Ad Space

তাৎক্ষণিক

৫শ বছরের পুরনো হাট, হয়নি উন্নয়ন

অক্টোবর ৭, ২০১৬

নুরুজ্জামান,বাঘা :  আমাদের দেশে হাট বাজার গড়ে উঠার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে প্রথম হাট বাজার গড়ে উঠে। এ সমস্ত হাট-বাজারকে অনেকেই গঞ্জ বলে থাকেন। খুব সম্ভাবত পানীয়-জলের সু-ব্যবস্থা এবং কম খরচে মালা-মাল আনা নেওয়ার সুবিধার্থে নদী এলাকায় প্রথম হাট-বাজার গড়ে উঠার প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তীতে নানা কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে হাট-বাজার গড়ে উঠতে থাকে। তবে প্রচীন ও ঐতিহ্যের দিক থেকে যে সকল হাট বাজার গড়ে উঠেছে তার মধ্যে অত্র অঞ্চলে বাঘার হাট অন্যতম। বর্তমানে এই হাটটিকে ঘিরে এখানে পৌরসভাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অনেকের মতে, প্রাচীন ও ঐতিহাসিক হাট হওয়া সত্ত্বেও এই হাটকে ঘিরে যে রকম উন্নয়ন সাধিত হওয়া প্রয়োজন ঠিক সেই রকম উন্নয়ন হয়নি। অথচ সরকার এই হাট থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেন।

এর অবস্থান রাজশাহীর পূর্ব দক্ষিণ সীমানায় পদ্মার কোলঘেঁষা কসবে বাঘা উপজেলার বাঘা নামক স্থানে। খুব সম্ভাবত এ উপজেলাটি নদী তীরবর্তী হওয়ার কারণে এখানে চিরাচারিত নিয়মে গড়ে উঠেছে এ হাট। এটি বাঘার হাট নামে পরিচিত। প্রায় ৫শ’ বছরের পুরাতন এই হাটটি এখনো অত্র অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির মূল কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় লোকজনের মতে, আগে বড় বড় জাহাজ, নৌকা করে হাটে লোকজন আসতো। বর্তমানে নৌকা করে আসলেও আগের মত জাহাজ বা লঞ্চ আসেনা। তবে এই হাটটি যেহেতু এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির মূল চালিত শক্তি, সেহেতু হাটকে ঘিরেই রচিত হয় মানুষের সুখ-দুঃখ।

পরিচিতি ও ইতিহাস : বাঘা হাটটি ঠিক কবে এবং কখন থেকে চালু হয়েছিল এই ইতিহাস কেউ বলতে পারেনা। তবে লোকজনের মুখে যা শোনা যায়, তা হলো-১৫২৩ সালের দিকে দিল্লির বাদশাহ্ নাসির উদ্দিন ওরফে নসরত শাহ্ পাথর আর পোড়ামাটির অপূর্ব কারুকাজ খচিত বাঘায় ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ প্রতিষ্টা করেন। যা বর্তমানে দেশের পঞ্চাশ টাকার নোটে শোভা পাচ্ছে। সে সময় থেকে এই মসজিদ দেখতে দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন আসা শুরু করে। তদুপলক্ষে লোকজনের চাহিদার উপর ভিত্তি করে  কিছু লোক প্রথমে ছোট খাট পসরা নিয়ে বসতো মসজিদ এলাকায়। মূলত তারপর থেকে এখানে হাটের উৎপত্তি হয় বলে মনে করেন স্থানীয় লোকজন।

অবস্থান : রাজশাহী জেলার পূর্ব দক্ষিণ কোনে পদ্মা নদীর কোলঘেঁষা এ উপজেলা। নদী পেরুলেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। তাই এ উপজেলাকে সবাই সীমান্তবর্তী বলে থাকেন।  রাজশাহী সদর থেকে উত্তর দিকে বানেশ্বর। তারপর সেখান থেকে পূর্ব দিকে ঈশ্বরদী সড়ক। মাঝ পথে সারদা পুলিশ একাডেমী। এরপর প্রায় ১৫ কিলোমিটারের পথ সামনে গেলেই বাঘা উপজেলা সদর। আর বাঘা সদরেই বসে এই ঐতিহাসিক বাঘার হাট। সপ্তাহের প্রতি রবিবার ও বৃহস্পতিবার বসে বিশাল এই হাটটি। প্রায় হাফ কিলোমিটার জুড়ে থাকে এ হাটের অবস্থান।

পণ্য পরিচিতি ও ব্যবসা : কালক্রমে বাঘার এই হাট যখন বিশালভাবে গড়ে উঠলো তখন থেকে এই অঞ্চলের মানুষের অর্থনীতির মূল কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে এ হাট। হাটের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে এলাকার হাজার-হাজার মানুষ। হাটে এমন কোন পন্য নেই, যা পাওয়া যায়না। সচরাচর মানুষের খাবারের জন্য ব্যবহারযোগ্য সবজির মধ্যে-আলু, বেগুন, পটল, পেঁয়াজ, রসুন, কচু, মুলা,কপি, সিম, করলা, তরই, ঢেরস, পেঁপেসহ সকল ধরনের সবজি এখানে পাওয়া যায়। এই সবজিগুলো যে শুধু খুচরা বিক্রি হয় তা নয়, এখান থেকে প্রতি হাটে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেয়া হয়। সবজি ফড়িয়া আব্দুল কাদের ও মানিক মিয়া জানান, বর্তমানে প্রতিহাটে অন্তত ১০/২০ টি ট্রাক আসে। যে ট্রাকে করে এখানকার বিভিন্ন ধরনের পণ্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে চলে যায়। তাদের মতে, এখানে প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক রয়েছে যারা এই সকল পন্য উঠানামার কাজ করে থাকেন। এ ছাড়াও আম প্রধান অঞ্চল হওয়ায় প্রতিবছর আম মৌসুমে এখানে বসে বিশাল আমের হাট।

আমোদপুর গ্রামের ফড়িয়া মাজদার রহমান জানালেন, শুধুমাত্র যে এখানে বাঘার পন্য ক্রয় বিক্রয় হয় তা নয়, পাশ্ববর্তী পুঠিয়া, চারঘাট, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও বাংলাবাজার থেকেও বিভিন্ন পন্য আসে এই হাটে। শত বয়সী মুহাম্মদ আলী জানান, আগে এই হাটে বড় বড় নৌকা ও লঞ্চে করে লোকজন আসতো। কিন্ত বর্তমানে সেই লঞ্চ আর আসেনা। তবে নৌকা করে পাশ্ববর্তী লালপুর, দৌলতপুর ও চকরাজাপুর ও বাংলাবাজার থেকে প্রতি হাটেই  লোকজন আসে। তিনি বলেন, এখানে প্রতি হাটে প্রায় কোটি টাকার ব্যবসা বাণিজ্য হয়ে থাকে। হাটের বিভিন্ন পণ্যের সাথে জড়িত থেকে এলাকার হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। তিনি আরো বলেন, শুধুমাত্র বাঘার পন্য হিসেবে দেশ বিখ্যাত অত্র এলাকার আমের পরে বাউসার কচু, আখ ও খেজুরের গুড়, এ ছাড়াও রয়েছে পদ্মার চরাঞ্চলে উৎপাদিত পাটসহ বিভিন্ন রকমের সবজি। এগুলো এ উপজেলার নিজস্ব পন্য হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। এছাড়া বেগুন, পটল, কলা এখানকার নামকরা পণ্যের তালিকায় অন্যতম। এখানে রয়েছে পুরাতন সাইকেল ও রিক্সা-ভ্যানের হাট। এই সকল পণ্যের বাইরেও হাট কেন্দ্রীক গড়ে উঠেছে, অসংখ্য কাপড়ের দোকান। এমনকি  টিভি, ফ্রিজ থেকে শুরু করে মোটর সাইকেলের শো’রুম ।

স্থানীয় লোকজন জানান, এখানে হাট কেন্দ্রীক যখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন আবর্তিত হচ্ছে ঠিক সেই সময়ে বাঘাকে পৌরসভায় রুপান্তরিত করা হয়। ১৯৯৯ সালে গঠিত এই পৌরসভা বর্তমানে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাঘার হাটটি আরো পরিচিত বেশি পেয়েছে বলেও  মনে করেন স্থানীয় লোকজন। বাঘা সদরে অবস্থিত শাহদৌলা ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আমজাদ আলী নবাব বলেন, বাঘা হাটটিকে কেন্দ্র করে আজ বাঘার এই উন্নয়ত তা বলতে দ্বিধা নেই। বাঘার হাটের জন্যই এই পৌরসভা। এছাড়া আজকে যে বড় বড় দোকান পাট, স্কুল কলেজ তা সবই বাঘার হাটের জন্য। তিনি বলেন, বাঘার বিখ্যাত খেজুরের গুড়, কচু, আখ এবং আম বাঘাকে এনে দিয়েছে অনেক খ্যাতি। তিনি বলেন, বাঘার মসজিদ-মাজার ও হাট এই গুলো এ অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

সমস্যা ও সম্ভাবনা : শত বছরের পূরনো ও ঐতিহ্যবাহী এই হাটের উন্নয়ন বলতে তেমন কিছুই হয়নি। এমনকি হাটে আসা লোকজনের জন্য কোন পাবলিক টয়লেট পর্যন্ত নেই। এছাড়া হাটের সৌন্দর্য বর্ধনের কোন কাজ হয়নি। এ নিয়ে সাধারণ লোকজনের মাঝে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। স্থানীয় লোকজন বলছেন, এই হাট থেকে প্রতি বছর ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়ে থাকে। কিন্ত এই টাকা দিয়ে হাটের উন্নয়ন বলতে তেমন কিছুই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি সরকারীভাবে কোন মার্কেটও করা হয়নি। পুরাতন আমলের সেই হাটচালি এখনো রয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, কৃষকদের জন্য সরকারী নিয়মে আলদাভাবেই “চান্দিনা হাট” উল্লেখ থাকলেও এখানে তার কোন ব্যবস্থা নেই। হাটের ভেতরের রাস্তাগুলোও দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়না। বর্তমানে বৃষ্টি বাদল হলে হাটের ভেতর চলাচল অযোগ্য হয়ে যায়। মাজার গেট থেকে শুরু করে হাটের চারিদিকে পানি নিস্ক্শানের জন্য কোন ড্রেনেজ ব্যবস্থাও নেই। যার কারণে হাটে জলাবদ্ধাতা একটি বড় সমস্যা। লোকজন বলছেন, হাটে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যে সকল লোকজন আসে তাদের জন্য আবাসনের কোন সুবিধা নেই। অনেকেই হাটে আসলে তারা ভালোভাবে থাকতে পারেনা। বিষয়টি বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও এ পর্যন্ত কোন সূরাহা হয়নি।

অনেকের মতে, একদিকে যেমন বাঘার ঐতিহবাহী হাট, অন্যদিকে রয়েছে ঐতিহাসিক মাজারও মসজিদ সব মিলিয়ে বাঘাকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে হওয়ার কারণে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে দেশি বিদেশী পর্যটক এখানে আসবে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, ঢাকা রাজশাহী মহাসড়কের পাশে পুঠিয়ার ঐতিহাসিক রাজবাড়ি রয়েছে। সেহেতু রাজবাড়ি দেখতে আসা লোকজন যে বাঘার ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসবেন না এটি কথা নয়। কিন্তু তার জন্য অবকাঠমোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। এ উন্নয়ন সাধিত হলে বাঘায় ব্যাপক উন্নয়ন সহ বহু সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। একই সাথে বাঘার বিভিন্ন বিখ্যাত পণ্যের প্রসার ঘটাতে সরকারী সহায়তা পেলে এ অঞ্চলের লোকজন আরো উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হবে।

স্থানীয়দের দাবি : বাঘার হাটটিকে ঘিরে যেহেতু এলাকার অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে সেহেতু এই হাটের অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ার উপর সবাই গুরুত্ব দিয়েছেন। লোকজন বলছেন, হাটটি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এই জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তোরণ করতে হবে। তারা বলছেন হাটের চারিদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন হওয়া প্রয়োজন। হাটে আসা ট্রাকগুলো যত্রতত্র থাকে এগুলো একত্রে থাকার জন্য উন্নত ট্রাক টার্মিনাল প্রয়োজন। দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজনের আবাসিক ব্যবস্থাসহ তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি নজরে নিয়ে সেটির সমাধান করতে হবে। কৃষকদের জন্য আলাদা বসার জায়গা “চান্দিনা হাট” দখলমুক্ত করে কৃষকদের নিকট দিতে হবে। পৃথক পৃথক পণ্যের জন্য সরকারীভাবে অলাদা পাকা করে জায়গা করে দিতে হবে। এছাড়া বাঘার ঐতিহাসিক মসজিদকে ঘিরে যেহেতু এই হাটের উৎপত্তি হয়েছে সেহেতু বাঘা মসজিদের উন্নয়ন করে এটি আরো দেশবাসীর নিকট আকর্ষণীয় করে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে একটি পর্যটেন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। লোকজন বলছেন, সামগ্রিকভাবে এগুলোর উন্নয়ন করা হলে বাঘার অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন হবে। কর্মসংস্থান হবে এলাকার হাজার-হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে।