনোভাব কোন দিকে?
বারকাত : রামপাল নিয়ে দুটি এক্সট্রিম পক্ষ তৈরি হয়েছে। সরকার এবং তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি– শহীদুল্লাহ ভাই-আনু ভাইয়েরা, কেউই স্পষ্ট করে বুঝাতে পারছেন না– এখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কী ক্ষতি হবে। কারণ বাতাসের যে গতি– এ গতির ৯ মাস বাতাসটা সুন্দরবনের দিকে যায় না, অন্যদিকে যায়। ৩ মাস সুন্দরবনের দিকে যায়। তো ১২-১৪ কিলোমিটার পথ। ১০০ সেন্টিগ্রেড ওই চিমনির মাথায়। বিজ্ঞানীরা বলেন যে, এক কিলোমিটার-দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর ওটা ৫০, ৩০, ২০ সেন্টিগ্রেড হয়। এটা কতদূর ঠিক-বেঠিক আমরা জানি না। কিন্তু এ কথাগুলো শুনছি। এখন বেস্ট হতো প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই যেগুলো করেন, যদি প্রতিপক্ষ সবাইকে ডেকে বলতেন, উন্মুক্ত কনভেনশনে আমরা একদিন আলাপ করবো। আমার লোকজনেরা, আপনারা যারা– আসেন আমরা বাহাস করি এবং এ বাহাসটা (মিডিয়ায় এতোকিছু দেখান) সারাদিন দেখাতেন। দেখিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছাতেন। জনগণও একটা জিনিস পেতো। জনগণও তো বুঝতে পারছে না, আসলে ঘটনা কী। রামপাল নিয়ে যে বিষয়টা আমি কোনো কিছুই পাচ্ছি না, সেটা হলো, পশুর নদী দিয়ে দেড়শ’ দু’শ ট্রলার যায়, জাহাজ যায়। রুজভেল্ট সেতু পর্যন্ত আসে। কয়লা আনার প্রসঙ্গ যখন আসবে, তখন তো এই সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। দুইশ’ ট্রলার-জাহাজ যদি আসে তার সমস্যা আছে। ট্রলার-জাহাজের সাউন্ড আছে। এগুলো সুন্দরবন দিয়েই আসবে। এগুলো সুন্দরবনকে কিভাবে এ্যাফেক্ট করবে, তার জীববৈচিত্র্যের কী হবে না হবে, এই নিয়ে খুব সিরিয়াস কোনো কথাবার্তা কিন্তু নেই। সেটা সম্ভবত ইউনেস্কো তার রিপোর্টে বলছে যে, এনভায়রনমেন্ট নিয়ে আ্যাসেসমেন্টে যা বলা হয়েছে তা অসম্পূর্ণ এবং তাতে কোনো কিছু নেই। সুন্দরবন তো প্রোক্রিয়েট করা যাবে না, পুনরায় তৈরি, বিনির্মাণ করা সম্ভব না। এটা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। অতএব, সুন্দরবনের মিনিমাম ক্ষতি হয় এমন কোনো কিছু সে অঞ্চলে না করা বেটার। বিতর্কেই যাওয়ার দরকার নেই। যদি অন্য কোনো জায়গায় (বাংলাদেশে জায়গার অভাব নাকি?)…। অনেকেই সুন্দরবন থেকে দশ কিলোমিটার দূরে যাবার কথা বলছেন। বদরুদ্দীন উমরের পত্রিকায় দেখলাম সুন্দরবন থেকে দশ কিলোমিটার দূরে যাবার কথা বলছেন। এদিকেই বা কেন ? আর এ অঞ্চলে তো দেখা যাচ্ছে অনেক জায়গা আছে। কোল-বেজড্ পাওয়ার প্লান্ট নিয়েও কথাবার্তা হতে হবে। কারণ কোল-বেজড্ পাওয়ার প্লান্ট ক্লিন কি না। ইন্ডিয়াতেও কোল-বেজড্ পাওয়ার প্লান্ট অনেক জায়গায় বন্ধ হয়ে গেছে। এটা সামগ্রিকভাবে ভাবা দরকার। দ্রুত ৩ হাজার মেগাওয়াট, ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা দরকার– এটা যেমন সত্য, এ্যাট দ্যা সেম টাইম এটা আনার ফল কী ঘটবে, নেকস্ট জেনারেশন… সেটা তো ভাবতে হবে। সেই ভাবনাগুলোই তো এনভায়রনমেন্ট এ্যাফেক্ট এ্যাসেসমেন্টে আসে। সেগুলো প্রো-পাবলিক তো করা হয় নি তেমন। দুই পক্ষের মূল প্রসঙ্গ প্রো-পাবলিক করা, দুই পক্ষ বসে মারামারি না করে, এমন যদি হয়, সরকারের বিপক্ষে যে পক্ষ, রামপালে বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা যাবে না, তাদের পয়েন্টগুলোও পরিষ্কার করা দরকার। তাদের অনেক পয়েন্টে স্লোগানিস্টিক। এতে স্লোগান স্লোগান ভাব বেশি। মানুষ গ্রহণও করছে। মানুষ স্লোগান তাড়াতাড়িই গ্রহণ করে। যুক্তির কথা গ্রহণ করতে একটু দেরি হয়। প্রধানমন্ত্রী যেটা করছেন, সেটা হলো এক ধরনের একগুয়েমি যে, এখানে করবোই– এরকম একটা ভাব। এইটারও খুব প্রয়োজন নেই। আপনি যখন দেশের প্রাইম মিনিস্টার হন, আপনার দেশপ্রধান হওয়া উচিত। কে আপনাকে কী বললো, কে গালি দিলো– এগুলো বিষয় হওয়া উচিত না। এখানে অনেকটা এরকম হয়ে গেছে। এক পর্যায়ে তো প্রশ্নই করছেন– ‘আপনারা এই যে স্লোগান দিচ্ছেন, মিটিং করছেন, টাকা কই পান?’ এটার আবার তারা উত্তরও দিয়ে দিয়েছেন– ‘আমরা ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে টাকা যেখানে পেয়েছি, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে টাকা যেখানে পেয়েছি… আমরা জনগণের টাকায় করি। আমরা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে টাকা যেখান থেকে পেয়েছি, টাকা সেখান থেকে পাই’– এটাও বলছেন। তো এই প্রশ্নও করার দরকার ছিলো না, এই উত্তর শোনাবারও দরকার ছিলো না।

