Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে জঙ্গি আটকের ঘটনায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা– বিস্তারিত....
  • চাঁপাইনবাবগঞ্জে শিবিরের ঝটিকা মিছিল থেকে আটক ৭– বিস্তারিত....
  • পবিত্র রমজান শুরু রোববার– বিস্তারিত....
  • শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে সংঘর্ষ, উদ্বিগ্ন সাংসদ বাদশা– বিস্তারিত....
  • ভোটের ‘ধর্মীয় সেন্টিমেন্টে’ ভাস্কর্য সরানোর ‘পক্ষে’ আ’লীগ-বিএনপি– বিস্তারিত....

হুমায়ূন আহমেদ : কয়েকটি জিজ্ঞাসা । চন্দন আনোয়ার

নভেম্বর ১৩, ২০১৬

বহুকাল আগে তারাশঙ্কর তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে প্রশ্ন তুলেছিলেন, মানুষ জন্মায় কেনো এবং জন্মিলে আবার মরতেই বা হবে কেন? আরো একটি জিজ্ঞাসা ছিল, জীবন এতো ছোটো কেন? মানুষ যত বড়োই হোক, এত ছোট একটি জীবন নিয়ে যত বড়ো আকাশেরই স্রষ্টা হোক না কেনো, তাঁর খেদ তাঁর অসম্পূর্ণতা তাঁর নিয়তি। হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণের পাঁচ বছর আজ। যে খেদ আর অসম্পূর্ণতা দুর্বহ ভার হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু বয়ে এনেছিল, সমগ্র দেশ ন্যুব্জমান ছিল সেই ভারে, আজ ৫ বছর পরে সেই ভার কি সমানভাবে আছে? মাত্র পাঁচবছর সময়, এই কথা প্রযোজ্য নয়, তবু বলছি, সময় অর্থাৎ মহাকাল কি হুমায়ূন আহমেদের কীর্তির ভার নিতে শুরু করেছে? তাঁর মৃত্যুর পরে ‘জনপ্রিয়’ শব্দটিকে নিয়ে যে এত মাপজোখ চলেছিল, হুমায়ূন আহমেদের সেই জনপ্রিয়তার পারদ কি উর্ধমুখী না পতনমুখি, নাকি স্থির হয়ে গেছে। হিমু বা মিছির আলিরা এখন কেমন আছেন? তাদের দলে নতুন করে কোনো হিমু বা মিছির আলি যোগ হচ্ছে কি? অবশ্যই, এইসব জিজ্ঞাসাটির উত্তরের জন্যে পাঁচ বছর সময় যথেষ্ট নয়।

হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। তাঁর উপন্যাস বিক্রির রেকর্ড সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের সকল কথাসাহিত্যিককে ছাড়িয়ে গেছে, এমনকি শরৎচন্দ্রকেও ছাড়িয়ে বলে প্রচার আছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অবলীলায় বলেছেন, শরৎচন্দ্রের চেয়েও কয়েকগুণ জনপ্রিয় ছিলেন। শংকর (মনিশংকর মুখোপাধ্যায়) বলেছেন, বাংলার এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হলেন হুমায়ূন আহমেদ। সাহিত্য সৃষ্টিতে তাঁর জাদু গোটা উপমহাদেশে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। (দৈনিক প্রথম আলো, ২৫/৭/১২) এঁরা দুজনেই পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রিয় লেখক। বাংলাদেশের ছোট-বড়, জনপ্রিয়-সিরিয়াস সকল লেখক একই বাক্যে কথা বলছেন, হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় লেখক আর আসেনি, আসবে কিনা সেই ভবিতব্যও সংশায়িত। এসব কিছুতে অতিশয়োক্তি ছিল কি না এক বছর বিচারের জন্যে যথেষ্ট সময় নয়। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে অনেকগুলো জিজ্ঞাসা জন্মেছিল আমার নিজের মধ্যে। সেই মোতাবেক আমি লিখেও ছিলাম “হুমায়ূন আহমেদ : জনপ্রিয় সাহিত্যিকের মৃত্যু ও দু-একটি ভাবনা” নামে একটি রগরগে লেখা। লেখাটি পশ্চিমবঙ্গের ‘রিভিউ প্রিভিউ’ পত্রিকার আগস্ট ২০১২ সংখ্যায় ছেপেছিল। আমার সেই জিজ্ঞাসাগুলোর যৌক্তিক ছিল কি না, হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পাঁচ বছরের ব্যবধানে আমরা জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তরের কতটা দূরে বা কাছে আছি, তার ভার সম্পূর্ণ পাঠকের উপরে অর্পণ করেই সেই লেখাটির তিনটি অনুচ্ছেদ এখানে উদ্ধৃত করছি।

