Ad Space

তাৎক্ষণিক

দেবীদ্বার মুক্ত দিবস আজ

ডিসেম্বর ৪, ২০১৬

সাহেব-বাজার ডেস্ক : আজ ৪ ডিসেম্বর দেবীদ্বার হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এদিনে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমনে দেবীদ্বার হানাদার মুক্ত হয়েছি। ১৯৭১ সলের রক্তেঝরা দিনগুলোতে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমনে হানাদার মুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল। তারই ধারাবাহিকতায় দেবীদ্বার এলাকা হানাদার মুক্ত হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর।

মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ অভিযানে ৩ ডিসেম্বর বিকেল থেকেই হানাদারদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমন পরিচালনা করা হয়েছিল। মিত্রবাহিনীর ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের জেনারেল আর, ডি হিরার নেতৃত্বে বৃহত্তর কুমিল্লায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। ওই দিন রাতে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক ‘কুমিল্লা- সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক’র কোম্পানীগঞ্জ সেতুটি মাইন বিষ্ফোরনে উড়িয়ে দেওয়া হয়। মিত্রবাহিনীর একটি ট্যাংক বহর বুড়িচং -ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা হয়ে দেবীদ্বারে আসে। হানাদাররা ওই রাতেই দেবীদ্বার ছেড়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে পালিয়ে যায়। ধীরে ধীরে মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ দেবীদ্বার সদরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

এরই মধ্যে মিত্রবাহিনীর ট্যাংক বহরটি দেবীদ্বার থেকে চান্দিনা সেড়ক হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাওয়ার সময় মোহনপুর এলাকায় ভুল বোঝাবুঝির কারনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে গুলি বিনিময় হলে মিত্রবাহিনীর ৬ সেনা সদস্য নিহত হন। পাক সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধে ওই রাতেই পালিয়ে ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্টে চলে যাওয়ার সংবাদে ৪ ডিসেম্বর ভোর থেকেই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপগুলো এবং হাজার হাজার জনতা স্বাধীন বাংলার পতাকা নিয়ে উপজেলা সদর অভিমূখে আসতে থাকে এবং ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানে বিজয়ের উল্লাসে উপজেলা সদর প্রকম্পিত করে তোলে।

উত্তাল ৭১’র ১মার্চ থেকেই সারা দেশে ধর্মঘট শুরু হয়, ধর্মঘটের কারনে এক পর্যায়ে যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ গোটা দেশই অচল হয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার ডাক আসার পর অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই ‘যুদ্ধজয়ের নেশা’ দেবীদ্বারবাসীর মনে দানা বাঁধতে শুরু করে। ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে দেবীদ্বারবাসীর অবদান ছিল অবিস্মরনীয়। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান সেনাছাউনি কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্ট সন্নিকটে থাকায় এ অঞ্চলের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। অপর দিকে প্রায় একই ব্যবধানে ছিল ভারত সীমান্ত।

76d8c171-8a11-4294-83bd-b0d357470c4f

ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের ভারত সীমান্ত পারাপারে একমাত্র সহজ ও নিরাপদ এলাকা ছিল দেবীদ্বার। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ দিতে উপজেলার ফতেহাবাদ গ্রামের জমাদ্দার বাড়ি সংলগ্ন ‘নলআরা’(গভীর জঙ্গল) এবং প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীর একমাত্র জিবীত সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ’র নিজ বাড়ি এলাহাবাদ গ্রামে আরো ১টি অস্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাশাপাশি শুভপুর গ্রামেও আরো একটি স্যাটেলাইট মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়।

এসব অস্থায়ী যুদ্ধ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রাথমিক যুদ্ধ প্রশিক্ষণসহ যাচাই বাছাই করে মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হতো। মুক্তিযোদ্ধাও এ অঞ্চলে ছিল অনেক বেশী। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম এলাকা দেবীদ্বার। বিগত আ’লীগ সরকারের আমলে ‘নলআরা’(গভীর জঙ্গল)’র অস্থায়ী প্রশিক্ষন ক্যাম্পে একটি স্মৃতিফলক এবং এলাহাবাদ গ্রামে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের স্মৃতি রক্ষার্থে ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর নির্মাণ এবং পকহায়ানাদের নির্মম হত্যাযজ্ঞের স্বাক্ষর উপজেলা সদরের ১৯ শহীদের গণকবরে স্মৃতিফলক নির্মান এবং পোনরা চৌরাস্তার মোড়ে পাক হায়ানাদের সম্মূখ সমরে শহীদ আবু বকরের কবর পাকাকরণ করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের বাইরে শত্রু সেনাদের সাথে সন্মূখসমরে প্রাণ বাজি রেখে ৩৩ বাঙ্গালীর আত্মহুতীর মধ্য দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত ১৫ সদস্যের পাক হায়েনাদের একটি দলকে পরাস্ত করে নিরস্ত্র বাঙালীদের প্রথম বিজয় ছিনিয়ে আনার গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে দেবীদ্বারবাসী। যে যুদ্ধে ‘মরিচের গুড়া’ নামক বঙ্গজ হাতিয়ারটিও ব্যবহার হয়েছিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের তান্ডবের ছোঁয়া লাগেনি এমন গ্রাম দেবীদ্বারে নেই। অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তার পরেই ছিল ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কসবা অঞ্চল। তাছাড়া পাক সেনাদের সাথে সম্মূখসমরেও পিছিয়ে ছিলনা এ অঞ্চল। বরকামতা যুদ্ধে ৫ পাক শত্রুসেনা নিহত, ভানী এলাকার যুদ্ধে ৭ পাক শত্রুসেনা নিহত, বারুর সম্মূখ যুদ্ধে ৬ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ, মহেশপুর যুদ্ধে ১৪ নিরিহ বাঙ্গালী শহীদ, ধামতী ও ভূষণা যুদ্ধে ১১ নিরিহ বাঙ্গালী শহীদ হওয়ার ঘটনা উল্লেখযোগ্য।

এ ছাড়া দেবীদ্বারে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান ছিল অবিশ্বরনীয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রক্ষায় প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত বিশেষ গেরিলাবাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য কমরেড আব্দুল হাফেজ, যুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের পালাটোনাক্যাম্প প্রধান সাবেক সাংসদ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবেক এম,এন,এ আব্দুল আজিজ খান, আজগর হোসেন মাষ্টারসহ অসংখ্য যোদ্ধা অবদান রেখেছেন।