গ্রামে, শহরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সব জায়গায়। এবং তারা কিন্তু একটা আইডোলোজিক্যাল পার্টি। মানে দুই রকম টুপি আছে, লাল টুপি আর সাদা টুপি– মাঝখানে আর কিছু নেই, কিউবা আর ইরান। এখানে আমার যেটা ভয়, যদি প্রগতিশীল শক্তি-বাম বলেন আর যাই বলেন, যদি কনসোলিটেড হয়ে দাঁড়াতে না পারে সেই ফিল ইন দ্য ব্লাংক করে ফেলবে ধর্মীয় শক্তি এবং তাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা তাদের হয়েও যেতে পারে। তখন হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

কাবুল : বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতির উপর একমাত্র আপনারই গবেষণা আছে– এ সম্পর্কে কিছু বলুন।
বারকাত : (সর্বশেষ ২৯ আগস্ট ২০১৬ তারিখে প্রকাশিত নিজের গবেষণাপত্র ‘বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী জঙ্গিত্বের রাজনৈতিক অর্থনীতি : এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্যবাদে যখন বহিস্থঃ কারণ অভ্যন্তরীণ কারণকে ছাপিয়ে যায়’ কে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখ করে) বাংলাদেশে এখন ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির সহায়তায় মৌলবাদ যেসব আর্থ-সামাজিক মডেলের তুলনামূলক কার্যকারিতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে তার মধ্যে ১২টা বৃহৎ বর্গ হলো এরকম: (১) আর্থিক প্রতিষ্ঠান, (২) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, (৩) ঔষধ শিল্প ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, (৪) ধর্ম প্রতিষ্ঠান, (৫) ব্যবসায়িক-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, (৬) যোগাযোগ-পরিবহন ব্যবস্থা সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান, (৭) জমি ও রিয়েল এস্টেট, (৮) সংবাদ মাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তি, (৯) স্থানীয় সরকার, (১০) বেসরকারি সংস্থা, ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন, (১১) ইসলামী জঙ্গি সংগঠন (যেমন বাংলাভাই, জেএমবি, হুজি-বি এবং অনুরূপ কর্মসূচিভিত্তিক সংগঠন/সংস্থা/গ্রুপ এবং (১২) কৃষক-শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সমিতির কর্মকাণ্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। এ সব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই আনুষ্ঠানিক অর্থে মুনাফা অর্জনযোগ্য প্রতিষ্ঠান নয় (যেমন– স্থানীয় সরকার ও পেশাজীবী সমিতি)। এক্ষেত্রে ক্রসভর্তুকি দেয়া হয় এবং সেই সাথে মুনাফা-অযোগ্য প্রতিষ্ঠানেও তারা উচ্চ মুনাফা করেন (যেমন বাংলাভাই জাতীয় প্রকল্প যেখানে ভূমি খাজনা, চাঁদাবাজি প্রতিষ্ঠা করা হয়; এমনকি কোনো কোনো অঞ্চলে মাদ্রাসাতেও অত্যুচ্চ মুনাফা অর্থাৎ বছর শেষে ব্যয়ের চেয়ে আয় বেশি হয়)। মানুষের ধর্মীয় আবেগ অনুভূতি ব্যবহার করে আপাত দৃষ্টিতে মুনাফা-অযোগ্য প্রতিষ্ঠানে মুনাফা সৃষ্টির নিরঙ্কুশ তুলনামূলক সুবিধা তাদের আছে)।
মৌলবাদের অর্থনীতির ওইসব মডেলসমূহের ব্যবস্থাপনা-পরিচালন কৌশল সাধারণ ব্যবসা-বাণিজ্যের-নীতিকৌশল থেকে অনেক দিক থেকে ভিন্ন। তাদের অর্থনৈতিক মডেল পরিচালন কৌশলের অন্যতম কয়েকটি বৈশিষ্ট্য এরকম:
১. প্রতিটি মডেলই রাজনৈতিকভাবে উদ্বুদ্ধ উচ্চমানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ কর্তৃক রাজনৈতিক লক্ষ্যার্জনে নিয়োজিত।
২. প্রতিটি মডেল বহুস্তর বিশিষ্ট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয় যেখানে নির্দিষ্ট স্তরের মূল নীতি নির্ধারণী কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনস্ত।
৩. বিভিন্ন মডেলের মধ্যে কো-অর্ডিনেশন থাকলেও উচ্চ স্তরের কো-অর্ডিনেটরদের পরস্পর পরিচিতি যথেষ্ট গোপন রাখা হয় (এক ধরনের গেরিলা যুদ্ধের রণনীতি বলা চলে)।
৪. প্রতিটি মডেলই সামরিক শৃঙ্খলার আদলে পরিচালিত সুসঙ্গবদ্ধ-সুশৃঙ্খল ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠান।
৫. কোনো মডেল যখনই আর্থ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে অন্য মডেলের তুলনায় অধিক ফলপ্রদ মনে করা হয় তখনই তা যথাসাধ্য দ্রুত অন্য স্থানে বাস্তবায়িত করা হয়।
সুতরাং এ কথা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, মৌলবাদীরা তাদের অর্থনৈতিক মডেল বাস্তবায়নে ‘রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে’ রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ সচেতন এবং তা বাস্তবায়নে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে তারা তাদের মতো করে ঢেলে সাজাতে সচেষ্ট। এ থেকে এও প্রতীয়মান হয় যে, মৌলবাদের মূলে আছে ভীতি ও আবেগ। আর এ আবেগ আসে ক্রমবর্ধমান অসমতা থেকে তথাপি এসব আবেগানুভূতি কেবল সেকেলে এবং পিছুটান নয় বরং তারা সৃজনশীল ‘আধুনিকতা’র ধারক বাহকও।
এ দেশে সশস্ত্র ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর বিদেশি অর্থ প্রাপ্তির বিভিন্ন উপায় থাকতে পারে বা আছে। তবে ইতোমধ্যে তারা নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তারা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে জনগণের সম্পদ হরিলুট করেছে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনে ১৯৭০-৮০’র দশকে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক অর্থ সরবরাহ পেয়েছে; এসব অর্থ সম্পদ তারা সংশ্লিষ্ট আর্থ-রাজনৈতিক মডেল গঠনে বিনিয়োগ করেছে; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিনিয়োজিত প্রতিষ্ঠান উচ্চ মুনাফা করেছে; আর এ মুনাফার একাংশ তারা ব্যয় করছে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে, একাংশ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রসারে, আর (কখনও কখনও) একাংশ নতুন খাত-প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিতে।
আমার ২০১৫ সনের হিসেবে বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতির বার্ষিক নিট মুনাফা আনুমানিক ২,৮৭৪ কোটি টাকা। এ মুনাফার সর্বোচ্চ ২৭.৮ শতাংশ আসে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে (ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি); দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯.৪ শতাংশ আসে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাসহ ট্রাস্ট ও ফাউন্ডেশন থেকে; বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসে ১০.৬ শতাংশ; ঔষধসহ ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে আসে ১০.০ শতাংশ; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসে ৯.৪ শতাংশ; জমিসহ রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে আসে ৮.০ শতাংশ; সংবাদ মাধ্যম ও তথ্য প্রযুক্তি থেকে আসে ৭.৪ শতাংশ, আর পরিবহন-যোগাযোগ ব্যবসা থেকে আসে ৭.৪ শতাংশ। নিট মুনাফার এ প্যাটার্ন কিছুটা অনুমাননির্ভর হলেও যথেষ্ট দিক নির্দেশনামূলক অর্থাৎ খাত-প্রতিষ্ঠানওয়ারি মৌলবাদের অর্থনীতির বিকাশধারা নির্দেশে যথেষ্ট সহায়ক। সেই সাথে তা মূল স্রোতের অর্থনীতির সাথেও যথেষ্ট সাযুজ্যপূর্ণ যেখানে ইতোমধ্যেই রেন্ট সিকিং উদ্ভূত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন নিয়ামক ভূমিকায় অবতীর্ণ। বিগত ৪০ বছরে (১৯৭৫-২০১৫) মৌলবাদের অর্থনীতি সৃষ্ট ক্রমপুঞ্জীভূত নিট মুনাফার মোট পরিমাণ হবে বর্তমান বাজার মূল্যে কমপক্ষে ২ লক্ষ কোটি টাকা যে পরিমাণ অর্থ সরকারের গত অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের দ্বিগুণ অথবা সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের সমপরিমাণ।

কাবুল : এই সরকার মৌলবাদের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে কি না? আপনার কি মনে হয়?
