Ad Space

তাৎক্ষণিক

  • ‘আপত্তিকর’ কাজে বাধা দেয়ায় প্রহরীকে মারধর– বিস্তারিত....
  • বামশক্তি কনসোলিটেড হয়ে দাঁড়াতে না পারলে ফিল ইন দ্য ব্লাংক করে ফেলবে ধর্মীয় শক্তি : আবুল বারকাত– বিস্তারিত....
  • মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে হলে ভ্যাটের বিকল্প নেই : ভূমিমন্ত্রী– বিস্তারিত....
  • নাটোরে নির্মাণের ৯ মাসেই ভেঙে পড়েছে কালভার্ট– বিস্তারিত....
  • নাটোরে ইয়াবাসহ চার যুবক আটক– বিস্তারিত....

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন । মনোজিৎকুমার দাস

নভেম্বর ৪, ২০১৬

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঢাকায় প্রায় দুদিনের জন্য সফর করে গেলেন। এই সফর বাংলাদেশ ও চীন দুদেশের ৪০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে তাৎপর্যময় বলা যায়। এই তাৎপর্য  সামনের দিনে ক্রমশ উন্মোচিত হবে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ অবকাঠামো খাতে প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার (২৪ বিলিয়ন ডলার) খাতে অর্থায়ন করতে সম্মত হয়েছে চীন।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বিষয়ে  ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। বিশ্বের দক্ষিণ এশীয়  দরিদ্র অধ্যুষিত প্রায় ৩১৮ কোটি মানুষের জীবনে  এর প্রভাব অনুভূত হবে। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর দুই দেশের বাণিজ্য সহযোগিতায় আরো আরো নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। বলা যেতে পারে, দুই দেশের শিল্প অকাঠামো সম্পূরক অনুষঙ্গের। চীন তার বিপুল শ্রমশক্তির সাহায্যে বিশাল বিশাল শ্রমনির্ভর কলকারখানা গড়ে তুলেছে। অদূর ভবিষ্যতে  চীন ওই সব  শ্রমনির্ভর শিল্প বাংলাদেশে গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা আছে। ইতিমধ্যেই এমন সম্ভাবনার আভাস পাওয়া গেছে। গত জুন মাসে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। এর আওতায় চট্টগ্রামে ‘চাইনিজ ইকোনমিক ইন্ডাষ্ট্রিয়াল পার্ক’ প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। এটা হলে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আসবে।

ইউনির্ভাসিটি অব চায়না এর বাংলা বিভাগের শিক্ষক জ্যাংক জিয়াও সম্প্রতি গ্লেবাল টাইমসে এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘শি জিনপিয়ের সফর দুই দেশের জনসাধারণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপাড়া গভীর করতে এবং দুই দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আরও বেশি বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করবে। দীর্ঘকাল ধরেই চীনের মূলধারার সংবাদপত্রে বাংলাদেশ সম্পর্কিত সামান্য খবর আসত, সেটার বিষয়ও সাধারণত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আর কিছু হতো না। ফলে দেশটির সম্পর্কে চীনের সাধারণ মানুষের ধারণা খুবই ভাসা ভাসা এবং কখনও কখনও বিভ্রান্তিকর। এই সফরের মধ্য দিয়ে চীনা জনসাধারণের কাছে বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন জানালা উন্মোচিত হবে।’

এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম রাষ্ট্র চীন। জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম। চীনের বর্তমান জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। এই বিশাল দেশটি আমাদের বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী। এক সময় চীন সাম্রাজ্যবাদীদের পদানত থাকতে হয়। গেরিলা যুদ্ধের ম্ধ্যামে চীনারা স্বাধীনতা অর্জন করে। গেরিলা যুদ্ধে জয়লাভের পর কম্যুনিজম আদর্শে প্রতিষ্ঠিত চীনকে অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজকের অবস্থায় পৌঁছাতে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা, অনেক অনেক বুদ্ধি বিবেককে কাজে লাগাতে হয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চীন বদলে গেছে।

সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও দুদেশের যৌথ স্বার্থ- সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সফরে শীর্ষ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণায় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা ব্যক্ত হয়েছে তাতে  বিদ্যুৎ, সন্ত্রাস দমন, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সমুদ্র অর্থনীতি উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতা এখন অকল্পনীয়। অতীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে চীন অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ ছিল। সে সময়ে চীনের সঙ্গে বাংলা বা বেঙ্গলের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। এক সময় চীনের অর্থনীতি ভেঙে পড়লেও তারা তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাংলা বা বেঙ্গল কিন্তু সেটা পারেনি। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন শোষণ এবং ’৪৭ সালে দেশভাগের ফলে বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়ে পাকিস্তানের অংশ হিসাবে প্রথমে পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান (যা এখন বাংলাদেশ) সৃষ্টি হলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকচক্র এ অংশের উন্নতির জন্য কোনোই পদক্ষেপ গ্রহণ না করে পশ্চাৎপদতার দিকে ঠেলে দেয়। চীনারা চরম কর্মঠ জাতি। তাদের দর্শন হচ্ছে দ্বন্দ্ব- বিরোধকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নেওয়া। তার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে এক করে দেখে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ’৭১ সালে মতভিন্নতা ছিল। ’৬২ সালে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত যুদ্ধ হয়। সীমান্ত নিয়ে চীন ও ভারতের সমস্যা আছে। তবুও ভারতের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াতে তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। এ প্রসঙ্গে আমরা চীনের নেতা দেং শিয়াও পিং এর বিখ্যাত উক্তি উদ্ধৃত করতে পারি। তিনি বলেন, ‘বিড়াল সাদা না কালো সেটা বড় কথা নয়। সে ইঁদুর ধরতে পারে কি-না সেটাই দেখতে হবে।’ তারা সিদ্ধান্ত নেয় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দুদেশের সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে। চীনারা রাজনৈতিক সমস্যার চেয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের দিকে নজর দেয়।

কাজই তাদের ধ্যানজ্ঞান। বলতে গেলে, কাজপাগল জাতি। গ্লোবাইজেশনের যুগে চীন তার বিশাল জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়েছে পণ্য উৎপাদনে। তারা এক সময়ের কট্টর কম্যুনিজম ভাবাদর্শের থেকে বেরিয়ে  অর্থনৈতিক আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

তাদের বিশাল আর সহজলভ্য শ্রমশক্তির দ্বারা সস্তায় পণ্য উৎপাদন করতে পারে। তাদের পণ্যে বিশাল বাজার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বেও আরো অনেক দেশে। চীনের বিশাল শ্রমশক্তি থাকলেও এক সময় তাদের নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা ছিল দুর্বল। চীন তাদের এই দুর্বলতাকে কাটিয়ে তোলার জন্যে প্রথমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের আহ্বান করে। ক্রমে ক্রমে আরো বিদেশি উদ্যোক্তারা। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এবং চীনারাও বুঝতে পারে যে চীনের বিশাল শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীন পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয় করতে পারছে। চীনারা উপলব্ধি করতে পারে, তাদের শ্রমিকরা কাজ করে নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে পারে, দেশকেও এগিয়ে নিতে পারে।

