Ad Space

তাৎক্ষণিক

চাকরিতে প্রবেশের বয়স সীমা ৩৫ করার দাবিতে রাস্তায় নামছে শিক্ষার্থীরা

নভেম্বর ২৫, ২০১৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছরে ঊন্নীত করার দাবিতে আন্দোলন করছে সাধারণ ছাত্র পরিষদ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজশাহীতে মানববন্ধনের ঘোষনা দেয়া হয়েছে। শনিবার বেলা ১১টায় রাজশাহী জিরো পয়েন্টে মানবন্ধনের আয়োজন করা হয়েছে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, আগে জন্মনিবন্ধন ব্যাধতামূলক না হওয়ায় ১৪ বছরে এসএসসি পাস করা সম্ভব হত। তখন ডিগ্রি অনার্স কোর্স ছিল ৩ বছর এবং ডিগ্রি (পাস) কোর্স ছিল ২ বছর ফলে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে স্নাতক পাস করা যেত। এ কারনে ১৮ কিংবা ১৯ বছর বয়সে বিসিএসসহ পিএসসির অন্যান্য চাকুরিগুলোতেও আবেদন করা যেত।

বর্তমানে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার সার্টিফিকেটে বয়স লিপিবদ্ধ থাকার ফলে ১৬ বছরের পূর্বে কোন ভাবেই এসএসসি পরীক্ষা দেয়া যায় না। ৩ বছরের অনার্স কোর্স ৪ বছর, ২ বছরের ডিগ্রি কোর্স ৩ বছর, ৩ বছরের ডিগ্রি কোর্সে সাথে ২ বছরের মাস্টার্স ছাড়া আবেদন করা যায় না। ৬ বছর বয়সে স্কুলে ভর্তির বিধান নির্দিষ্ট হওয়ার ফলে ১৬ বছর ৩ মাস বয়সে এস.এস.সি পরীক্ষা দিতে হয়। নন পি.এস.সি’র ক্ষেত্রে যে প্রজ্ঞাপন তাতে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ১৮ বছর। কিন্তু ১৮ বছর বয়সে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কিভাবে শেষ হয়? ২ বছর মেয়াদী ডিগ্রিও এখন নেই।

১৬ বছর ২ মাসে এসএসসি ১৮ বছর ৪ মাসে এইচ.এস.সি ও ১৮ বছর ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিলে ১৯ বছর বয়সে প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু করলে ২৩ বছরের পূর্বে কখনো অনার্স শেষ করা সম্ভব না। তাহলে বিপিএসসি কোন যুক্তিতে চাকরির আবেদনের শুরুর বয়স ২১ থাকবে? এই অকার্যকর আইন এখনো প্রয়োগ করে ছাত্র সমাজকে চরম ভাবে ঠকানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে সরকারি চাকরিতে ৫৫% কোটার মাধ্যমে নিয়োগ হয়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোন কোটা নাই। কোটাধারিরা চাকরিতেও কোটা পায়, আবার বয়সও তাদের শিথিলযোগ্য। উল্লেখ্য মুক্তিযোদ্ধা, উপজাতি, জুডিশিয়াল ও চিকিৎসক ৩২ (চিকিৎসকদের চাকরিতে আবেদনের বয়স ৩২ করা হয়েছিল এই বলে যে সাধারণ ছাত্রদের চেয়ে তাদের এক বছর বেশি পড়তে হয়, কিন্তু পরবর্তিতে সাধারণ ছাত্রদেরও অনার্সের কোর্স এক বছর বৃদ্ধি করে ৪ বছর করা হয়) বছর পর্যন্ত চাকরিতে আবেদন করতে পারে। নার্সদের ক্ষেত্রে ৩৬ এবং বিভাগীয় প্রার্থীরা ৪০ বছর পর্যন্ত চাকরিতে আবেদন করতে পারে।