 সাহিত্যের ইতিহাসে জীবিতকালে মূল্যায়িত না হলেও মৃত্যুর পরে মূল্যায়িত হয়। আমাদের সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ বা জগদীশ গুপ্তরা তার দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ধারার সাহিত্যিকরা সমকালে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে না। এই চারটি ব্যাখ্যার কোনটি হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?

‘এতটা শক্তি ও সামর্থ্য রাখেন যে লেখক, তাঁর দেশ ও জাতির প্রাণের মানুষে পরিণত হয়েছেন যে লেখক, তিনি এবং তাঁর লেখাকে কী করে সিরিয়াস সাহিত্য নয় বলে দূরে ঠেলি? নিজের কাছে সৎ থাকতে হলে স্বীকার করতেই হবে, সিরিয়াস বা ক্লাসিক সাহিত্য হচ্ছে না বলে মোটের উপরে হুমায়ূন আহমেদকে প্রত্যাখ্যান, তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য ও অবহেলাই করে আসছে সিরিয়াস সাহিত্যের মুষ্ঠিমেয় লেখক, পাঠক, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্যের অধ্যাপকরা। সারা বছরে যে লেখকের বই ১০০ জন পাঠকের কাছে যায় না বা পাঠক গ্রহণ করে না আর যে লেখকের একটি বই-ই ২৫ লাখ পাঠকের কাছে পৌঁছায়– এই দুই লেখকের তুলনা করা উচিত কি অনুচিত? সাহিত্য যদি মানুষের জন্য হয়, তবে মুষ্ঠিমেয় কিছু শিক্ষিতবোদ্ধার কাছে নয়, তৃণমূলের মানুষের কাছে, সব বয়সের, সব মত-পথের মানুষের কাছে লেখকের লেখাটি পৌঁছাতে হবে, মানুষকে পড়তে বাধ্য করতে হবে। একজন প্রতিশ্র“তিশীল লেখকের চিন্তাকে সর্বজনের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য তাঁর লেখা জনপ্রিয় হবার বিকল্প নেই। তবে সেই জনপ্রিয় লেখাটি যেন একবার ব্যবহার্য বস্তুর মতো একবার পাঠেই শেষ না হয়। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তাঁর চিন্তার টেকসই একটি ভিত্ তৈরি করে দিতে হবে, যেন মানবসমাজের বিবর্তনের ধারায় তাঁর চিন্তাটি কাজে আসে।
হুমায়ূন আহমেদ শারিরীকভাবে মারা গেছেন, তাঁর সৃষ্টিকর্মও একটি জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, এখন জনপ্রিয়তার প্রশ্নটি মূল্যায়িত হবে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মূল্যায়ন তো আছেই, মৃত্যুর পরে তিনদিনের ব্যবধানে তাৎক্ষণিক যে মূল্যায়ন হয়েছে, দুই বাংলার শীর্ষ জনপ্রিয় ও সিরিয়াস লেখক, যেমন, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুশ শাকুর, শওকত আলী, সেলিনা হোসেন, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ইমদাদুল হক মিলন, এভাবে নাম উচ্চারণ করলে প্রায় সকল খ্যাতিমান ও স্বল্পখ্যাতিমান লেখকের নাম উচ্চারণ করা যাবে, তাঁরা প্রত্যেকেই হুমায়ূন আহমেদের শূন্যতাকে সামনে নিয়ে প্রায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, লিখতে বাধ্য হয়েছেন যে, বাংলাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ একটি স্থায়ী আসন তৈরি করে গেছেন। নিজস্ব একটি ভুবন তৈরি করেছেন, সেই ভুবনের স্বাতন্ত্র্যই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে। এঁদের অনেকেই এতকাল চোখ-কান-নিশ্বাস বন্ধ করে একবাক্যে বলে দিয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদ সস্তা জনপ্রিয় লেখক, তাঁর লেখা কোন কিছুই হচ্ছে না। ইশ্বরগুপ্তের মতো বিরাট বড় প্রতিভা যেমন ইয়ার্কিতেই ফুরিয়ে গেছে, তেমনি হুমায়ূন আহমেদ বিরাট বড় প্রতিভা ও সম্ভাবনা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে এসেছিলেন কিন্তু সস্তা জনপ্রিয়তার অন্ধমোহে পড়ে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনাশ হয়েছে। তাঁর লেখা বালক-তরুণদের পাঠ্য, সিরিয়াস পাঠকের পড়ার যোগ্য নয়। কোটি কোটি মানুষের জনরুচির কথা মাথায় নিয়ে লেখেন যে লেখক, তাঁর লেখায় স্বভাবতই ধ্রুপদী সাহিত্যের উপাদান থাকার কথা নয়। অর্থাৎ হুমায়ূন আহমেদের প্রধান প্রতিপক্ষ তাঁর অসম্ভব জনপ্রিয়তা।
রবীন্দ্রনাথের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের সেই বিখ্যাত উক্তি, “কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, সে মরে নাই।” চারদশক ধরে বাংলাসাহিত্যকে প্রায় একাই শাসন করে গেলেও হুমায়ূন আহমেদকে কি মরেই প্রমাণ করতে হল যে, তিনি শুধুই তথাকথিত জনপ্রিয় লেখক ছিলেন না? বিরাট শক্তি ও সামর্থ্যবান লেখক ছিলেন তিনি, অসম্ভব গল্পের জাদুকর ছিলেন, যে জাদুতে একটি জাতির সর্বজন গ্রহণীয়, বরণীয়, হৃদয়স্পর্শী লেখকে পরিণত হয়েছেন। বস্তুত, মানুষ জীবিত থাকলে তাঁর বিশালত্বকে ধরা যায় না। কিন্তু যেই না তাঁর প্রস্থান ঘটে, একটা শূন্যতা তৈরি হয়, সেই শূন্যতাই জানিয়ে দেয় তাঁর অস্তিত্বের গুরুত্ব ও বিস্তৃত বিশালত্বকে। হুমায়ূন আহমেদ চলে যাবার পরে মুহূর্তেই বাংলাদেশের সাহিত্যের শূন্যতার জায়গাটি তৈরি হয়ে গেল, যে শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিন্দুকেও হাহাকার করে উঠছে। এই শূন্যতা হাজার বছরেও পূরণ হবে না। প্রশ্ন উঠে আসে, তবে কেন হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে মূল্যায়ন হয়নি? দৈনিকে, লিটলম্যাগাজিনে, সাহিত্য পত্রিকায় বা গবেষণা পত্রিকার কোথাও এই জনপ্রিয় লেখকের বিপুল সৃষ্টিকর্ম নিয়ে আলোচনা নেই কেন? এই প্রশ্নের কয়েকটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়– ১. প্রবলতম জনপ্রিয় এই লেখকের লেখা তথাকথিত সিরিয়াস পাঠক ও লেখকরা নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ২. হুমায়ূন আহমেদ এতটাই অগ্রগামী চিন্তক, তাঁর সৃষ্টিকর্মের বিশালত্ব ও গভীরতা এতটাই অপরিমেয় যে, সমকালীন সমালোচকরা মাথায় ঢুকাতে পারেননি। যেমন, ঘরের দরজা দিয়ে বিরাট আকারের একটি সুকেজ বা আলমারি না ঢুকলে বাইরে বারান্দায় ফেলে রাখতে হয়, তেমনি হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টিকর্মকে ঠিক ধরে উঠতে পারেননি বলে সমালোচকরা আলোচনার বাইরে রেখেছেন। ৩. হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক, তাঁর সাহিত্য আনন্দ-বিনোদনের খোরাক, মূলধারার সাহিত্য হিসেবে মূল্যায়িত হবার নয়, তাই আলোচনায় আসেনি। ৪. সাহিত্যের ইতিহাসে জীবিতকালে মূল্যায়িত না হলেও মৃত্যুর পরে মূল্যায়িত হয়। আমাদের সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশ বা জগদীশ গুপ্তরা তার দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ধারার সাহিত্যিকরা সমকালে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে না। এই চারটি ব্যাখ্যার কোনটি হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য?