Ad Space

তাৎক্ষণিক

প্রেমে ব্যর্থ হয়েছিল সম্পা, উত্যক্তে অতিষ্ঠ ছিল বর্না

নভেম্বর ১৬, ২০১৬

রিমন রহমান : কিশোরী সম্পা আর বর্নার মধ্যে ছিল ভীষণ সখ্য। একই গ্রামে বাড়ি। ছাত্রী তারা একই স্কুলের। একসঙ্গে স্কুলে যেতো, বেঞ্চে বসতো পাশাপাশি, তাদের রোল নম্বরও আগে পরে। সম্পার ২৪ আর বর্নার ২৫। এতো মিল দুজনের। শেষ পর্যন্ত জীবনটাও তারা দিয়ে দিলো একসঙ্গে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সম্পার ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে তারা দুজন। তারপর বুধবার বিকেলে তাদের দাফনও করা হয় পাশাপাশি।

উচ্ছ্বল আর প্রাণবন্ত কিশোরী দুটি কেন জীবনের ওপর উৎসাহ হারালো- তাদের চলে যাওয়ার পর থেকেই জবাব খোঁজার চেষ্টা করছেন স্বজন আর পরিচিতজনরা। আর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, একজন পৃথিবী ছেড়েছে উত্ত্যক্তের শিকার হয়ে, আর অন্যজন প্রেমে ব্যর্থতার হতাশা থেকে।

তাদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, কিশোরী বয়সেই প্রেম করে ব্যর্থ হয়েছিল উম্মে মারিয়া সম্পা (১৪)। আর স্থানীয় এক বখাটের উত্যক্তে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল তামিমা খাতুন বর্না (১৩)। তাই তারা দুজনই ‘সুইসাইড নোট’ লিখে একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছে।

ওই দুই কিশোরীর বাড়ি রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ শাহাপুর এলাকায়। তারা পার্শ্ববর্তী বেলঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। সম্পার বাবার নাম মুক্তার আলী। আর বর্নার বাবার নাম নাজমুল হক। বর্নার বাড়ি থেকে ৮-১০টি বাড়ি পরই সম্পার বাড়ি। মঙ্গলবার রাতে ওই দুই কিশোরীর লাশ উদ্ধারের পর থেকে বুধবার সারাদিন আশপাশের গ্রামের শোকাহত মানুষের ঢল নামে শাহাপুর গ্রামে।

বুধবার বেলা ১২টার দিকে গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তখনও ময়নাতদন্ত শেষে দুই কিশোরীর লাশ গ্রামে ফেরেনি। পুরো এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। অসংখ্য নারী-পুরুষ গুচ্ছ গুচ্ছ হয়ে বসে গুঞ্জন করছেন। আর দুই বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কান্নার রোল।

সম্পার মা শরিফা বেগম (৩৫) জানালেন, এক বছর আগে শাহাপুর পশ্চিমপাড়ার বিপ্লব হোসেন (২৩) নামে এক যুবকের সঙ্গে সম্পার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বয়স কম হওয়ায় তিনি মেয়েকে বোঝাতেন। মন দিয়ে পড়াশোনা করতে বলতেন। কিন্ত বিপ্লবের জন্য মেয়েটি ছিল উতলা। শরিফা বেগম ভাবতেন, বয়স বাড়লে মেয়ে ভালমন্দ বুঝতে শিখবে। তখন মাথা থেকে ‘প্রেমের ভূত’ এমনিতেই নেমে যাবে।

shompas-family-photo

শরিফা বলেন, কয়েকদিন আগে সম্পার সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করে বিপ্লব। সম্পা তাকে বলেছিল, ‘মা, বিপ্লব কলেজে পড়া একটা মেয়ের সাথে নতুন করে প্রেম করছে। আমার সাথে সম্পর্ক রাখবে না। মা, আমি মরে গেলে কী তুই কান্দবি? আমি মরে গেলে মা বিপ্লবকে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বি।’

এলাকার বাসিন্দারা জানালেন, বিপ্লবের সঙ্গে মেয়েটির সম্পর্কের বিষয়টি সবাই জানেন। বিপ্লবের বাবার নাম আবদুর রহিম। রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজে অর্থনীতিতে প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করেন বিপ্লব। পাশাপাশি সম্পার স্কুলের সামনের একটি কিন্ডার গার্টেনে শিকতা করেন। ঘটনার পর থেকে তাকে এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।

বর্নার বাড়িতে গিয়ে কথা হয় তার মা সাবিনা বেগমের (৪৫) সঙ্গে।

তিনি বলছিলেন, বেলঘরিয়া এলাকার মো. মুন্না (১৮) নামে এক বখাটে তার মেয়েকে বিরক্ত করত। রাস্তা-ঘাটে বন্ধুদের নিয়ে পথ আটকিয়ে প্রেমের প্রস্তাব দিত। কয়েকদিন আগে এলাকার এক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মুন্না পরপর তিনদিন তাদের বাড়িতে যায়। তিনদিন তিন রকম অজুহাত নিয়ে সে বাড়িতে যায়। কিন্তু বর্না তার সঙ্গে দেখাও করেনি, কথাও বলেনি।

bornas-family-photo

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মুন্নার বাবার নাম আবদুল কাদের। বর্নার স্কুলেই পড়াশোনা করতো মুন্না। এ বছর এএসসি পরীায় অংশ নিয়ে ফেল করেছে। তবে ওই স্কুলের সামনেই বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিত। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে বর্নার পিঁছু নিত সে। এ নিয়ে এলাকার লোকজনও তাকে নিষেধ করেছিল কয়েকবার। কিন্তু সে বর্নাকে বিরক্ত করেই যেত। বর্না-সম্পার আত্মহত্যার পর এই মুন্নাও লাপাত্তা।

প্রতিবেশীরা জানান, বর্না ও সম্পার লাশ উদ্ধারের সময় পুলিশ ঘর থেকে দুটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করেছে। সম্পার সুইসাইড নোটে বিপ্লবের নাম আছে। আর বর্নারটিতে আছে মুন্নার নাম। এছাড়া সম্পার হাতের তালুতেও কলম দিয়ে বিপ্লবের নাম লেখা ছিল।

রাসিকের স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর আনোয়ার সাদাত নান্নু ও ইউসুফপুর ইউনিয়নের স্থানীয় ইউপি সদস্য নাজিম উদ্দিন জানান, বিপ্লব ও মুন্না খুবই দুষ্টু প্রকৃতির বখাটে। তাদের নামে এলাকায় মেয়েদের উত্যক্ত করার অনেক অভিযোগ আছে। দুই কিশোরীর লাশ উদ্ধারের পর তারা গা-ঢাকা দিয়েছে।

বর্না ও সম্পার স্কুলের প্রধান শিক মঞ্জুরুল হক বলেন, অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মেয়ে দুটি খুবই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। যা করতো, একসঙ্গে করতো। কেউ কাউকে ছাড়া কিছু বুঝতো না। স্কুলে তাদের রোল নম্বরও পাশাপাশি।

তিনি বলেন, তারা আত্মহত্যা করার পর সম্পার প্রেম ও বখাটেদের বিষয়টি তিনি শুনছেন। তবে এর আগে তিনি কিছুই শোনেননি। আগে জানলে তিনিই অনেক কিছু করতে পারতেন। এখন তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

নগরীর মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবীর জানান, দুই কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনায় বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি। এ ঘটনায় কাউকে আটকও করা হয়নি। তবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার করা ‘সুইসাইড নোট’ দুটির তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে সেগুলোতে কী লেখা আছে তা তদন্তের স্বার্থে জানাতে চাননি ওসি।