Ad Space

তাৎক্ষণিক

আজ শোকাবহ জেলহত্যা দিবস

নভেম্বর ৩, ২০১৬

সাহেব-বাজার ডেস্ক : ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর রাত ৩টার পর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত কয়েকজন সৈনিক জেল খানায় প্রবেশ করে নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধে জাতিকে নেতৃত্বদানকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে।

বলা বাহুল্য, সেই সময় রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমদের সরাসরি নির্দেশনায় ওই ঘাতক দলটি জেলখানার মতো নিরাপদ ও সংরক্ষিত স্থাপনায় খুব সহজে প্রবেশ করে হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করে।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের শুরুতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠে। বিশেষ করে, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক আহমদ ও বঙ্গভবনে অবস্থানকারী খুনি মেজরদের জন্য। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কর্নেল ফারুক-রশীদ চক্র ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে বঙ্গভবনে অবস্থান করে।

১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞ ঘটানোর পর ফারুক ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে থাকা সবগুলো ট্যাংক বঙ্গভবন ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মোতায়েন করে। এরা সেনা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে বঙ্গভবনকেন্দ্রীক প্রশসানের সর্বেসবা হয়ে ওঠে। ১৫ আগস্টের পর থেকেই খুনি মেজরদের বিরুদ্ধে রোষ দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় নভেম্বরের প্রথমদিন সেই সময়ের চিফ অফ জেনারেল স্টাফ খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ বিগ্রেড প্রধান কর্নেল শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান শুরু হয়।

এ অভ্যুত্থানে মোশতাক চক্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে এবং এ সময় মোশতাক ও খুনি চক্রের পরাজয় নিশ্চিত হয়। পরাজয় নিশ্চিত জেনে পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী জেলখানায় আটক চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। সেই সময় কেন্দ্রীয় কারাগারের আই জি প্রিজন ছিলেন নুরুজ্জামান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর গভীর রাতে বঙ্গভবন থেকে কর্নেল রশীদ তাকে ফোন করে কারাগারের নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দেন।

অল্প সময়ের মধ্যে রশীদ তাকে ফোন করে জেল গেটে যেতে বলেন। নুরুজ্জামান জেল গেটে যাওয়ার পর রশীদ আবার ফোন করে জানায় কিছু ক্ষণের মধ্যে জনৈক মুসলেউদ্দিন জেলখানায় যাবে এবং তাকে যেন তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও কারুজ্জামানকে দেখিয়ে দেয়া হয়। রশীদের এই নির্দেশে আই জি প্রিজন আতঙ্কিত হয়ে মোশতাকের সঙ্গে কথা বলতে চান। সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ওই প্রান্ত থেকে মোশতাকের কণ্ঠ ভেসে আসে।

মোশতাক আই জি প্রিজনকে পাল্টা প্রশ্ন করে জানতে চায় রশীদের কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে কি না। এরপর মোশতাক রশীদের কথা মতো কাজ করতে আই জি প্রিজনকে নির্দেশ দেয়। কয়েক মিনিট পর কালো পোশাকধারী চারজন সৈনিকসহ মোসলেউদ্দিন জেলখানায় আসে এবং আই জি প্রিজন, জেলার ও অন্য কর্মকর্তাদের জিম্মি করে এক নম্বর ও দুই নম্বর সেল থেকে তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে ধরে দিয়ে আসে।

তারপর তাদেরকে একত্রে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ-ফায়ার করা হয়। হত্যাকাণ্ড শেষ করে মুসলেউদ্দিন দলবলসহ অতি দ্রুত চলে যায়। এরপর নায়েক আলীর নেতৃত্বে আরেকটি দল ঘটনাস্থলে আসে। এরা নিহতদের লাশের ওপর বেয়নেট চার্জ করে। ত্রিশ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটে। ঘাতকরা চলে যাওয়ার পর জেলখানার পাগলা ঘণ্টি বেজে ওঠে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়েছে। জাতি হারিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্বদানকারী চার জাতীয় নেতা তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে।

এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়, যা প্রায় একুশ বছর পর আলোর মুখ দেখে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই মামলার চূড়ান্ত রায় দেয়া হয় চারদলীয় সরকারের আমলে, ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর। মহানগর দায়রা আদালতের ওই রায়ে ২০ জন আসামির মধ্যে পাঁচজনকে বেকুসুর খালাস দেয়া হয়। অভিযুক্ত ১৫ জনের মধ্যে তিনজনকে মুত্যুদণ্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে করাদণ্ড দেয়া হয়।

মুত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো মারাফত আলী শাহ, সার্জেন্ট মোসলেউদ্দিন ও আবুল হাশেম মৃধা। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলো সৈয়দ ফারুক রহমান, সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, খন্দকার আব্দুর রশীদ, শরিফুল হক ডলিম, নুর চৌধুরী, মহিউদ্দিন আহমদ, রাশেদ চৌধুরী, আহমদ শরিফুল হোসেন, আব্দুল মাজেদ, কিসমত হোসেন ও নাজমুল আহসান। খালাশপ্রাপ্তরা হলো কে এম ওবায়েদুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জাম হোসেন, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও মেজর খায়রুজ্জামান।