Ad Space

তাৎক্ষণিক

নির্যাতিতদের চিকিৎসার টাকা পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে!

নভেম্বর ৭, ২০১৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানা পুলিশের এক উপ-পরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে নির্যাতিতদের চিকিৎসা বাবদ দেয়া টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতিতদের নিকটাত্মীয়রা নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার জন্য এসআই হাসানকে অনুরোধ জানালেও তিনি জোর করে আপস-মীমাংসা করে দেন। এ সময় তাদের চিকিৎসার জন্য যে টাকা আদায় করা হয়, তার প্রায় পুরোটিই নিজের পকেটে রেখে দেন এসআই হাসান।

নির্যাতনের শিকার গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়াড় মোহাম্মদপুর এলাকার আবু সাঈদের ছেলে হাসিবুর (১৪) এবং গোলাপের ছেলে শামীমকে (২০) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে সোমবার বিকেলে ভর্তি করা হয়েছে।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বড়গাছি এলাকার মোহাম্মদ আলমের বাড়িতে তিনটি মোবাইল ফোন সেট, একটি টেলিভিশন এবং নগদ কিছু টাকা চুরি হয়। এরপর ৪ নভেম্বর শুক্রবার রাতে মাটিকাটা ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সদস্য মার্জিনা খাতুনের ছেলে হরিশঙ্করপুর এলাকার হাসান এবং তার দুই বন্ধু রহিম ও ফিরোজ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে চুরির অভিযোগ এনে হাসিবুর ও শামীমকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।

এরপর তাদের বড়গাছি এলাকা থেকে এক কিলোমিটার দূরে নির্জন আমবাগানে নিয়ে দড়ি দিয়ে হাত-পা বাঁধা হয়। রাতের অন্ধকারে তাদের বাঁশের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এ সময় হাসিবুর ও শামীমের কোমরের নিচ থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত লাঠি দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে গভীর রাতে তাদের আলমের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। আলমের বাড়িতেও তাদের পেটাতে থাকেন হাসান ও তার সহযোগীরা।

এরপর ভোর হলে এলাকার লোকজন বিষয়টি টের পান। তখন তারা গোদাগাড়ী মডেল থানা পুলিশকে অবহিত করেন। এরপর থানার এসআই হাসানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল নির্যাতিত ওই শিশু ও যুবককে থানায় নিয়ে যায়।

এ সময় বাড়ির মালিক আলম এবং নির্যাতনকারী হাসানের মা নারী ইউপি সদস্য মার্জিনা খাতুনও থানায় যান। অভিযোগ রয়েছে, বাড়ির মালিক আলম ওই দুই শিশু ও যুবককে নির্যাতনের জন্য হাসান ও তার সহযোগীদের পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করেন।

নির্যাতিত যুবক হাসিবুরের চাচা মোক্তার হোসেন জানান, থানায় তার ভাতিজা ও শামীমকে নিয়ে যাওয়ার পর এলাকাবাসী নির্যাতনের প্রতিবাদ করেন। এ সময় নির্যাতনকারী হাসান ও তার সহযোগীদের বিচার দাবি করেন। তারা হাসান ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করার জন্য এসআই হাসানকে চাপ দেন। কিন্তু নির্যাতনকারী হাসানের মা মার্জিনা খাতুন ও ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতা এসআই হাসানকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেন। এরপর নির্যাতিতদের ২০ হাজার টাকা চিকিৎসা বাবদ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এ প্রস্তাবের পর বিষয়টি এসআই হাসান মীমাংসা করে ফেলেন।

নাম প্রকাশের না করার শর্তে নির্যাতিতদের নিকটাত্মীয়রা জানান, চিকিৎসা বাবদ যে টাকা দেয়া হয়েছে তার মধ্যে শিশু হাসিবুর পেয়েছে তিন হাজার এবং যুবক শামীমকে দেয়া হয়েছে দুই হাজার টাকা। বাকি ১৫ হাজার টাকা এসআই হাসান রেখে দিয়েছেন।

এদিকে থানায় মীমাংসা হওয়ার পর ৫ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নির্যাতিতদের প্রথমে গোদাগাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এরপর তাদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে সোমবার বিকেলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।

ওই ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক মাহফুজুর রহমান জানান, শামীমের বাম হাতের হাড় ফেটে গেছে। এছাড়া কোমরে গুরুতর আঘাত রয়েছে। হাসিবুরের ডান পায়ের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদেরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার প্রয়োজন।

এদিকে নির্যাতিতদের চিকিৎসার ১৫ হাজার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন এসআই হাসান। তিনি বলেন, এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। আর নির্যাতিতদের চিকিৎসার টাকা নিজের কাছে রাখার প্রশ্নই আসে না। নির্যাতিতদের অভিভভাবকরা মামলা করতে চাইলে তারা সেটা করতে পারেন।

এ ব্যাপারে গোদাগাড়ী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিপজুর আলম মুন্সি বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।