অক্টোবর ২০, ২০১৭ ৮:১৭ অপরাহ্ণ

Home / slide / সাপের বিষের প্রতিষেধক নেই হাসপাতালে!

সাপের বিষের প্রতিষেধক নেই হাসপাতালে!

রিমন রহমান : বরেন্দ্র অঞ্চলে ইদানিং তীব্র উৎপাত শুরু করেছে ভয়ঙ্কর বিষধর সাপ ‘রাসেল ভাইপার’। এ সাপে কাটলে বেশিরভাগ রোগিই মারা যান। গেল কয়েক বছরে বরেন্দ্র অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁয় কমপক্ষে ৫০ জন মারা গেছেন রাসেল ভাইপারের কামড়ে।

কিন্তু এই মুহুর্তে রাজশাহীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার প্রতিষেধক (অ্যান্টি স্নেক ভেনম) নেই। ফলে রাসেল ভাইপার তো দূরের কথা, তুলনামূলক কম বিষধর সাধারণ সাপের কামড়েই মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. তৌফিকুল ইসলাম মো. বেলাল জানান, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকার কেন্দ্রীয় ওষুধাগার থেকে থেকে হাসপাতালে সাপের বিষের প্রতিষেধক পাঠানো হয়নি।

জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফেরদৌস নিলুফার জানিয়েছেন, রাজশাহীর উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ কমপ্লেক্সেগুলোতে যে পরিমাণ সাপের বিষের প্রতিষেধক ছিল, তা মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে রাজশাহীতে এই মুহুর্তে সরকারিভাবে মিলছে না সাপের বিষের প্রতিষেধক।

রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. তৌফিকুল ইসলাম মো. বেলাল জানিয়েছেন, রামেক হাসপাতালে সপ্তাহে সাপের প্রতিষেধক ইনজেকশনের চাহিদা রয়েছে ৫০০টি। কিন্তু তারা সরবরাহ পেতেন ১০০ থেকে ১২০টি। গত এক মাস থেকে সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে কয়েক দিন হাসপাতালের টাকায় এই প্রতিষেধক কিনে রোগিদের সরবরাহ করা হতো। কিন্তু ব্যয়বহুল হওয়ায় তাও বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রয়োজনের সবটুকুই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে রোগিদের।

তিনি জানান, প্রতিটি প্রতিষেধকের দাম ৮০০ টাকা। সাপে কাটা একজন রোগির শরীরে কমপক্ষে ১০টি প্রতিষেধক দিতে হয়। তবে কোনো রোগির শরীরে বিষ বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে তাকে ১০০ থেকে ১২০টি পর্যন্ত প্রতিষেধক দিতে হয়। সরকারি বরাদ্দ ছাড়া নিম্ন আয়ের সাধারণ একজন রোগির পক্ষে এই প্রতিষেধক নেয়া খুব কঠিন।

গত ১০ নভেম্বর হাসপাতালের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন সাপে কাটা রোগি রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া এলাকার সারোয়ার আহমেদ (৪০)। তার স্ত্রী মায়া বেগম (৩৫) জানান, ভর্তির পর হাসপাতাল থেকে তার স্বামীকে শুধু স্যালাইন দেয়া হয়েছে। প্রতিষেধক কিনতে হয়েছে বাইরের ফার্মেসি থেকে।

৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগি নগরীর রানীনগর এলাকার শাহানা বেগমও (৪০) জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে তিনি শুধু স্যালাইন পেয়েছেন। প্রতিষেধক কিনতে হয়েছে বাইরে থেকে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে ২০১২ সাল থেকে দেখা মিলছে বিষাক্ত ‘রাসেল ভাইপার’ সাপ। স্থানীয়ভাবে ‘চন্দ্রবোড়া’ নামে পরিচিত এ সাপ প্রায় ২৫ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন বরেন্দ্রের গোদাগাড়ী, তানোর ও নাচোল উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিনই দু’একটি করে সাপটি মারা পড়ছে। বিশেষ করে গোদাগাড়ীর নিমতলা, খারিজাগাতি, রাজাবাড়ি, প্রেমতলী ও সেখেরপাড়ায় ব্যাপক উপদ্রব শুরু হয়েছে সাপটির। এতে আতঙ্কিত হয়ে উঠেছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। এ সাপে কাটলে খুবই উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। অথচ সাধারণ কোনো সাপে কাটলেও রাজশাহীর সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে প্রতিষেধক পাচ্ছেন না রোগিরা।

রামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, সাপে কাটা রোগিদের তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার প্রয়োজন। চিকিৎসা বলতে শুধু ওই প্রতিষেধক। এর বাইরে রোগির তেমন কোনো ওষুধ লাগে না। কিন্তু ওই প্রতিষেধক দিতেই একটু দেরি হলে রোগির মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান তিনটি বিষাক্ত সাপের মধ্যে রাসেল ভাইপার একটি। ২০১২ সালে রামেক হাসপাতালে প্রথম রাসেল ভাইপার সাপের কামড়ের রোগি আসেন। এরপর থেকে এখন নিয়মিত আসছেন। কিন্তু এ সাপের চিকিৎসা ব্যবস্থা রাজশাহীতে অপ্রতুল। গত সপ্তাহেই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গোদাগাড়ী উপজেলার হেলাল উদ্দিন নামে এক রোগি মারা গেছেন।

ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, রাসেল ভাইপার সাপে কাটলে বেশিরভাগ রোগি আইসিইউ পর্যন্ত যাওয়ার আগেই মারা যান। আবার চিকিৎসার মাধ্যমে রোগির শরীরে বিষ নিস্ক্রিয় করা গেলেও দেখা যায়, দংশিত স্থানে দু’একদিন পর পঁচন শুরু হয়। এরপর হাত-পা কেটে ফেলেও রোগিকে বাঁচানো যায় না। এ সাপে কাটলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষেধক দিতে না পারলে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে রোগির দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে যায়। তখন রোগি মারা যান।

তিনি জানান, সাপে কাটা রোগির কিডনি নষ্ট শুরু হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগিকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এ জন্য রোগিকে ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মাধ্যমে কনটিনিয়াস রেনাল রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (সিআরআরটি) দিতে হয়। রামেক হাসপাতালে ডায়ালাইসিস যন্ত্রটি আছে। কিন্তু এটি চালাতে প্রতি ৭২ ঘন্টায় একটি করে সার্কিট প্রয়োজন। একজন রোগির জন্য দুই থেকে তিনটি সার্কিটের প্রয়োজন। আর প্রতিটি সার্কিটের দাম ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এই সার্কিটও সরকারিভাবে বরাদ্দ নেই। রাসেল ভাইপারে কাটা রোগিকে সিআরআরটি করাতে হলে এই টাকা তার স্বজনদেরই খরচ করতে হবে। তাই বেশিরভাগ রোগিই এ চিকিৎসা করাতে না পেরে মারা যান।

তিনি বলেন, থাইল্যান্ডে সাপে কাটা রোগির শরীর থেকে বিষ বের করার জন্য ‘প্লাজমা ফেরোসিস’ নামে একটি বিশেষ যন্ত্র আছে। যন্ত্রটি মানুষের শরীরের এক অংশ দিয়ে বিষাক্ত রক্ত বের করে এবং একই সঙ্গে অপর অংশ দিয়ে রক্ত প্রবেশ করায়। রাজশাহী অঞ্চলে রাসেল ভাইপারের মতো ভয়ঙ্কর সাপের উপদ্রব শুরু হওয়ায় ওই যন্ত্রটি এখানে প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি বরাদ্দের অভাবে এখানে রোগিরা সিআরআরটিই করাতে পারছেন না। এখানে সাধারণ সাপের কামড়ের প্রতিষেধকও পাওয়া যাচ্ছে না চাহিদামতো।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

নাটোরের উত্তরা গণভবনের গাছ কাটায় তদন্ত

নাটোর প্রতিনিধি : উত্তরা গণভবনে গাছ কাটার বিষয়ে ৫ সদস্য বিশিষ্টি একটি তদন্ত কমিটি তদন্ত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *