ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ ৪:২৬ অপরাহ্ণ

Home / slide / মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন । ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী
‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটা মানচিত্র আমার সামনে জন্ম নিল, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটা মানচিত্র আমার সামনে জন্ম নিল, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন । ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী

জাকিয়া আহমেদ : ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতিত চার লাখ নারী আজ কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। যারা বেঁচে আছেন, তাদের এখনও কাউন্সিলিং দরকার। তারা আজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তাদের বোঝানো দরকার যে, তাদেরও কথা বলতে হবে। এতে তারা সম্মানিত হবেন। তাদের কোনও লজ্জা নেই। এটা কোনও লজ্জার বিষয় নয়।’

কথাগুলো বিশিষ্ট ভাস্কর ও মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর। ক’দিন আগেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন এই বীরাঙ্গনা। নিজের অতীত আর বর্তমানের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কোথাও যদি আমার ছিটেফোঁটা অবদান থেকে থাকে, তার জন্য আমি গর্বিত। আর আমার যে কষ্ট, সেটা আমি উৎসর্গ করলাম চার লাখ মা-বোন আর ৩০ লাখ শহীদদের প্রতি।’

প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। আর কাজ না হওয়ারও কারণ আছে। আমাদের সপক্ষের শক্তি খুব কম সময়ই দেশ চালিয়েছে। স্বাধীনতার পর বেশিদিন ক্ষমতায় ছিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি।’ তিনি মনে করেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটা অনুষদ খোলা উচিত। সেখানে শিক্ষার্থীদের দলে-দলে ভাগ করে দেশের আনাচে-কানাচে পাঠাতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র; যুদ্ধের ভয়াবহতা। এমনও অনেকে আছেন, যারা নিজেরাও ভুলে গেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাদের জীবনে কত বড় ঘটনা ঘটেছে। সেসব কথা বের করতে হবে। গবেষণা করতে হবে। কোথায় যেন একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে।’

‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটা মানচিত্র আমার সামনে জন্ম নিল, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন ১২২ বীরাঙ্গনা। মাস পাঁচেক হলো তিনি রাজধানীর খিলক্ষেতে নতুন বাড়িতে উঠেছেন। সেখানেই  এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় তার। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার অনভুতি জানাতে গিয়ে এই ভাস্কর বলেন, ‘ভালো লাগছে। অবশ্যই ভালো লাগছে। নিজের খুশিটা নিজে প্রকাশ করাটা কঠিন। তবে যেকোনও প্রাপ্তি কিংবা সম্মানজনক স্বীকৃতি অবশ্যই আনন্দের। আর এ জন্য বর্তমান সরকারের অবদান স্বীকার করতেই হবে। জীবনসমুদ্র পার হয়ে আজ এ স্বীকৃতি পেলাম। তারপরও দিয়েছে, এটাই বড় কথা। আজকের এ স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য, নারীদের জন্য অনেক বেশি আনন্দের।’

প্রিয়ভাষিণী বলতে থাকেন, ‘এ সরকার কতো টুকুইবা সময় পেয়েছে। সে হিসাবে এই বিলম্ব বেশি দিনের নয়। অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতেই আমাদের ৩৫ বছর কেটে গেছে।’ স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানান প্রিয়ভাষিণী।

কোনও দিন স্বীকৃতির জন্য কথা বলেননি উল্লেখ করে প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘আমি মন্ত্রণালয়ে কোনও দিন এ নিয়ে কথা বলিনি। বরাবরই বলেছি, আবেদন করে আমি মুক্তিযুদ্ধের খেতাব নেব না। কারণ, আমি মুক্তিযুদ্ধে পরিকল্পনা করে যাইনি। আমি মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার হয়েছিলাম। আমি একটা ঝড়ের কবলে পড়েছিলাম, আর সেখানেই আমি যুদ্ধ করেছি। কিন্তু তখন মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী বোঝালেন, এটা একটা প্রক্রিয়া। আপনি আপনার মতো করে আবেদন করেন। আমি তখন বলি, আবেদন করে মুক্তিযুদ্ধের খাতায় নাম লেখাতে আমি মোটেও ইচ্ছুক না। কিন্তু যেহেতু একটা প্রক্রিয়া, তাই আমাকে আবেদন করতে হয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে নিজেকে নিজে সম্মান দিতে হয়। সেই সূত্রে আমি নিজেকে সম্মানিত বোধ করি। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হলো সামাজিক সম্মান।’

প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘চাকরি করেছি, জীবনের সঙ্গে লড়াই করেছি, সংসার করেছি-এভাবেই দিন পার হয়েছে। আর যাপিত জীবনের যে কষ্ট, সংকট, সেটা একান্তই আমার। সেসব কথা কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করবো না। আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করা যায়, কিন্তু কষ্টের কথা কাউকে বলতে হয় না।’

স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘যারা বাংলাদেশ চায়নি, তারা মন্ত্রী হয়েছে, গাড়িতে পতাকা লাগিয়ে ঘুরেছে। আর যারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছে, তারা কোনঠাসা হয়ে তা দেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের অপশক্তির পক্ষকে বিদায় করার সময় চলে এসেছে। তারা কোনও মানবিকতার আওতায় পড়ে না। কারণ, তারা ৭১ সালে মানবিকতা দেখায়নি।’

এখনকার দৈনন্দিন জীবন নিয়ে প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘ভাস্কর্যের কাজ করতে করতে রাত একটা-দুইটা বেজে যায়। তাই অন্য কাজ করার খুব একটা সময় পাই না। তবে আমি রান্না করতে খুব পছন্দ করি।’

নিজের জীবনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি বলেন, “গান গাওয়া ছিল জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। একবার ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হলাম। সেখানে লিখেছিলাম, আমি কণিকা বন্দোপাধ্যায়ের মতো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে চাই। এই কথা উনি শুনেছিলেন। ১৯৮৭ সালে কনিকা বন্দোপাধ্যায় এই দেশে এলেন; যশোরে আমার বাসায় গেলেন; থাকলেন দু-তিন দিন।’

গান শিখেছিলেন কোথায়, জানতে চাইলে প্রিয়ভাষিণী বলেন, ‘বাড়িতেই গানের পরিবেশ ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণিতে উঠেই খুলনায় সাধন সরকারের কাছে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত গান শিখি। পরে বিয়ে হয়ে গেল, নানা টানাপোড়েন, সংসারের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম না। এখন আর আগের মতো ভালো গাইতে পারি না। তবে গাইতে ইচ্ছে করলে হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পরি।’

জীবনের প্রাপ্তি নিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটা মানচিত্র আমার সামনে জন্ম নিল, এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’

ছবি :  সাজ্জাদ হোসেন

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

সাহেব-বাজার ডেস্ক : ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী দেশের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন। আজ রবিবার সকালে গণভবনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *