Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • ‘আপত্তিকর’ কাজে বাধা দেয়ায় প্রহরীকে মারধর– বিস্তারিত....
  • বামশক্তি কনসোলিটেড হয়ে দাঁড়াতে না পারলে ফিল ইন দ্য ব্লাংক করে ফেলবে ধর্মীয় শক্তি : আবুল বারকাত– বিস্তারিত....
  • মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে হলে ভ্যাটের বিকল্প নেই : ভূমিমন্ত্রী– বিস্তারিত....
  • নাটোরে নির্মাণের ৯ মাসেই ভেঙে পড়েছে কালভার্ট– বিস্তারিত....
  • নাটোরে ইয়াবাসহ চার যুবক আটক– বিস্তারিত....

৬২ বছর পর বিড়াল ছানার খোঁজে । আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

নভেম্বর ৪, ২০১৬

‘বাসায় বিড়ালের পাঁচটা বাচ্চা হয়েছে। ওদের চোখ ফোটেনি। দেশ ভাগ হয়ে গেছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে আামাদের বাসা ছেড়ে চলে যেতে হবে। আমার ওই বিড়ালের বাচ্চাগুলোকে ফেলে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছিল না। মনে হচ্ছিল ওদের চোখ ফুটবে তো! নাকি একলা বাসায় কেউ ওদের মেরে ফেলবে– এই চিন্তায় আমি খুব অস্থির ছিলাম। আজ বাংলাদেশে এসে আমার মনে হচ্ছে এক্ষুনি দৌড়ে গিয়ে দেখি, বাচ্চাগুলোর চোখ ফুটেছে কিনা। অথচ মাঝখানে ৬২টা বছর আমার জীবন থেকে উড়ে গেছে। আজ এখানে এসে মনে হচ্ছে আমি যেন সেই নয় বছরের খুকিটি রয়েছি।’
২০০৯ সালের রাজশাহীতে এসে এভাবেই মামা ঋত্বিক ঘটকের বাড়ির স্মৃতিচারণা করেছিলেন ভাগ্নি রীনা চক্রবর্তী। তাঁর জন্ম হয়েছিল মামার বাড়িতেই। সেবার রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির আয়োজনে ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের আগের দিন ১৬ ডিসেম্বর রাতে হোটেলে বসে এভাবেই বলছিলেন ঋত্বিক ঘটকের মেঝ বোন বিখ্যাত আঁকিয়ে সম্প্রীতি দেবীর মেয়ে কানাডা প্রবাসী রীনা চক্রবর্তীর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে আসে দেশবিভাগের বেদনা ও ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতি।
বর্তমানে যেটা রাজশাহী হোমিও কলেজ সেটাই ছিল ঋত্বিক ঘটকের পৈত্রিক বাড়ি। এই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল রীনা চক্রবর্তীর। দেশ বিভাগের পরে সেই প্রথম তিনি বাংলাদেশে আসেন। তার সঙ্গেই এই উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের জমজ বোন প্রতিতি দেবীর মেয়ে আরমা দত্ত। সঙ্গে এসেছিলেন ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করছেন এমন দুই ফরাসী গবেষক আনাইস ম্যাসন ও সান্দ্রা আল ভ্যারেজ।

ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রীনা ও আরমা বলেন, আমরা এই দুই বোন ছোট মামার খুবই প্রিয় ছিলাম। তখন কী আর জানতাম, আমাদের ছোট মামাটা এমন ছোট মামা হবেন। রীনা বলেন, ছোট মামা পদ্মা ধারে বসে বাঁশি বাজাতেন। মন খারাপ হলেই ছুটে যেতে পদ্মার ধারে। ঘুরে বেড়াতেন পদ্মার চরে। আরমা দত্ত বলেন, আমরাও এসেই ছুটে গিয়েছিলাম পদ্মায়। মনে হচ্ছিল মামার প্রাণ সেখানে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছে।

হোটেলে বসে প্রিয় ছোট মামা ঋত্বিক ঘটকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রীনা ও আরমা বলেন, আমরা এই দুই বোন ছোট মামার খুবই প্রিয় ছিলাম। তখন কী আর জানতাম, আমাদের ছোট মামাটা এমন ছোট মামা হবেন। রীনা বলেন, ছোট মামা পদ্মা ধারে বসে বাঁশি বাজাতেন। মন খারাপ হলেই ছুটে যেতে পদ্মার ধারে। ঘুরে বেড়াতেন পদ্মার চরে। আরমা দত্ত বলেন, আমরাও এসেই ছুটে গিয়েছিলাম পদ্মায়। মনে হচ্ছিল মামার প্রাণ সেখানে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছে। আর আমাদের দু’বোনকে হাত বাড়িয়ে আয় আয় বলে ডাকছেন।
রীনা বলেন, বাড়িতে না জানিয়ে মামা নাটক করতে যেতেন। তার মনে আছে রাজশাহী কলেজের মাঠে মায়ের সঙ্গে ছোট মামার একটা নাটক দেখতে গিয়েছিলেন। এখানে আসার পরই বাইরে থেকে বাড়িটা একবার দেখে এসেছি। বাড়ির সামনের সেই প্রাচীরের খানিকটা এখনো রয়েছে। তবে মনে হচ্ছে প্রাচীরটা অনেক ছোট হয়ে গেছে। আমরা তখন প্রাচীরটা হাতে পেতাম না। যাদের সঙ্গে ঝগড়া করতাম, ভাব করতাম, আড়ি দিতাম– সব ওই প্রাচীরের পাশে দাঁড়িয়েই। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের ঘোষণার সময় আমি এই বাড়িতে ছিলাম। এই প্রাচীরের পাশে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে। পাশেই ব্যানার্জী বাড়িতে একটি রেডিও ছিল। যেই রেডিওতে ঘোষণা হলো, রাজশাহী পাকিস্তান। সঙ্গে সঙ্গে অনেক মানুষ লাফিয়ে উঠল। হাততালি দিতে লাগল। আমিও তাদের সঙ্গেই হাততালি দিলাম। ব্রিটিশরা গেল। এইটুকুই ছিল আমার খুশির খবর কিন্তু বাড়ির ভেতরে গিয়ে দেখি সবার মুখ গোমরা। বুঝলাম এই ভাগাভাগিটা বাড়ির কেউ মেনে নিতে পারেনি। এর তিন দিন পরই আমরা রাজশাহী ছেড়ে চলে যাই। আজ রাজশাহীতে এসে তার ভীষণ ভীষণ ভালো লাগছে। আরও ভালো লাগত যদি কেউ শিবু দা আর শঙ্কর দা’র খবরটা দিতে পারতেন। তারা বেঁচে আছেন কিনা। কোথায় তাদের বাড়িটা ছিল আমি আর আন্দাজ করতে পারছি না। শিবু-শঙ্কর দুই ভাই ছিলেন। শিবু দার গায়ের রঙ ছিল খুব ফর্সা কুঁকড়া চুল, গোঁফ ছিল। শঙ্কর দা’র গোঁফ ছিল না। ময়লা মতোন। কুঁকড়ানো চুল ছিল। শিবু দা সুন্দর ছবি আঁকতেন। আমার মায়ের কাছেই তিনি ছবি আঁকা শিখেছিলেন। মা খুব ভালো আঁকতেন। আমার জন্মের আগে ১৯৩৩ সালে কলকাতায় ফাইন আর্ট গ্যালারিতে মায়ের চিত্র প্রদর্শনী হয়। জয়নুল আবেদিনও আমার মায়ের কাছে শিখেছেন।
অনুষ্ঠান শুরু আগেই তারা ওই বাড়িতে এসে খুঁজতে থাকেন কোথায় তাদের দাদা (ঋত্বিক ঘটকের বাবা) থাকতেন, কোন বারান্দায় বসে চা বানিয়ে খেতেন। কোন ঘরের খাটের নিচ থেকে মামা ঋত্বিক ঘটক আম চুরি করে খেতেন। যেখানে এখন কলেজের অধ্যক্ষ বসেন সেখানে গিয়ে রীনা চক্রবর্তী বলেন, এই পাশ দিয়ে একটি বের হওয়ার রাস্তা ছিল। সঙ্গে কলেজে অধ্যক্ষ ডা. ইয়াসিন আলী রাস্তাটি দেখিয়ে দেন। যেখানে একটি নতুন ঘর করা হয়েছে, সেখানে গিয়ে তিনি বলেন, এইখানেই একটি টিনের ঘরে বিড়ালের পাঁচটি বাচ্চা ছিল। বাড়ির ভেতরে ঢুকেই তিনি কুয়াটা খুঁজছিলেন। যে কুয়ার পানি খেতেন। কুয়ার কাছে গিয়ে তিনি বলেন, ছোট ছিলাম, তাই পড়ে যাওয়ার ভয়ে কুয়ার কাছে তাদের যেতে দেওয়া হতো না। তবে প্রফুল্ল নামের একজন লোক কুয়া থেকে তাদের পানি তুলে খাওয়াতেন তা তার স্পষ্ট মনে আছে। বাড়ির প্রাচীরটার কাছে গিয়ে বলেন, এই প্রাচীরটা এখন অনেকটা ছোট মনে হচ্ছে। আমি তখন এই প্রাচীরের মাথা ছুঁতে পারতাম না। তিনি স্মৃতি হিসেবে প্রাচীর থেকে একটি ইটের টুকরো তার ব্যাগে ভরে নেন।