উন্নত বিশ্বে তাদের জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বয়সের সীমা রেখাকে প্রাধান্য দেয়নি। অনেক দেশে অবসরের সীমা থাকলেও প্রবেশের কোন সীমা নেই। যেমন-ভারতের পশ্চিম বঙ্গে ৪০ অন্যান্য প্রদেশে ৩৮-৪০, শ্রীলংকাতে ৪৫, ইন্দোনেশিয়াতে ৪৫, ইতালিতে ৩৫, ফ্রান্স এ ৪০, যুক্তরাষ্ট্রে ৫৯, কানাডাতে ৫৯, সুইডেনে ৪৭, কাতারে ৩৫, নরওয়েতে ৩৫, এঙ্গোলাতে ৪৫, তাইওয়ানে ৩৫ বছর পর্যন্ত রয়েছে। আর আমাদের দেশে ৩০ এর সীমা রেখা দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছে চাকরি প্রার্থিদের।

বাংলাদেশের কোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট মুক্ত নয়। ছাত্র ও শিক্ষক অনুপাতে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরীকমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ৮৭% শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধীনে অধ্যয়নরত। সেই সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়টিও সেশন জট মুক্ত নয়।

গত ৫ বছরের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ২০০৮ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন। ২০০৯ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-৩ বছর ১ মাস ০৬ দিন। ২০১০ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-৩ বছর ১২ দিন। ২০১১ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ১০ দিন। ২০১২ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষায় সেশন জট ছিল-২ বছর ১১ মাস ২৭ দিন। উক্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে গত ৫ বছরে প্রতিশিক্ষাবর্ষে গড় সেশন জট ছিল ৩ বছর ২ দিন।

উল্লেখ্য ২০১৩ সালের মাস্টার্স ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের বর্তমান মাসের ৯ তারিখে। প্রশ্ন রয়ে যায়-,২০১৪,২০১৫ এবং ২০১৬ সালের মাস্টার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরী কমিশনের সর্বশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৬% শিক্ষার্থী সেশন জটে আক্রান্ত এবং ৪% শিক্ষার্থী সেশন জট মুক্ত।

গড় আয়ু যখন ৪৫ বছর ছিল তখন চাকরিতে প্রবেশের বয়স ছিল ২৭, যখন ৫০ ছাড়ালো তখন প্রবেশের বয়স ৩০ হলো। যদিও বর্তমানে  বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭১ বছর। গড় আয়ুর ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধির কারন দেখিয়ে চাকরিতে অবসরের বয়স ৫৭ থেকে ৫৯ করা হয়েছে। এর ফলে যে সকল সরকারি চাকরিজীবী অবসরে যেতেন সে সকল পদও খালি হয়নি। তাই বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। আবারও শোনা যাচ্ছে সরকারি চাকরির অবসরের বয়স বাড়ানোর কথা।

শিক্ষার কোন বয়স নেই বলা হচ্ছে অথচ একজন শিক্ষার্থীর বয়স ত্রিশ বছর পার হলেই তাকে আর সরকারি/বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশ ব্যতিত পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কিনা আমাদের জানা নেই। ৫৭ বছরের কর্মজীবী পৌঢ়কে যেখানে অবসরের বয়স বাড়িয়ে কাজ করার আরো সুযোগ তৈরি করে দেয়া হচ্ছে সেখানে একজন তরুণকে ৩০ বছরেই পৌঢ়ত্বের শিকল পড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। শোষন করার জন্য চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমাবদ্ধতা প্রচলন করেছিল যে বৃটিশ সরকার তাদের নিজেদের দেশেই তারা চাকরিতে প্রবেশে বয়সের কোন সীমাবদ্ধতা রাখেনি।

বিবৃতিতে আরো উল্লেখ করা হয় গত ৩১ জানুয়ারি, ২০১২ তারিখে নবম জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার বর্তমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছরে উন্নীত করার জন্য ৭১ বিধিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ২ সেপ্টেম্বর, ২০১২ তারিখে ২১ তম বেঠকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছরে উন্নীত করার সুপারিশ করেন।

নবম জাতীয় সংসদের বহু সংসদ সদস্য এ ব্যাপারে অবিলম্বে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিভিন্ন জেলার জেলা প্রশাষকগণও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। দশম জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রীসহ বহু এমপি চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর বিষয়ে জতীয় সংসদে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন এবং প্রায় প্রতিটি  অধিবেশনেই এ ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। জন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় একটি বিষয় সংসদে এত বার উঠার পরও কেন তা বাস্তবায়িত হচ্ছেনা তা বড় বিস্ময়কর।