Ad Space

তাৎক্ষণিক

ভালো আছি, ভালো থেকো । অঙ্কিতা দত্ত

নভেম্বর ১৭, ২০১৬

ব্যস্ত শহরের একদম মাঝখানে, ঠিক যেখানে অনেক আলো আর মাথার উপর দিয়ে চলে গেছে মস্ত ফ্লাইওভার, ঠিক সেখানেই অনেকটা জায়গা জুড়ে রয়েছে একটা বড় বাড়ি। সেই বাড়ির বাসিন্দারা বয়সে প্রবীণ হলেও মন এর দিক দিয়ে তারা তোমার আমার সতেজতা কেও হার মানাবে। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, আমি যে জায়গাটার কথা বলছি সেটা বৃদ্ধাশ্রম। শৈশব আর বার্ধক্য এর অনুভুতি গুল যেন এখানে হাত ধরাধরি করে রয়েছে।
ভিতরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত অনুভুতি হল। যেটা তুলনা করলে অনেকটা এইরকম হয়, সন্তান-হারা মা যখন অনেকগুলো অনাথ শিশুকে তার চোখের সামনে দেখে আবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়, আমার অবস্থাটাও ঠিক সেই রকম হল। কয়েক বছর আগে আমি আমার ঠাকুমাকে হারিয়েছি, আজ চোখের সামনে এতগুলো দাদু ঠাকুমা দেখে আমি আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে গেলাম। একজন ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করলাম “কেমন আছো? তোমার সাথে একটু গল্প করতে এলাম…” এইকথা শুনে তো সেই ঠাকুমা হেসেই চলেছে…, কিন্তু এই হাসি টা কি সত্যি হাসি??? হাসি থামিয়ে ঠাকুমা বলল “আমাকে জিজ্ঞেস করছে কেমন আছি, হাঃ হাঃ হাঃ, আমার সাথে গল্প করবে, হাঃ হাঃ..” সব উত্তর পেয়ে গেলাম আমি। এরপর বললাম এসো তোমার সাথে একটা ছবি তুলি। শুনে ঠাকুমা খুব খুশি। কিন্তু ঠাকুমা জানে না সেলফি মানে কি, সেলফি তোলার সময় যে টাইমার সেট করতে হয় সেটাও ঠাকুমা জানে না। কি করে জানবে, নাতি-নাতনিরা শিখিয়ে দেইনি যে। তাই যখন সেলফি তুলবো বলে ঠাকুমার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি তখন সে আনন্দে খুশি তে আমাকে জরিয়ে ধরল, তাঁর স্নেহের হাত টা আমার গালে মাথায় বোলাতে লাগলো। সে যে কি সুখের স্পর্শ তা ভাষায় প্রকাশ করতে আমি ব্যর্থ। মনে পরে যাচ্ছে সেই দিন গুলোর কথা, যখন আমি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে ঠাকুমা কে প্রণাম করে যেতাম, আর ঠাকুমা তাঁর কাঁপা কাঁপা হাত দিয়ে আশীর্বাদ করতে গিয়ে আমার সুন্দর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল গুলো কে এলোমেলো করে দিত। মিছিমিছি রাগ দেখিয়ে বলতাম “দিলে তো আমার চুল গুলো ঘেটে, এরপর থেকে আগে প্রণাম করব তারপর চুল আঁচড়ে বেরবো…” আজ আর ওভাবে কেউ চুল এলোমেলো করে দেয় না।

ভিতরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত অনুভুতি হল। যেটা তুলনা করলে অনেকটা এইরকম হয়, সন্তান-হারা মা যখন অনেকগুলো অনাথ শিশুকে তার চোখের সামনে দেখে আবেগে উচ্ছ্বাসিত হয়, আমার অবস্থাটাও ঠিক সেই রকম হল। কয়েক বছর আগে আমি আমার ঠাকুমাকে হারিয়েছি, আজ চোখের সামনে এতগুলো দাদু ঠাকুমা দেখে আমি আবার সেই পুরনো দিনে ফিরে গেলাম।

যাকগে, ফিরে আসি প্রসঙ্গে… সেই ঠাকুমা কে বললাম, এবার সেলফি তুলবো, ক্যামেরার দিকে তাকাও। সে ভেবেছে এক সেকেন্ডে হয়ে যাবে, কিন্তু আমার ফোনে সেলফি টাইমার সেট করা আছে, এক…দুই… তিন সেকেন্ড পর ছবি উঠবে। কিন্তু ঠাকুমা তো সেটা জানে না, তাই এক সেকেন্ড পরে ছবি তোলা হয়ে গেছে ভেবে সে আবার আমাকে জরিয়ে ধরে গায়ে মাথায় হাত বোলাতে লাগলো। অগত্যা ছবি তোলা শিকেই উঠল…।! স্নেহ ভালবাসা যে তিন সেকেন্ড মানেনা, এটা ঠাকুমা জানে, আমি জানতাম না।
হঠাৎ পাশ থেকে আরেক ঠাকুমা বললেন “আমাদের একটা ছবি তুলবে?” উফফফ… এরকম আবদার তো আমি বারবার মেটাতে রাজি। তুললাম সেই বাকি ঠাকুমা দের ছবিও। তাদের কে জিজ্ঞেস করলাম সেই একই প্রশ্ন “কেমন আছো?” তখন একজন বলল, “ভালই আছি, এই তো আজ ইকো পার্ক গেছিলাম, পরশু হাজরা যাবো, সেখানে একটা অনুষ্ঠানে আমরা নিমন্ত্রিত, তারা গাড়ি পাঠিয়ে দেবে আমাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য, ভালো আছি আমরা, কোন অসুবিধা নেই তো, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমাচ্ছি একদম নিজের মতো, ভাল আছি আমরা…” আমি জিজ্ঞেস করলাম “ আর বাড়ির কথা…।” উত্তরগুলো যেন সাজানো ছিল, আসলে এই উত্তর গুলোই তো প্রতিদিন সে দিয়ে চলেছে তাঁর মন কে! বলল, “ না, বাড়ির থেকে এটাই ভালো জায়গা, ছেলে বউ, নাতি নাতনি রা সব কর্মসূত্রে বাইরে থাকে, ওরা যখন এখানে আসে তখন আমিও বাড়ি যাই।” ঠিক যেন কর্মসূত্রে ঠাকুমাও আজ বাইরে। ছুটিতে যখন সবাই আসে তখন ঠাকুমাও যায় তার বাড়ি তে দিন কয়েকের আপায়্যান নিতে… ছুটি শেষ, আপায়্যানও শেষ, আবার সেই ফিরে আসা… জানতে ইচ্ছে করে সেই মানুষ গুলো কে, কোন গ্রহে তারা গেছে যেখানে পরিবারের সবাই কে নিয়ে যাওয়া যায় শুধু এই বুড়ো মানুষ টা কে নিয়ে যাওয়া যায়না।
কি অসম্ভব সূক্ষ্ম বোঝাপড়া নিজের রক্তের সম্পর্কের মানুষ গুলোর সাথে, তাই না…? আর আমরা একটু তেই ভেঙ্গে পরি। কিন্তু শাক দিয়ে কি মাছ ঢাকা যায়!! ঐ সূক্ষ্ম বোঝাপড়াগুলোর পিছনে যে চিনচিনে অভিমানগুলো ছিল, তা স্পষ্ট উঁকি দিচ্ছিল এত বার ভাল আছি, ভাল আছি বলার মধ্যে দিয়ে…!
এখানে যারা আছেন, তারা আর্থিকভাবে সকলেই সচ্ছল, কিন্তু তাদের যেটা নেই সেটা হল তাদের জন্য তাদের প্রিয় মানুষ টার কাছে সময় নেই। কেমন আছো, কি করলে আজ সারাদিন, ওষুধ খেয়েছিলে ঠিক করে, খাবার খেয়েছ তো, রাত্রে ভালো ঘুম হয়েছিল… এগুলো বলার মতো কাছের মানুষ নেই তাদের কাছে।
পৃথিবীর সব থেকে শান্তির আর নিরাপদ জায়গা হল নিজের বাড়িটা। সেই ঘরবাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে কোন মানুষ ভালো থাকতে পারেন না। গুরুজন ছাড়া সংসার অসম্পূর্ণ। মাঝে মাঝে তো বড়োদেরও ভুল হয়, সেই ভুল গুলো কে শুধরে দেওয়ার জন্য বাড়ির বয়স্ক মানুষ টাকে খুব দরকার।
এবার ফেরার পালা… সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি এক রাশ আশীর্বাদ। আজ অনেকবার আশীর্বাদ এর হাত আমার মাথায় পরেছে, অনেক বার চুল গুলো এলোমেলো হয়েগেছে। কিন্তু আজ আমার চুল গুলো কে হাত দিয়ে ঠিক করতে ইচ্ছে হয়নি, কি জানি কেন…। কখনও কখনও এরকম এলোমেলো থাকতেই ভালো লাগে।
ফেরার সময় দেখলাম এক ঝাঁক প্রজাপতি বারান্দাতে উড়ে বেড়াচ্ছে। আমার একটা বন্ধু বলল, পবিত্র স্থানে অনেক প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়। কিন্তু আমি যে এই প্রজাপতিগুলোকে ঘরে দেখতে চাই…।
ঠিক যেখানে মা রান্নাঘরে কাজ করছেন, বাবা প্রতিদিন এর মত অফিসের কাজে ঐ ঘরে ব্যাস্ত, আর পুচকে টা দাদু ঠাকুমার কাছে রাজা রানির গল্প শুনছে, পাশে রয়েছে একটা খোলা জানলা, যেখান দিয়ে ঘরে ঢুকছে সূর্যের লাল আলো, আর সেই আলোতে প্রজাপতিগুলো খেলছে একমনে…
প্রার্থনা করি যেন আমাদের অভিধান থেকে মুছে যাক একটা শব্দ, যার নাম বৃদ্ধাশ্রম।

অঙ্কিতা দত্ত : শিক্ষার্থী, কলকাতা, ভারত।