চীন এখন তার উৎপাদন সক্ষমতা তিন সাড়ে তিন দশক থেকে অনেক এগিয়ে। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘ওয়ান বেল্ট রুটের’ এই নীতিতে হচ্ছেন। ‘ওয়ান বেল্ট রুটের’ নীতি অনুসরণ করে ইতিমধ্যেই এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৭০টি সঙ্গে চীন নিজেদের সংযুক্ত করেছে। এখন চীন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও উন্নয়ন ঘটাতে উদ্যোগী হয়েছে। ২০১৫ সালে দিক থেকেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ চীন থেকে বেশি বেশি পণ্য আমদানি করছে।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফর শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের প্রধান মন্ত্রী শি জিনপিং যৌথ বিবৃতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তারা ২৩ দফা যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণা করেছেন যে দুদেশ সম্পর্কে ‘সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্বে বিষয়গুলো হয় ধারাবাহিক ও দীর্ঘমেয়াদি। এই অংশীদারিত্বের ফলে বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশই লাভবান হবে। এর ফলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও দুদেশের যৌথ স্বার্থ- সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু বিষয়ে ঐক্যমত হয়েছে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সফরে শীর্ষ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে যৌথ বিবৃতিতে ঘোষণায় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নের কথা ব্যক্ত হয়েছে তাতে  বিদ্যুৎ, সন্ত্রাস দমন, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং সমুদ্র অর্থনীতি উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, বাংলাদেশের পদ্মা সেতু নির্মাণে চীন উল্লেখযোগ্য অংশীদার। চীন কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করতে আসছে। কর্ণফুলী টানেল সহ ৬টি প্রকল্পের ফলক উন্মোচন করেছেন দুদেশের সরকার প্রধান। যৌথ বিবৃতিতে ২০১৭ সালকে বিনিময় ও বন্ধুতার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এ দেশটি মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে গার্মেন্টস, ভারী শিল্প, পাটজাত শিল্প, ইলেক্ট্রোনিক শিল্প, খেলনা শিল্প, সামরিক সেক্টরের অস্ত্রশস্ত্র শুরু করে তথ্য প্রযুক্তির বিবিধ যন্ত্রপাতি, মোটরসাইকেল, গাড়ি ও গাড়ির খুচরাযন্ত্রাংশ ইত্যাদি শিল্পে  চীনের অবস্থান শীর্ষে।

কয়েক দশক আগে আমরা যে চীনকে যেভাবে জানতাম বা চিনতাম আজ আর চীন সেই অবস্থায় নেই। তাদের আবাসন ব্যবস্থা, আসবাবপত্র শিল্প, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদিতে চীন অকল্পনীয় সাফল্য করেছে। এক সময় চীন রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে অর্থনৈতিক সাফল্য লাভের জন্য তাদের বিপুল শ্রমশক্তিকে উৎপাদনের কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজার দখল করা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। চীন এখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৩০টি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। এক সময় রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দা কুমড়ার মতো সম্পর্ক ছিল। সেই যুক্তরাষ্ট্রে বাজার আজ চীনা পণ্যে ভরপুর। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের  উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। অন্যদিকে, ভারতেরও এতে উদ্বিগ্ন হওয়ায়ও কোনো কারণ নেই। ত্রিশ বছর আগে চীনের সঙ্গে ভারতের যে সম্পর্ক ছিল আজ আর তা নেই। এখন ভারত ও চীন বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করছে।

বাংলদেশের সঙ্গেও চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে। চীন থেকে বাংলাদেশ নানা ধরনের শিল্পের কাঁচামাল, কলকারখানার মেশিনপত্র, যন্ত্রাংশ, বস্ত্র, ভোগ্যপণ্য অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে নিয়ে আসছে। সেই কাঁচামাল থেকে পণ্য উৎপাদনের পর সেই পণ্য এখন চীনে রফতানি করা হচ্ছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম গার্মেন্ট গণ্য রফতানিকারী দেশ।

বাংলাদেশ থেকে চীন প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি ডলারের কাঁচা পাট ক্রয় করে। অন্যদিকে, সেই পাট থেকে চীনারা নানা ধরনের পাটজাত পণ্য তৈরি করে চীন বাংলাদেশে প্রতি বছর বিক্রি করে থাকে। এবারের চীনের প্রেসিডেন্ট  শি জিনপিং এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বিষয়ে  ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হওয়ায় দুদেশ সম্পর্কে ‘সহযোগিতার কৌশলগত অংশীদারিত্বে’ রূপ লাভ করল। পরিশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে চলেছে।

মনোজিৎকুমার দাস : সাহিত্যিক কলামলেখক।