Ad Space

তাৎক্ষণিক

বাবার লাশটিও দেখতে পাইনি : লিটন

নভেম্বর ৩, ২০১৬

রিমন রহমান : বাবা এএইচএম কামারুজ্জামানকে যখন হত্যা করা হয়, তখন ছেলে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন কলকাতায়। সেখানে একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়তেন তিনি। তখন কিশোর বয়স, রাজনীতির মারপ্যাঁচ বুঝে উঠার সময় হয়নি তখনও।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনায় যখন সারাদেশে ভয়ের আবহ তখন বিদেশ থেকে ছুটে আসতে চেয়েছিলেন কিশোর খায়রুজ্জামান। কিন্তু তিনি তখন না বুঝলেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছিল তার স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাই দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি তারা।  তাই বাবার মরদেহটিও দেখা হয়নি তার।

সেই স্মৃতিচারণ করে খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘আমি পত্রিকার মাধ্যমে খবরটি পাই। খবর শুনে আমার ছোট ভাই কেঁদে ওঠে। আমিও কান্নায় ভেঙে পড়ি। কেউ কাউকে সান্তনা পর্যন্ত দিতে পারছিলাম না। তখন কোলকাতায় আমাদের কোনো অভিভাবকও ছিলেন না। আমরা শুধু দুই ভাই। বাসায় আসতে চাইলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের জীবনের কথা ভেবে ঝুঁকি নেয়নি। তারা আমাদের দেশে আসার অনুমতি দেয়নি। পরে ঢাকা থেকে রাজশাহীতে লাশ নিয়ে এসে দাফন করা হয়। হত্যার পর বাবার লাশটিও দেখতে পাইনি।’

লিটন জানান, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়লে তার বাবা ধানমন্ডির একটি বাসায় আশ্রয় নেন। পরে সেই বাসা থেকে তাকেসহ চার নেতাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদের কারাগারে রাখা হয়। তারপর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

লিটন বলেন, বাবার দেখানো পথেই তিনি চলতে চান। দেশের জন্য অনেক কিছু করে যাওয়া বাবা তার পরিবারের জন্য অবশ্য তেমন কিছুই করে যেতে পারেননি। তবে তার ছেলে লিটন বলেন, বস্তুগত কিছু দিয়ে যেতে না পারলেও বাবা আরও দামি কিছু দিয়ে গেছেন। সেটা হলো আদর্শ। তিনি বলেন, বাবাই আমার প্রেরণার উৎস। তার জন্য আমি গর্বিত। বাবার রাজনৈতিক আদর্শকে বুকে লালন করে রাজনীতি করি।’

বাবার কাছ থেকে কী শিখেছেন-জানতে চাইলে লিটন বলেন, ‘বাবা দেশের জন্য রাজনীতি করতেন। নিজের জন্য নয়। বাবার কাছ থেকে এটি শিখেছি। সব ধরনের লোভকে পরিত্যাগ করে মানুষের জন্য রাজনীতি করি। তা না হলে বাবাকে অসম্মান করা হবে। বাবার আত্মা কষ্ট পাবেন। আমি মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বাঁচতে চাই।’

বাবার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে অনেক হত্যার বিচার করছে সরকার। কিন্তু চার নেতা হত্যার বিচার শেষ হয়নি এখনও। এই বিষয়টি এখনও বুকে কাটা হয়ে বিঁধে খায়রুজ্জামান লিটনের বুকে।

বলেন, ‘জেলহত্যার খুনিদের বিচারের মধ্য দিয়েই দেশ কলঙ্কমুক্ত হবে। জেলহত্যার বিচার বর্তমানে আদালতে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, দ্রুততার সঙ্গে এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের বিচার করেছেন। জেল হত্যার বিচারও তিনি করবেন।’

বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে হত্যা করে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কয়েকজন সদস্য।

কামারুজ্জামানের ছেলে খায়রুজ্জামান লিটন ২০১৩ সাল থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। বাবার মৃত্যুর ছয় বছরের মাথায় ১৯৮১ সালে রাজশাহী মহানগরীর ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৮৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের রাজশাহী মহানগর শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৮ সালে মহানগর অ্যাডহক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।

২০১৪ সালে তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর আগে ১৯৯৬ সালে সপ্তম ও ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রর্থী হিসেবে রাজশাহী-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৮ সালে বিপুল ভোটে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। মেয়র থাকাকালে পাঁচ বছরে রাজশাহীতে ব্যাপক উন্নয়নের কারণে প্রসংশিত হলেও ২০১৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরে যান লিটন।