বারকাত : না, পারে নি। দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আমি দেখি না। ইসলামী ব্যাংকে ৮ জন ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর দিয়েছেন, সেই ৮ জন কী করলেন? তারা বোর্ড মিটিংয়ে বসেই, প্রথম বোর্ডেই, আমি শুনেছি, ইসলামী ব্যাংকের অফিসারদের বেতন বিশ পার্সেন্ট বাড়িয়ে দিয়েছেন।

কাবুল : আমরা যে যতো কথাই বলি না কেন কমিটমেন্ট, আইডোলজি এবং পলিটিক্যাল লিডারশিপ ছাড়া কিছুই হবে না। বাংলাদেশে বামপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ কি? সংক্ষেপে যদি একটু বলেন।
বারকাত : বাংলাদেশে আওয়ামী-বিএনপি এই যে রাজনীতি-বাইপার্টিজান, বুর্জোয়া-পেটিবুর্জোয়া যাই বলেন, এই রাজনীতিতে একটা ব্যাপক অংশ এক সময় আওয়ামী লীগ, এক সময় বিএনপিকে ভোট দেয়। এবং গণতন্ত্র বলতে তো ভোটের প্রসেস ছাড়া অন্য কোনো প্রসেসও নেই। এই জায়গায় তাদের যে ইরোশান-ক্ষয়, এটা জনগণের সামনে কিন্তু স্পষ্ট প্রমাণ হয়ে গেছে। এই ক্ষয়ে কিছুই ভ্যাকুম যেহেতু থাকে না, আমি বারবার যেটা বলেছি, এই ক্ষয়ের ফিল ইন দ্য ব্লাংক করছে কিন্তু জামাতে ইসলামী। গ্রামে, শহরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সব জায়গায়। এবং তারা কিন্তু একটা আইডোলোজিক্যাল পার্টি। মানে দুই রকম টুপি আছে, লাল টুপি আর সাদা টুপি– মাঝখানে আর কিছু নেই, কিউবা আর ইরান। এখানে আমার যেটা ভয়, যদি প্রগতিশীল শক্তি-বাম বলেন আর যাই বলেন, যদি কনসোলিটেড হয়ে দাঁড়াতে না পারে সেই ফিল ইন দ্য ব্লাংক করে ফেলবে ধর্মীয় শক্তি এবং তাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা তাদের হয়েও যেতে পারে। তখন হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।
বাম শক্তি বর্তমানে গ্রামের কৃষক নিয়ে কোনো রাজনীতি করে না। বাম শক্তি বলতে পারবে না পাকিস্তান আমলের মতো আমরা আদমজী জুট মিল থেকে শুরু করে শ্রমিক শ্রেণি যেখানে আছে, রাজনীতি করছি। … নেই। বামশক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও জোর দিয়ে কথা বলতে পারছে না। বিক্ষিপ্তভাবে যে বামগুলো আছে, ১০টা দল, তাদের শক্তি যদি গাণিতিকভাবে যোগ করেন, শক্তি কিন্তু কম না। অর্থাৎ বামশক্তির প্রয়োজন এই মুহূর্তে একটা স্ট্রং তত্ত্বকাঠামো– যে তত্ত্বকাঠামো তাদের হাতে নেই। এবং সেই তত্ত্বকাঠামো নির্মাণ করবেন একজন মার্কস, একজন এঙ্গেলস, একজন লেনিন– বাংলাদেশি। সে কে? আমরা বামের মধ্যে এখনো সেটা দেখি না। এ ধরনের লোক তো দৃশ্যমান হয় দেখারও দশ বছর আগে। দেখতে পাওয়ার-পরিচিত হওয়ারও দশ বছর আগে, আমরা তা দেখছি না।
এমনও তো হতে পারে, রাজনৈতিক শক্তি রাজনীতিতে প্রধান না হয়ে অন্য কোনো শক্তি– আমি সেনাবাহিনী বলছি না, পজিটিভ সেন্স-এ বলছি, বুদ্ধিজীবী মহলের কেউ– তথাকথিত, কেউ বা কারা– এটা হয় কী না জানি না– হতেও পারে… এরকম।

কাবুল : সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বারকাত : ধন্যবাদ।