অক্টোবর ১৯, ২০১৭ ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ

Home / slide / ভূতের গল্প । মুহসীন মোসাদ্দেক
ভূতের গল্প । মুহসীন মোসাদ্দেক
ভূতের গল্প । মুহসীন মোসাদ্দেক

ভূতের গল্প । মুহসীন মোসাদ্দেক

গতকাল অনেকটা এরকম সময়েই ঘটেছিল ঘটনাটা।

রাজুদের স্কুল থেকে একটা ম্যাগাজিন বের হবে। স্কুলের ছেলেমেয়েরাই সেখানে লিখবে। রাজু ম্যাগাজিনের জন্য একটা গল্প লিখবে ঠিক করেছে। ভয়ঙ্কর একটা ভূতের গল্প লিখবে ঠিক করেছে রাজু। গত দুইদিন থেকে সে গল্পটা নিয়ে ভাবছে। কাগজ-কলম নিয়ে বসে সে নিবিষ্ট মনে ভাবে গল্পটা নিয়ে। ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায় রাজু, যেন সে এই জগতে থাকে না, অন্য কোনো জগতে চলে যায়। গতকাল সন্ধ্যার সময় এরকম আনমনা অবস্থায় রাজু টের পায় তার ঘরের জানালার পাশে কীসের যেন খসখস শব্দ। তারপর কে একজন নাকি সুরে কথা বলে ওঠে। বলে সে নাকি একটা ভূত! প্রথমে একটু চমকে ওঠে, ভয়ও পায় একটু, কিন্তু পরে বিষয়টাকে রাজু একমদই পাত্তা দেয় নি। ভূতের গল্প লিখতে বসলেও রাজু মোটেও ভূত বিশ্বাস করে না। বাস্তবে ভূত বলে কিছু নেই–এমনই বিশ্বাস রাজুর।

তাহলে জানালার পাশে খসখস শব্দ করলো কে! নাকি সুরে কে কথা বললো!

এর সমাধানও রাজু বের করে ফেলেছে। একমনে, যাকে বলে নিবিষ্ট মনে লাবু ভূত নিয়ে ভাবছিল। আর এতেই তার মস্তিষ্ক দুষ্টুমি শুরু করেছে। এটা তার মস্তিষ্কের কারসাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। একটানা ভূত নিয়ে ভাবার কারণে তার অবচেতন মনে এমন একটা কল্পনা তৈরি হয়েছে যাকে তার বাস্তব বলে মনে হয়েছে। আসলে বিষয়টা বাস্তব না। তার মস্তিষ্কের একটা দুষ্টুমি, তার অবচেতন মনের বিক্ষিপ্ত একটা কল্পনা মাত্র।

রাজু ক্লাস সেভেনে পড়ে। স্কুলের বইপত্রের বাইরেও সে অনেক বই পড়ে। শুধু কমিকস কিংবা ডিটেকটিভ বই না, নানা ধরনের বই পড়ে রাজু। তার ছোট মামার ঘরটাকে একটা লাইব্রেরিই বলা যায়। বিশাল চারটা সেলফে শুধু বই আর বই। রাজু সুযোগ পেলেই ছোট মামার ঘরে গিয়ে বই পড়ে। নাম মনে নেই, কিন্তু একটা বইতে রাজু মস্তিষ্কের এসব কারসাজি, অবেচেতন মনের বিক্ষিপ্ত এসব কল্পনার বিষয় সম্পর্কে পড়েছে। এবং ছোট বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে তাকে বুঝিয়েছে। সুতরাং, ভূত-সংক্রান্ত এ বিষয়টাতে পাত্তা দেয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। ভূতটা অবশ্য বেশ কিছুক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই রাজুর মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে নি।

রাজু সন্ধ্যা থেকেই কাগজ-কলম নিয়ে বসে আছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো সে এখনো একটা শব্দও লিখতে পারে নি। রাজু আরো নিবিষ্ট মনে ভাবতে বসে গল্পটা নিয়ে। আর ভাবতে গিয়েই রাজুর মনে হয় ভূত নিয়ে ভাবতে গেলেই আজো তার মস্তিষ্ক ভূতটাকে হাজির করে ফেলবে। তাই বলে কী সে ভাবা বন্ধ করে বসে থাকবে! তা করলে গল্প হবে কী করে!

কয়েকটা দিন কেটে যায় এভাবে। রাজু ভূত-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে ভাবতে চায় না। একেবারে না ভেবে অবশ্য থাকা যায় না, ভাবতে না চাইলেও বিষয়টা মাথার মধ্যে কুটকুট করতে থাকে। রাজু জোর করে বিষয়টা মাথা থেকে সরিয়ে রাখে। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলো।

রাজু ভাবতে বসে।

‘রা-জু ভা-ই-য়া…’

নাকি সুরের কণ্ঠটা শুনতেই রাজু বিরক্ত হয়, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলে, ‘ভাবতে না ভাবতেই বান্দা হাজির!’

‘ওমা! তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলে! কী সৌভাগ্য আমার!’

রাজু ব্যঙ্গ করে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলে, ‘হ্যাঁ, তুমি তো বিরাট ভিআইপি একজন। তোমার অপেক্ষা করবো না! তোমার অপেক্ষায় তো আমার চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে!’

রাজুর তাচ্ছিল্য-ব্যঙ্গ ভূতটা বুঝতে পারলো না কিংবা বুঝতে পারলো ঠিকই, মাথা ঘামালো না, বরং গদগদ হয়ে বললো, ‘আর চিন্তা নাই। আমি এসে পড়েছি।’

‘ভালো করেছো। এখন আসো, বসো, চা-নাস্তা খাও।’ রাজু তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি বজায় রেখেই বলে।

‘আমি তো চা-নাস্তা খাই না।’

‘তবে কী খাও? গু-গোবর?’

‘ছি! কী সব নোংরা কথা! গু-গোবর খেতে যাবো কেন!’

‘ও! তোমরা তো আবার ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খাও। তো আসো আমার ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খাও!’

‘ছি! কী সব আজেবাজে কথা! রক্ত চুষে খাবো কেন! রক্ত চুষে খায় তো খারাপ ভূতেরা! আমি ভালো ভূত।’

‘ভূতের আবার ভালো-মন্দ!’

‘তোমরা এই মানুষেরা খালি খারাপ খারাপ বিষয়গুলো নিয়েই বেশি ঘাটাঘাটি করো। ভূতদের নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে খালি খারাপ খারাপ গল্প বানাও। ভালো কোনো গল্প বানাও না। আসলে তো সব ভূত খারাপ না। ভালো ভূতও আছে। ভালো ভূতেরা রক্ত চুষে খায় না।’

‘তো কী খায় ভালো ভূতেরা?’

‘চাঁদের আলো।’

‘তো যাও, চাঁদের আলো খাও। বাইরে তো চাঁদের আলোয় ভরপুর অবস্থা।’

‘খেয়ে এসেছি তো। একেবারে ভরপেট খেয়ে এসেছি।’

‘ভালো তো। এখন তবে ভুঁড়িতে তেল দিয়ে ঘুমাও।’

‘আচ্ছা, তুমি আমার ওপর এমন বিরক্ত হচ্ছো কেন!’

‘তো কী করবো? আনন্দে হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নাচবো!’

‘তুমি আমাকে এখনো বিশ্বাস করছো না, তাই না?’

‘তোমাকে বিশ্বাস করার মতো কোনো যুক্তি আছে? গত দুই-তিন রাত আমি ঠিকমতো ঘুমাই নি। সারাক্ষণ শুধু ভূত নিয়ে ভেবেছি। এজন্যই আমার মস্তিষ্ক দুষ্টুমি করে এটা ঘটাচ্ছে। এটা আমার মস্তিষ্কের একটা বিভ্রম। এছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবে ভূত বলে কিছু নেই। এখন বলো, কোন যুক্তিতে তোমাকে আমি বিশ্বাস করবো?’

‘আমাকে তুমি বিশ্বাস করো আর না করো, আমি কিন্তু তোমার একটা কাজে আসতে পারি।’

‘কী কাজে?’

‘আমি জানি তুমি একটা ভূতের গল্প লিখতে চাইছো। ভয়ঙ্কর একটা ভূতের গল্প। কিন্তু কিছুতেই লিখতে পারছো না।’

‘তো?’

‘ওসব ভয়ঙ্কর-টয়ঙ্কর বাদ দাও। আমাকে নিয়ে একটা গল্প লিখো।’

‘তোমাকে নিয়ে!’

‘হুম, আমাকে নিয়ে। ভয়ঙ্কর ভূতের গল্প তো সবাই লিখে। তুমি ভিন্ন কিছু লিখো। তুমি লিখো একটা ভালো ভূতের গল্প। আমি হচ্ছি সেই ভালো ভূত। আমি কী কী কাজ করি, কীভাবে করি তোমাকে শোনাবো। তুমি সেগুলো তোমার মতো করে লিখো। দেখবে খুব ভালো হবে। ভিন্ন একটা লিখা হবে।’

রাজু হেসে উড়িয়ে দেয়, ‘ভালো ভূতের গল্প লিখবো! ভয়ঙ্কর কিছু না থাকলে ভূতের গল্প হয়!’

‘এই ভিন্নতাটুকুই তো তুমি আনবে।’

‘অনেক হয়েছে। আর জ্বালিয়ো না। এবার তুমি যাও। চলে যাও।’

‘চলে যাবো!’

‘হুম, চলে যাও।’

‘তুমি বলছো বাস্তবে ভূত বলে কিছু নেই। তার মানে আমি নেই। আমি যদি না-ই থাকি তবে যাওয়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে!’

রাজু চুপসে যায়।

‘যে থাকে সে যেতে পারে, যে নেই তার যাওয়ার প্রশ্ন কীভাবে ওঠে! তার মানে প্রমাণ হয় যে, আমি আছি।’

‘না, নেই। ভূত বলতে বাস্তবে কিছু নেই।’ রাজু উত্তেজিত হয়ে ওঠে, ‘তুমি নেই! তুমি বাস্তবে নেই! সব আমার মস্তিষ্কের কারসাজি।’ দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে মুখ ঢেকে ফেলে রাজু।

‘তুমি বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়েছো। আর বিরক্ত করছি না তোমাকে। চলে যাচ্ছি। তবে, আমার কথাগুলো ভেবে দেখতে পারো। গল্পটা তুমি আমাকে নিয়েই লিখতে পারো।’

পরিবেশটা শান্ত ও স্বাভাবিক হয়ে আসে। রাজু মাথা তোলে। সে বুঝতে পারে এতক্ষণ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। ঘোর থেকে বেরিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে রাজুর মধ্যে।

ভূতটাকে মোটেই পাত্তা না দিলেও সন্দেহ নেই যে রাজু কিছুটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাস্তবে হোক আর মস্তিষ্কের কারসাজিই হোক–প্রসঙ্গটা যখন ভূতের তখন ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। রাজু তার কাগজ-কলম সরিয়ে ফেলে। এবং ঠিক করে আগামী কিছুদিন সে ভূত নিয়ে মোটেও ভাববে না। ভূত নিয়ে ভাবতে গেলে বারবার যদি এভাবে ভূতের আগমন ঘটে এবং ভূতের সাথে এমন আলাপচারিতা চলে তবে সে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাবে–এ শঙ্কায় রাজু আপাতত তার ভয়ঙ্কর ভূতের গল্প লেখার মিশন স্থগিত করে।

কয়েকটা দিন কেটে যায় এভাবে। রাজু ভূত-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে ভাবতে চায় না। একেবারে না ভেবে অবশ্য থাকা যায় না, ভাবতে না চাইলেও বিষয়টা মাথার মধ্যে কুটকুট করতে থাকে। রাজু জোর করে বিষয়টা মাথা থেকে সরিয়ে রাখে। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলো।

ভূত-সংক্রান্ত বিষয়ে না ভাবার কারণে তার মস্তিষ্ক এর মাঝে আর ভূতটাকে হাজির করে নি। রাজু চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, এটা বাস্তবের কোনো ঘটনা নয়, তার মস্তিষ্কেরই কারসাজি ছিল। যদি বাস্তবেই এমনটা ঘটতো অর্থাৎ ভূতটা যদি সত্যি সত্যি থাকতো তবে এর মাঝে ভূতটা আবার আসতো এবং বারবার আসতেই থাকতো। কিন্তু এর মাঝে এমনটা ঘটে নি। সুতরাং, ভূতটা বাস্তবে নেই। এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছার পর রাজুর বেশ ফুরফুরে লাগে, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে রাজু।

এভাবে আরো কয়টা দিন কেটে যাওয়ার পর রাজুর মনে পড়ে কালই ম্যাগাজিনের জন্য লেখা জমা দেয়ার শেষ তারিখ। আজ রাতের মধ্যেই লেখাটা শেষ করতে না পারলে কাল কীভাবে সে লেখা জমা দেবে! রাজু অস্থির হয়ে পড়ে। তার বন্ধুরা এর মধ্যেই লেখা জমা দিয়ে ফেলেছে এবং খুব ভাব নিয়ে বেড়াচ্ছে। রাজু যদি লেখা দিতে না পারে এবং সাদিব, জাকির, সুমি, দিপুদের লেখা যদি ম্যাগাজিনে ছাপা হয় তাহলে তার মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। কারণ শুরুর দিকেই রাজু খুব ভাব নিয়ে জানিয়েছিল সে ভয়ঙ্কর একটা ভূতের গল্প লিখবে। যদি সে না লিখতে পারে তবে কী জবাব দিবে!

পড়াশোনার পর্ব স্থগিত রেখে সন্ধ্যায়ই রাজু বসে পড়ে কাগজ-কলম নিয়ে। এবং ভয়ে ভয়ে থাকে আবার না ভূতটা হাজির হয়ে যায়!

বেশে কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও রাজু যখন বিশেষ কিছু লিখতে পারলো না তখন সে তার ভয়ঙ্কর ভূতের গল্প লেখার মিশন থেকে ‘ভয়ঙ্কর’ শব্দটা বাদ দিলো। স্রেফ একটা ভূতের গল্পই লিখবে। এবং সেই ভালো ভূতটাকে নিয়েই সে একটা গল্পের পরিকল্পনা করে ফেললো। ভূতটার সেই আকস্মিক আগমন এবং তার সাথে কথোপকথন নিয়েই রাজু খুব মজার এবং গোছালো একটা গল্প সাজিয়ে ফেললো। রাজুর ধারণা ছিল লেখার সময় ভূতটা আবার হাজির হবে এবং লেখাটা নিয়ে ভূতটার সাথে কিছু পরামর্শ করে নেয়া যাবে। কিন্তু আদতে তা ঘটলো না। তাতে অবশ্য রাজুর লেখা আটকালো না। সে নিজের মতো করেই লিখে ফেললো। গল্পটার নাম দিলো ‘অদ্ভুত এক ভূতের গল্প’।

ম্যাগাজিনে রাজুর গল্পটা ছাপা হলো। বেশ সুন্দর একটা অলঙ্করণ দেয়া হয়েছে গল্পের সাথে। ম্যাগাজিনটা বাসায় এনে সন্ধ্যায় যখন সে তার গল্পটা বের করে সামনে মেলে ধরলো তখন তার বিচিত্র ও অদ্ভুত অনুভূতি হলো। গল্পটা লেখার পেছনে একটা কাহিনি আছে, যেটা কেউ জানলো না, কাউকে সেটা জানানো যাবেও না। জানাতে গেলে কেউ তো বিশ্বাস করবেই না, উল্টো তাকে পাগল ভেবে বসতে পারে! তাই বিষয়টা কাউকে জানানোর কোনো পরিকল্পনা রাজুর নেই।

গল্পটা লেখার পেছনে যে ভূতটার অবদান তাকে লেখা ছাপার খবরটা জানানো দরকার। ভূতটার সাথে রাজু বেশ খারাপ ব্যবহার করেছে। ভূতটাকে অন্তত একটা সরি আর একটা থ্যাঙ্ক ইউ বলা দরকার।

রাজু নিবিষ্ট মনে ভাবতে বসে। বহুক্ষণ পেরিয়ে গেলেও তার মস্তিষ্ক ভূতটাকে আর হাজির করতে পারে না!

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

হিকমার প্রতিষ্ঠাতা কাওসারের কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক : নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন শাহাদাত-ই আল-হিকমার প্রতিষ্ঠাতা কাওসার হুসাইন সিদ্দিকীকে (৪০) দুই …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *