Ad Space

তাৎক্ষণিক

প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি, বরখাস্ত ৬

ডিসেম্বর ১, ২০১৬

সাহেব-বাজার ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি ছয়জনের দায়িত্বে অবহেলার কারণে হয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে বিমান কর্তৃপক্ষ। তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বুধবার (৩০ নভেম্বর) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানায়।

এর আগে সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ বিমানের করা তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানান। বরখাস্তরা হলেন ইঞ্জিনিয়ার অফিসার এমএম রোকনুজ্জামান, সামিউল হক, লুৎফর রহমান, মিলন চন্দ্র বিশ্বাস, জাকির হোসেন ও টেকনিশিয়ান সিদ্দিকুর রহমান।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বিমানের নাট ঢিলা হয়ে যাওয়ায় উড়োজাহাজের অয়েল প্রেসার কমে যায়। যে কারণে লাহারের আকাশে ত্রুটি ধরা পড়ার পর তাৎক্ষণিক পার্শ্ববর্তী তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে বিমানটি জরুরি অবতরণ করতে হয়।

বুধবার সন্ধ্যায় তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রেস ব্রিফিংয়ে রাশেদ খান মেনন জানান, তেলের পাইপের নাট ঢিলা হয়ে যাওয়ায় বিমানটিতে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যর্থতার (হিউম্যান ফেইলর ফ্যাক্টর) কারণেই এটা হয়েছে। এ জন্য আপাতত বাংলাদেশ বিমানের পাঁচজনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হচ্ছে। তবে কারো নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেনন বলেন, বিমানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তাদের সাসপেন্ড করা হবে। কিন্তু তাদের পরিচয় বিমানের পক্ষ থেকে এখনো জানানো হয়নি। তাই বিস্তারিত এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। পরিচয় ছাড়া পাঁচজনকে কীভাবে শনাক্ত করল তদন্ত কমিটি জানতে চাইলে বিমানমন্ত্রী বলেন, তদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট পেলে বিস্তারিত বলা যাবে।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার (১ ডিসেম্বর) পুরো প্রতিবেদন দেওয়ার কথা। হয়তো আরও সময় লাগতে পারে। কারণ অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয় আছে। পরিচয় প্রকাশ না করে মন্ত্রণালয়কে এড়ানো অথবা ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে এ ধরনের ঘটনা খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দোষী কেউ পার পাবে না।

বিমানমন্ত্রী আরও বলেন, ৩টি কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এর একটি যান্ত্রিক ত্রুটি, অপরটি হিউম্যান এরর এবং তৃতীয়টি হচ্ছে এনভায়রনমেন্টাল। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ওই ঘটনাটি ঘটেছে এটা ঠিক। তবে এর নেপথ্যে রয়েছে হিউম্যান ফেইলিউর (মনুষ্যঘটিত ত্রুটি)। এ জন্য ওই ঘটনায় কেবল সাসপেন্ড নয়, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিমানের অদক্ষতার কারণে এ ধরনের ঘটনা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এতে করে মানুষের আস্থার সঙ্কট তৈরি হতে পারে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিমান হচ্ছে কোম্পানি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিমানকে কোম্পানি করা হয়। এর ফলে বিমানের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে অবগত করলেই কেবল কিছু জানা যায়। মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ততটুকু, যতটুকু তারা জানায়।

বিমানমন্ত্রী জানান, ভিভিআইপি ফ্লাইটের ১ দিন আগে সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর হাঙ্গেরির পথে যাত্রাকালে লাহারের আকাশে বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অব প্রসিকিউটর) অনুযায়ী, পার্শ্ববর্তী বিমানবন্দরে নিরাপদেই বিমানটি অবতরণ করা হয়। এরপর ৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট দেরিতে একই বিমান বুদাপেস্টে পৌঁছায়। ত্রুটির ঘটনার কারণে লন্ডন থেকে আরেকটি উড়োজাহাজ তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে নেওয়া হয়। তবে আগের বিমানে চড়েই গন্তব্যে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী।

একদিন আগে সিকিউরিটির কাছে হস্তান্তরের পরও বিমানের দুর্ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর গাফিলতি আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে মন্ত্রী বলেন, ‘সেটি আমার জানা নেই। বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই ঘটনায় বিমান মন্ত্রণালয়ের আরেকটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তারা এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে।’ পরে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার আগেই কমিটির অনুসন্ধান শেষ করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তার প্রেস ব্রিফিংয়ের কিছু সময় পরেই বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছয়জনকে সাময়িক বরখাস্তের কথা জানায়।

উল্লেখ্য, গত ২৭ নভেম্বর সকাল ৯টা ১৪ মিনিটে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে প্রধানমন্ত্রী বহনকারী এয়ারক্রাফট (বিজি ১০১০) বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর। আকাশপথে চলা অবস্থায় বিমানের ইঞ্জিনে ফুয়েল প্রেসার কমে যাওয়ায় আশখাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে উড়োজাহাজটি। সেখানে চারজন প্রকৌশলী উড়োজাহাজটির মেরামতের কাজ করেন। মেরামত শেষে বিমানটি কিছুক্ষণ পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন করে। ৪ ঘণ্টার অনির্ধারিত যাত্রাবিরতি শেষে বিমানটি হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে পৌঁছায়।

বিমানটি বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে বুদাপেস্টের ফিরেন্স লিজট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ায় ফ্লাইটটি বিলম্বিত হয়ে রাত ১১টার পর (বাংলাদেশ সময়) গন্তব্যে পৌঁছায়। ওই উড়োজাহাজটিতে প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীসহ ৯৯ জন যাত্রী এবং ৯ জন ক্রু ছিলেন।

এদিকে চার দিনের সরকারি সফর শেষে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইট বিজি-১০৪০ ‘আকাশ প্রদীপ’ প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সোয়া ৩টায়) বুদাপেস্ট ফিরেন্স লিজট ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট ত্যাগ করে। প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে অন্যান্যের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এবং হাঙ্গেরিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আবু জাফর বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

রাত এগারোটার দিকে প্রধানমন্ত্রী হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম শাহরিয়ার আলম, আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা।